চীনের সেনাবাহিনীর শীর্ষ জেনারেলরা তদন্তের মুখোমুখি হচ্ছেন। এতে করে দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের দীর্ঘদিনের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এখন তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মহলেও পৌঁছে গেছে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে—পার্টির নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাও কাউকে রক্ষা করতে পারছে না।
চীন–বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের দীর্ঘদিনের মিত্র ও কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য জেনারেল ঝাং ইউশিয়ার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে সি চিন পিংয়ের হাতে ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে চীনের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামো আরও অস্বচ্ছ হয়ে উঠছে, যা আগে থেকে গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা রয়েছে। তবে এই অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের কারণে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনের সহসা সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা কমে গেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক জোনাথন জিন বলেন, ‘ঝাংয়ের অপসারণের অর্থ হলো—এখন নেতৃত্ব পর্যায়ের কেউ সত্যিকার অর্থে নিরাপদ নন।’ ঝাংয়ের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘটনাকে ‘বিস্ময়কর’ বলে মনে করেন জিন।
জিন দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থায় (সিআইএ) চীনবিষয়ক শীর্ষ বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে চীনবিষয়ক পরিচালক ছিলেন। তাঁর মতে, এই তদন্ত চীনের রাজনীতিতে একটি ‘গভীর পরিবর্তনের’ ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জিন বলেন, অতীতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে যাঁদের লক্ষ্য করা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে সি চিন পিংয়ের কিছু রাজনৈতিক যোগসূত্র থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু এবার সেই সীমা অতিক্রম করা হয়েছে। সি চিন পিংয়ের রাজনৈতিক সৌরজগতের যে অংশকে জিন ‘গ্রহাণুপুঞ্জ’ বলে মনে করেন, এবারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সেখানে ঢুকে পড়েছে।
সি চিন পিং ও ঝাং ইউশিয়া—দুজনই ‘প্রিন্সলিং’ বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। তাঁরা দুজনেই সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সন্তান। ৭৫ বছর বয়সী ঝাং ইউশিয়ার ২০২২ সালে অবসর নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সি চিন পিং তাঁকে চীনের সর্বোচ্চ সামরিক নেতৃত্ব–বিষয়ক সংস্থা সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনে (সিএমসি) তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব দেন। এতে করে তাঁদের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
গত শনিবার (২৪ জানুয়ারি) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ‘শৃঙ্খলা ও আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের’ অভিযোগে ঝাংয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। অথচ সিএমসির এ জোষ্ঠ্য ভাইস–চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্ট সির পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর সি চিন পিং ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেন। সেনাবাহিনী ছিল এ অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ২০২৩ সালে দেশটির সামরিক বাহিনীর অভিজাত রকেট ফোর্সের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়।
এ বাহিনী পারমাণবিক অস্ত্রের পাশাপাশি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার দায়িত্বে পালন করে। গত কয়েক বছরে দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি থেকে দুই ব্যক্তিকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাঁরা দুজনই একসময় প্রতিরক্ষমন্ত্রী ছিলেন।
গবেষক জোনাথন জিন বলেন, ‘আমার মনে হয় দুর্নীতির উদ্বেগ সম্ভবত সত্যি। কিন্তু চীনের রাজনীতিতে সাধারণত এই ধরনের অভিযোগ কাউকে সরিয়ে দিতে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়।’
সি চিন পিং দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর আগে দেশটিতে দুর্নীতি কতটা গভীরভাবে শেকড় গেড়েছিল, সেটাও উল্লেখ করেন জিন।
সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের (সিএমসি) জয়েন্ট স্টাফ ডিপার্টমেন্টের প্রধান ও পার্টির জ্যেষ্ঠ সদস্য লিউ ঝেনলির বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। এতে করে সাত সদস্যের এই সর্বোচ্চ সামরিক সংস্থা সংকুচিত হয়ে দুজনে নেমে এসেছে। দুজনের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সি চিন পিং।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এশিয়া সোসাইটির গবেষক নীল টমাস বলেন, ‘সি চিন পিংয়ের আগে আর কোনো নেতা (দেশটির সেনাবাহিনী তথা) পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) শীর্ষ নেতৃত্বকে এভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেননি।’
হুমকি নির্মূল করা হচ্ছে
গত রোববার চীনের সেনাবাহিনীর মুখপত্র পিএলএ ডেইলির প্রথম পাতার সম্পাদকীয়তে এ তদন্তকে বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করে। সেখানে বলা হয়েছে, এই দুই জেনারেল চেয়ারম্যানের দায়িত্বশীলতা ব্যবস্থা ‘গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন ও লঙ্ঘন করেছেন’।
