মহসিন কবির: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার শুরু হয়েছে ২২ জানুয়ারি। বিভিন্ন দলের শীর্ষ নোতারা কথা দিয়ে একে অপরকে গায়েল করছে। তবে মাঠ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে অসহিষ্ণুবাব দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। আহত হয়েছেন অনেকে।
শরীয়তপুর: শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বরে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে শরীয়তপুর-নড়িয়া সড়কের ভোজেশ্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে। ঘটনায় দুই পক্ষের ১২ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জনকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণা বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করেই এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি পুলিশের।
নড়িয়া থানা ও স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে, শরীয়তপুর–২ আসনে (নড়িয়া-সখিপুর) বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী সফিকুর রহমান ও জামায়াতের প্রার্থী মাহমুদ হোসেন।
ভোজেশ্বর ইউনিয়ন জামায়াতের এক কর্মী ফেসবুকে লেখেন, ‘আজ মঙ্গলবার সকালে বিএনপির এক নারী নেত্রীর গ্রামে গিয়ে না ভোট–এর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন।’ বিষয়টি জানার জন্য ভোজেশ্বরের কয়েকজন বিএনপি ও তাঁদের সহযোগী সংগঠনের নেতারা দুপুরে ভোজেশ্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যান। সেখানে নড়িয়া উপজেলা (পশ্চিম) জামায়াতে ইসলামীর আমির তাহের নজরুলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতারা বিষয়টি জানতে চান। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়।
এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে দুই পক্ষের কর্মী–সমর্থকেরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এতে দুই পক্ষের অন্তত ১২ নেতা–কর্মী আহত হন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জনকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন জামায়াতের কর্মী মিজানুর রহমান ও শাহ আলম; আর ভোজেশ্বর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মিজান সিকদার, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নাসির উদ্দিন, জপসা ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সবুজ মাদবর, ভোজেশ্বর ইউনিয়ন বিএনপির ৩ নম্বর ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন।
ভোজেশ্বর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মিজান সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বোন টিসিবি–সংক্রান্ত কাজে গ্রামে গিয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছিলেন। আমরা বিষয়টি জানার জন্য জামায়াতের আমিরের কাছে যাই। এরপর জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এতে আমাদের ১০ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।’
ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহের ভালুকায় বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছে। রোববার (২৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানায়, সন্ধ্যার দিকে উপজেলার কাঠালী গ্রামে হরিণ মার্কার প্রচারণাকালে বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী মুর্শেদ গ্রুপের নেতা আদি খান শাকিলের ব্যবহৃত একটি মাইক্রোবাস বিএনপির প্রার্থী ফখরউদ্দিন বাচ্চু গ্রুপের লোকজন ভাঙচুর করে। পরবর্তীতে শাকিল প্রায় ৪০–৫০ জন অনুসারী নিয়ে ভালুকা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিএনপি অফিসে হামলা চালায়।
এ সময় বিএনপি অফিসে অবস্থানরত বাচ্চু গ্রুপের প্রায় ২০ জন নেতাকর্মী আহত হন। এময় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্রায় ২০ মিনিট যান চলাচল ব্যাহত হয়। আহতদের স্থানীয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে ঘটনার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই বাচ্চু গ্রুপের কর্মীরা ভালুকা মাইক্রোস্ট্যান্ড সংলগ্ন আদি খান শাকিলের একটি টিনশেড অফিসে অগ্নিসংযোগ করে।
খবর পেয়ে থানা পুলিশ ও সেনাবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে রাত সাড়ে ৭ টার দিকে আবারও মুর্শেদ গ্রুপের লোকজন সীডস্টোর বাজারের খান হোটেলের পাশে অবস্থিত বিএনপি অফিসে ভাঙচুর করে ও দুটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়।
ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জ-২ (সদর) আসনে নির্বাচনি প্রচার মিছিল চলাকালে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ সময় অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।
সদর থানার ওসি শহিদুল ইসলাম বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় বহুলী ইউনিয়নের ডুমুরইছা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুই দলের পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হয়েছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, “জামায়াত নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা করছে। ধানের শীষের প্রচার মিছিলে হামলা চালিয়ে তারা ছয়জনকে আহত করেছে। এদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।”
২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রশাসনকে দোষীদের গ্রেপ্তার করার দাবি করেন তিনি।
জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের পূর্ব-নির্ধারিত মিছিল শেষের দিকে ছিল। দুটি মিছিল একে অপরকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল। তখন বিএনপির সমর্থকরা পিছন থেকে অতর্কিত হামলা চালায়।
লালমনিরহাট: নির্বাচনে প্রচারণাকে কেন্দ্র করে লালমনিরহাট-১ আসনের হাতীবান্ধা উপজেলায় বিএনপি-জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। ভাঙচুর করা হয়েছে কয়েকটি মোটরসাইকেল।
আজ রোববার (২৫ জানুয়ারি) দুপুরে উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়নের কাসাইটারী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একে অপরকে দায়ী করছেন দুই দলের প্রার্থীরা।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, লালমনিরহাট-১ (পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা) আসনে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম রাজুর নারী কর্মীরা হাতীবান্ধা উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়নের কসাইটারী এলাকায় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রচারণা চালান। এ সময় তাঁরা ওই এলাকার বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার হাসান রাজিব প্রধানের এক কর্মীর বাড়িতে প্রচারণা করতে গেলে প্রথমে তাঁদের বাধা দেওয়া হয়; যা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। এর একপর্যায়ে খবর ছড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়।
এ সময় উভয় পক্ষের ইটপাটকেল ও লাঠির আঘাতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। এতে চার থেকে পাঁচটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
খবর পেয়ে হাতীবান্ধা থানা-পুলিশ, বিজিবি ও র্যাব সদস্যরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ সময় পাটগ্রামে নির্বাচনী কর্মশালা শেষে নিজ নিজ কার্যালয়ে ফিরছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার ও পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান। খবর পেয়ে তাঁরাও তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে পাঁচ জন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলার গোপালদী পৌরসভার মোল্লারচর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলাউদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রাজধানী: রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ওই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশের অতিরিক্ত সদস্য, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে উপস্থিত রয়েছেন।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় পীরেরবাগ আল মোবারক মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি মইনুল হক সংঘর্ষের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেছে।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পর জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটির জের ধরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের ১০ থেকে ১৫ জন আহত হন। ঘটনাস্থলে এখনও উত্তপ্ত অবস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।