নীরব এ রোগ শুধু হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি বিকলের কারণ হচ্ছে না; দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে চোখেরও মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। এমনকি ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির কারণে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন রোগীরা। সাধারণ মানুষের তুলনায় ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের অন্ধত্বের ঝুঁকি ২৫ গুণ।
দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। গত এক যুগে এ সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চোখের জটিলতা ও দৃষ্টিহীনতার আশঙ্কাও। সূত্র: বণিক বার্তা
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে বাংলাদেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৮৪ লাখ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক যুগের ব্যবধানে দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৬৫ শতাংশ। বর্তমানে ২০-৭৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ১৩ দশমিক ২ শতাংশ ডায়াবেটিসে ভুগছেন। তাদের মধ্যে ৩৯ দশমিক ১ শতাংশের রোগ এখনো শনাক্ত হয়নি, সংখ্যায় যা প্রায় ৫৪ লাখ ২৬ হাজার।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগের অধ্যাপক ডা. শারমিন জাহান বলেন, ‘দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ নগরায়ণ ও কায়িক পরিশ্রমের অভাব। মানুষের জীবনযাপন যত যান্ত্রিক হচ্ছে, শারীরিক কর্মকাণ্ড ততই কমছে। এর সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি এবং এ রোগজনিত নানা জটিলতা বাড়াচ্ছে।’
বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ফাস্টফুড ও মিষ্টিজাতীয় খাবারের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস তরুণদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কম বয়সে এ রোগে আক্রান্ত হলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বংশগত বা জেনেটিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিবারে এ রোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকার পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। অন্যথায় বড় ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বড় অংশ জানেনই না যে তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ফলে চিকিৎসার বাইরে থাকা এসব মানুষের শরীরে নীরবে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যার অন্যতম চোখের ক্ষতি। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে চোখের পেছনে থাকা রেটিনার ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলো দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রেটিনা চোখের আলো সংবেদনশীল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা মস্তিষ্কে দেখার সংকেত পাঠায়। এর রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা দেখা দেয়। ডায়াবেটিসজনিত চোখের এ জটিলতাকে বলা হয় ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি।
ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় এর কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। রোগী স্বাভাবিকভাবে দেখতে পেলেও চোখের ভেতরে ধীরে ধীরে ক্ষতি হতে থাকে। রোগটি অগ্রসর হলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, চোখের সামনে কালো দাগ বা ভাসমান বিন্দু ও আলোর ঝলকানি দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি দৃষ্টিসীমার কোনো অংশ অন্ধকার বা ঝাপসা হয়ে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকার সময় যত দীর্ঘ হয়, চোখের ক্ষতির ঝুঁকিও তত বাড়ে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ডায়াবেটিসে ভোগা রোগীদের ৪০ শতাংশের রেটিনায় এ রোগজনিত জটিলতা রয়েছে। ডায়াবেটিসের প্রভাবে চোখের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছলে রেটিনার রক্তনালি থেকে রক্ত বা তরল বের হয়ে চোখের ভেতরে জমতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ও অস্বাভাবিক রক্তনালি তৈরি হয়ে রক্তপাত ঘটাতে পারে। একপর্যায়ে রেটিনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী দৃষ্টিহীনতার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এ বিষয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভিট্রিও-রেটিনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. যাকিয়া সুলতানা নীলা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের তুলনায় ডায়াবেটিস রোগীদের অন্ধত্বের ঝুঁকি কয়েক গুণ বেশি। রেটিনা বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা জটিল রোগীদের প্রায় ৭০ শতাংশই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। কিন্তু ডায়াবেটিসজনিত চোখের জটিলতা সম্পর্কে অনেকেই সচেতন নন। ফলে রোগীরা যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। রেটিনা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করা গেলে জটিলতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যেও ডায়াবেটিসজনিত দৃষ্টিহীনতার উচ্চ ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি তিনজন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে প্রায় একজনের কোনো না কোনো পর্যায়ে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চোখের জটিলতা শুধু রেটিনোপ্যাথির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাদের ছানি ও গ্লকোমার ঝুঁকিও বেশি। চোখের ভেতরের চাপ বেড়ে অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, গ্লকোমা ও লেন্স ঘোলা হয়ে গেলে ছানি দেখা দেয়। ফলে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস চোখের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে দৃষ্টিশক্তি কমিয়ে দিতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা এখন মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরে থাকা রোগীদের অনেক ক্ষেত্রেই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। বিষয়টি স্বীকার করে স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশে এ সেবা সহজলভ্য করতে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ডায়াবেটিসের বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এসব হাসপাতালে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেয়া হবে। পরবর্তী সময়ে জেলা পর্যায়েও এ ধরনের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। এরই মধ্যে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।’