এই ব্যবস্থায় সি চিন পিং সিএমসির চেয়ারম্যান। চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর হাতে সর্বোচ্চ সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রয়েছে। চীন সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা ‘সেনাবাহিনীর ওপর পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব কার্যকর করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।’
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর চায়না অ্যানালাইসিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক লাইল মরিস বলেন, ‘চেয়ারম্যান দায়িত্বশীলতা ব্যবস্থা লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার অর্থ হলো—ঝাং ইউশিয়ার ক্ষমতা সি চিন পিংকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।’
পিএলএ ডেইলির প্রতিবেদনে বিস্তারিত কোনো তথ্য বা ক্ষমতার লড়াইয়ের প্রমাণ দেওয়া হয়নি। কোনো কোনো বিশ্লেষক এটাকে আনুগত্যহীনতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে ঝাং ইউশিয়া আসলেই সি চিন পিংয়ের ক্ষমতার জন্য কতটা হুমকি হয়ে উঠেছিলেন, তা নিয়ে অনেক বিশ্লেষকের মনে সন্দেহ রয়েছে।
লাইল মরিস বলেন, ‘সির এ ধরনের নাটকীয় পদক্ষেপ গ্রহণ দুটি বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়। এক. এমন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সি কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন। দুই. সামরিক বাহিনীর ওপর নিজের ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে সংহত করার বিষয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী।’
ঝাং ইউশিয়া আগে চীনের সেনাবাহিনী পিএলএর প্রোকিউরমেন্ট (ক্রয়) বিভাগের পরিচালক ছিলেন। এটা সি চিন পিংয়ের নির্দেশে শুরু হওয়া দুর্নীতি দমন অভিযানের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এত দিন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো হয়নি।
সিঙ্গাপুরের এস. রাজারাত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক জেমস ছার বলেন, ঝাং ইউশিয়ায়ের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর মধ্য দিয়ে সি চিন পিং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা একটি সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। অভিযোগটা হলো— সি বেছে বেছে সামরিক দুর্নীতির তদন্ত করছেন। তাঁর মতো ‘প্রিন্সলিং’ বা রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরা রেহাই পাচ্ছেন।
জেমস ছার বলেন, ‘ঝাংয়ের শিষ্য লি শাংফু ২০২৩ সালের শেষভাগে সমস্যায় পড়লে তাঁর (ঝাংয়ের) কোনো শাস্তি হয়নি।’ লি শাংফু চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ২০২৩ সালের শেষার্ধে সামরিক ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির সন্দেহে তাঁকে পদচ্যুত করা হয়।
সামরিক নেতৃত্বে শূন্যতা
সি চিং পিংয়ের এসব পদক্ষেপের কারণে চীনের সামরিক নেতৃত্বের এত বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এসব জায়গায় নতুন কাউকে না বসালে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনীটি কীভাবে পরিচালিত হবে—এই প্রশ্ন উঠেছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জোনাথান জিন বলেন, ‘নির্দেশনা–শৃঙ্খলা (চেইন অব কমান্ড) কীভাবে কাজ করবে, বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা সাধারণত এসব শূন্য পদে বসার যোগ্য, সিএমসির সেসব কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগে বাদ পড়েছেন। তাই (চীনের সেনাবাহিনী কীভাবে পরিচালিত হবে) তা সত্যিই পরিষ্কার নয়।’
অন্যান্য বিশ্লেষক মনে করেন, সি নতুন কমিটি না গড়ে তোলা পর্যন্ত যৌথ প্রশিক্ষণ বৃদ্ধির মতো উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগ থমকে যেতে পারে।
উদ্ভূত সমস্যার সমাধান কীভাবে করা হতে পারে, এ বিষয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক নিরাপত্তা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্লুপাথ ল্যাবসের গবেষণা পরিচালক এরিক হান্ডম্যান বলেন, ‘নতুন সদস্য যুক্ত করা হতে পারে। অথবা সি–কে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নেতা হিসেবে রেখে একটি নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলারও সম্ভাবনা রয়েছে।’
এশিয়া সোসাইটির নীল টমাস বলেন, সি সামরিক নেতৃত্বকে পুনর্গঠনে আগ্রহী। এ জন্য ‘সঠিক প্রার্থী বাছাই করে’ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আগামী বছরের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান।
বিশ্লেষকরাদের মতে, ততক্ষণ (নতুন নেতৃত্ব বাছাই) পর্যন্ত সি সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যমাত্রা এগিয়ে নেবেন।
চীন অনেক দশক ধরে কোনো যুদ্ধ করেনি। কিন্তু দেশটি সম্প্রতি সমুদ্র বিবাদ এবং তাইওয়ানকে ঘিরে ক্রমশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। স্বশাসিত দ্বীপটিকে চীনে নিজেদের দাবি করে। গত বছরের শেষদিকে তাইওয়ানের আশেপাশে সর্বকালের সর্ববৃহৎ সামরিক মহড়া চালিয়েছে চীন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজর অন্যদিকে। আর তাইওয়ানের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৮ সালে। তাই, এই সময়টা সি ‘ঘর গোছানোর’ কাজে ব্যবহার করতে পারবেন।
নীল টমাস বলেন, ‘পিএলএর উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বে এ ধরনের অভিযান (শূন্যতা) এটাই ইঙ্গিত দেয়, তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সির সহসা বড় কোনো সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির পরিকল্পনা নেই। তবে (সির) এই কঠোর পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে আরও যোগ্য এবং অনুগত জেনারেলদের তুলে আনা, যাঁরা ভবিষ্যতে আরও বড় হুমকি সৃষ্টি করবেন।’
এ বিশ্লেষকের মতে, ‘সি একজন দৃঢ় সংকল্পের মানুষ। পার্টি ও সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে আনুগত এবং আদর্শগতভাবে নিষ্ঠাবান রাখার জন্য যা করা দরকার, তিনি তাই করবেন।’
সূত্র: প্রথম আলো