শিরোনাম
◈ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বিরোধে বাংলাদেশকে কেন সমর্থন দিচ্ছে পাকিস্তান? ◈ ২০২৯ সা‌লের ক্লাব বিশ্বকাপ আয়োজন করতে আগ্রহী ব্রাজিল ◈ বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ: অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে নির্বাচনি প্রচার ◈ জামায়াত হিন্দুদের জামাই আদরে রাখবে, একটা হিন্দুরও ভারতে যাওয়া লাগবে না : জামায়াত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী (ভিডিও) ◈ মার্চে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ  ◈ বিশ্বকাপ থে‌কে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়া ক্রিকেটের জন্য বাজে দৃষ্টান্ত : এ‌বি ডি ভিলিয়ার্স ◈ ভোলা এলএনজির বিকল্প প্রস্তাব, সাশ্রয় হবে ৯ হাজার কোটি ◈ পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার বসাতে হাইকোর্টের হুঁশিয়ারি ◈ যুক্তরাজ্যে অতিদারিদ্রের সংখ্যা ৬৮ লাখ, ৫৩ শতাংশ বাংলাদেশি ◈ ভুয়া তথ্যে কানাডার ভিসার আবেদন: বস্তায় ভরে ৬০০ বাংলাদেশির পাসপোর্ট ফেরত

প্রকাশিত : ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ১১:৪৯ দুপুর
আপডেট : ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬, ০১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বিরোধে বাংলাদেশকে কেন সমর্থন দিচ্ছে পাকিস্তান?

আল-জাজিরার নিবন্ধ: ভারতে অনুষ্ঠিতব্য টি–২০ বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ভেন্যু সরিয়ে নেওয়ার আহ্বানের পর আইসিসি এই উদ্যোগ নেয়। এর পরপরই আন্তর্জাতিক এই টুর্নামেন্টে নিজেদের অংশগ্রহণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে পাকিস্তান। অনুবাদ: আজকের পত্রিকা

গত ২০২৪ সালের জুনে আসন্ন বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ জায়গা নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু গত শনিবার আইসিসি বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করে। কারণ, ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ সরানোর দাবিকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরে আইসিসির সঙ্গে বাংলাদেশের অচলাবস্থা চলছিল। আইসিসি বাংলাদেশের জায়গায় পরবর্তী সেরা র‍্যাঙ্কিংধারী টি-টোয়েন্টি দল স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে।

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আইসিসির বিরুদ্ধে ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। একটি পূর্ণ সদস্য দেশকে কেবল লজিস্টিক জটিলতার কারণে বাদ দেওয়া নজিরবিহীন বলেও সমালোচনা করা হয়। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) জানায়, তারা আগামী সপ্তাহের আগে তাদের দলের অংশগ্রহণ বিষয়ে ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ নেবে না।

পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নকভি সোমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করেন। তবে পাকিস্তান দল টুর্নামেন্টে যাবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেননি। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা ৭ ফেব্রুয়ারি। এক্সে শেয়ার করা পোস্টে নকভি বলেন, ‘শুক্রবার অথবা পরবর্তী সোমবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ নকভি বর্তমানে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের কারণে পাকিস্তানের সব বিশ্বকাপ ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় নির্ধারিত হয়েছে। তিন দক্ষিণ এশীয় দেশের এই বিতর্ক শুরু হয় সপ্তাহ তিনেক আগে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তখন আইসিসির কাছে অনুরোধ জানায়, ভারতের ভেন্যুতে নির্ধারিত বাংলাদেশের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হোক। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে এই দাবি জানানো হয়।

এর আগে, বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে হঠাৎ করে আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের নির্দেশেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিসিসিআই জানায়, ‘সামগ্রিক পরিস্থিতির’ কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অবনতির দিকেই ইঙ্গিত করে।

বাংলাদেশের যুক্তি ছিল, যদি একজন খেলোয়াড় ভারতে নিরাপদ না থাকেন, তাহলে পুরো দল ও সাপোর্ট স্টাফের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা যায় না। তবে আইসিসি বাংলাদেশের ম্যাচ স্থানান্তরের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। বর্তমানে আইসিসির নেতৃত্বে রয়েছেন জয় শাহ, যিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ মিত্র। আইসিসির দাবি, বাংলাদেশ দলের জন্য কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বা ‘যাচাইযোগ্য’ নিরাপত্তা হুমকি নেই। বিসিবি ও আইসিসির মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা হলেও কেউই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। এরপরই বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

২০২৪ সালের শেষ দিকে আইসিসি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিন বছরের একটি চুক্তি করায়। চুক্তি অনুযায়ী, যখনই দুই দেশের কোনো একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে, তখন অপর দেশ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে তাদের ম্যাচ খেলতে পারবে। নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দেখিয়ে ভারতে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের পর এই চুক্তি হয়। ভারত সেই টুর্নামেন্টে নিজেদের সব ম্যাচ, এমনকি ফাইনালও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে খেলে এবং অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়।

এরপর, ২০২৫ সালের আইসিসি নারী বিশ্বকাপ—যা ভারত ও শ্রীলঙ্কা যৌথভাবে আয়োজন করে—সেখানে পাকিস্তান তাদের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় খেলে। একইভাবে, আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬-এও পাকিস্তানের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় নির্ধারিত।

এই উদাহরণ তুলে ধরে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম আইসিসির বিরুদ্ধে ‘ভণ্ডামি’র অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই ধরনের অনুরোধ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এই অচলাবস্থার মধ্যে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশের নিরপেক্ষ ভেন্যুর দাবিকে সমর্থন করে। গত সপ্তাহে ডাকা আইসিসি বোর্ড সভায় বাংলাদেশের পক্ষে একমাত্র পূর্ণ সদস্য দেশ হিসেবে অবস্থান নেয় পাকিস্তান। অন্য সদস্যরা ভারতেই খেলতে অস্বীকৃতি জানালে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার পক্ষে মত দেন।

এই বিতর্কটি ক্রীড়াক্ষেত্রের হলেও এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক টানাপোড়েন রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তির মাধ্যমে ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান সৃষ্টি হয়, যার পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মাঝে ছিল ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব। ২৫ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আলাদা হয়ে বাংলাদেশে পরিণত হয়। এই যুদ্ধে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করে।

২০২৪ সালে এসে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভেঙে পড়ে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর। একই সময়ে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক, যা দীর্ঘদিন প্রায় তলানিতে ছিল, দ্রুত উন্নত হতে শুরু করে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের ক্রিকেট প্রধান মহসিন নকভি আইসিসির সমালোচনা করেন। শনিবার তিনি বলেন, ‘আপনারা দ্বৈত মানদণ্ড রাখতে পারেন না। এক দেশের জন্য এক নিয়ম আর অন্যদের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়ম হতে পারে না। বাংলাদেশ একটি বড় অংশীদার। তাদের সঙ্গে অবিচার হয়েছে। তাদের বিশ্বকাপে খেলতেই হবে।’

মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরানোর কয়েক দিনের মধ্যেই পিসিবি তাকে পাকিস্তান সুপার লিগে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। পাকিস্তানি গণমাধ্যমে পাকিস্তানের বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর খবর এলেও নকভি সরাসরি এমন ইঙ্গিত দেননি। এ ছাড়া, বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শুক্রবার বা সোমবার হওয়ার কথা। এই অনিশ্চয়তা পাকিস্তানের প্রস্তুতিকে ব্যাহত করতে পারে। ৭ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচ খেলার কথা পাকিস্তানের।

আইসিসি ও পিসিবির সাবেক চেয়ারম্যান এহসান মানি পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ থেকে সরে না দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এতে খেলায় রাজনীতি ঢুকে পড়বে। রাজনীতি ও খেলাধুলা আলাদা রাখা উচিত।’ ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক বৈরিতা বহুদিন ধরেই ক্রিকেটে প্রভাব ফেলছে। মে মাসে চার দিনের সামরিক সংঘর্ষের পর এই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ভারতে না যাওয়া এবং দুবাইয়ে গিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়াও সম্পর্ককে আরও খারাপ করে।

সেপ্টেম্বরে এশিয়া কাপে মুখোমুখি হলে ভারতীয় খেলোয়াড়রা পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানান। ফাইনাল জয়ের পর ভারতীয় দল মহসিন নকভির হাত থেকেও ট্রফি নেয়নি। লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের অধ্যাপক ও লেখক আলি খান বলেন, বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো পাকিস্তানের ‘নীতিগতভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত।’ তিনি বলেন, ‘ভারত ও পাকিস্তানের জন্য যদি একই সুবিধা থাকে, তাহলে আরেকটি পূর্ণ সদস্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হবে না কেন?’ তবে তিনি সতর্ক করেন, বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেওয়া অতিরিক্ত পদক্ষেপ।

ভারতীয় ক্রিকেট লেখক শারদা উগ্রা বলেন, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপ মূলত জোট গড়ার চেষ্টা। তিনি বলেন, পাকিস্তান সরে দাঁড়ালে ক্রিকেট বিশ্ব হতাশ হবে এবং এর বড় পরিণতি হতে পারে। আলি খান বলেন, ভারতের বিপুল আর্থিক প্রভাবের কারণে আইসিসির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং সংস্থাটি কার্যত ভারত সরকারের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে। শারদা উগ্রা ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট বোর্ডের নীরবতারও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আইসিসির পূর্ণ সদস্য। কিন্তু সবাই বিসিসিআইয়ের প্রতি নতজানু হয়ে আছে।’

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়