মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠান থেকে শেষ মুহূর্তে আমন্ত্রণ বাতিল হওয়ার ঘটনায় ভারতে অসহিষ্ণুতা এবং 'থট পুলিশ' বা চিন্তা নিয়ন্ত্রণের ক্রমবর্ধমান পরিবেশের তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রবীণ ভারতীয় অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, 'আর কতদিন এই ঘৃণা পুষে রাখা যাবে?'
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক সাম্প্রতিক কলামে নাসিরুদ্দিন শাহ লেখেন, ১ ফেব্রুয়ারি মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ আয়োজিত 'জশনে-ই-উর্দু' অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য।
তবে ৩১ জানুয়ারি রাতে তাকে জানানো হয়, ওই অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতির আর প্রয়োজন নেই।
পাঠকদের সুবিধার্থে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত নাসিরুদ্দিন শাহ-এর সম্পূর্ণ কলামটি হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো:
একজন অভিনেতা হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করার আগে যে উদ্দীপনাময়—কিন্তু প্রায়শই দুর্বোধ্য—কাজগুলো করতে হয়, যখন থেকে আমি তা শুরু করি, তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম—যেদিন আমি বিষয়টি যথেষ্ট বুঝব, সেদিন আমার চেয়ে কম বয়সী এবং আমার মতোই দিকনির্দেশনাহীনদের সাথে তা ভাগ করে নেব। গত ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, আমার কাজের সাথে সম্পর্কিত সবচেয়ে আনন্দদায়ক এবং শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতাগুলো হয়েছে শিক্ষার্থীদের সাথে; তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হোক বা ব্যক্তিগতভাবে। আমি তাদের বিকাশে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছি, প্রায়শই সফল না হলেও, আনন্দ কখনো কম ছিল না। স্বপ্নবাজ এবং প্রায়শই শিখতে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের একটি ক্লাসকে বোঝানোর কাজটি বছরের পর বছর ধরে আমার স্বভাবজাত অধৈর্য প্রবৃত্তিকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করেছে। পথে আমি অনেক ভুল করেছি, তবে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, অভিনয়ের কোনো শিক্ষকের চেয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে কাজ করে আমি বেশি অর্জন করেছি।
১ ফেব্রুয়ারি মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগ আয়োজিত 'জশনে-ই-উর্দু' অনুষ্ঠানটির জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম, কারণ এর অর্থ ছিল শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সেখান থেকে আমার আমন্ত্রণ বাতিল করা হয়। আমাকে না আসার কথা জানানোর পর (৩১ জানুয়ারি রাতে, এবং এর কোনো কারণ দর্শানো বা ক্ষমা প্রার্থনা তো দূরের কথা), বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সম্ভবত মনে করেছে এটি অপমান হিসেবে যথেষ্ট নয়। তাই কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে তারা দর্শকদের কাছে ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয় যে, আমি সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছি।
এটা খুব একটা আশ্চর্যজনক নয় যে সত্য বলার সাহস তাদের ছিল না। সত্যটা হলো—আমি নাকি "প্রকাশ্যে দেশের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেই" (যদি গোপনে দিতাম তবে সম্ভবত ঠিক ছিল), অথবা অন্তত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এমনটাই বলেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। যদি তিনি কেবল ওপর মহলের নির্দেশ পালন না করে থাকেন এবং সত্যিই ওই বক্তব্যে বিশ্বাস করেন, তবে আমি এতদ্দ্বারা ওই ভদ্রলোককে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি—আমার এমন একটি বিবৃতি দেখান যেখানে আমি আমার দেশকে ছোটো করেছি।
হ্যাঁ, আমি স্বঘোষিত "বিশ্বগুরুর" প্রশংসা কখনো করিনি। আসলে তিনি যেভাবে নিজেকে পরিচালনা করেন, আমি তার সমালোচক। তার আত্মপ্রেম আমাকে পীড়া দেয় এবং গত ১০ বছরে তার করা একটি কাজও আমাকে মুগ্ধ করেনি। ক্ষমতাসীন সরকারের অনেক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা আমি করেছি এবং করে যাব। আমি প্রায়শই আমাদের দেশে নাগরিক বোধ এবং অন্যের প্রতি বিবেচনাবোধের অভাব নিয়ে আক্ষেপ করেছি। আমি আরও বেশ কিছু বিষয়ে সোচ্চার হয়েছি কারণ আমার মতো মানুষদের এটা ভাবায় যে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি—যেখানে ছাত্রনেতাদের বিনা বিচারে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয় অথচ সাজাপ্রাপ্ত ধর্ষক বা খুনিরা ঘন ঘন জামিন পায়; যেখানে গো-রক্ষকদের মানুষ পঙ্গু করা ও হত্যার অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে; যেখানে ইতিহাস নতুন করে লেখা হচ্ছে এবং পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু সংশোধন করা হচ্ছে; যেখানে বিজ্ঞান নিয়েও ছেলেখেলা করা হচ্ছে; যেখানে একজন মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত "মিয়াদের" হয়রানি করার কথা বলেন। এই ঘৃণা আর কতদিন পুষে রাখা যাবে?
এই সেই দেশ নয় যেখানে আমি বড় হয়েছি এবং যাকে ভালোবাসতে শেখানো হয়েছিল। জর্জ অরওয়েলের উপন্যাসের সেই "থট পুলিশ" (চিন্তা নিয়ন্ত্রণকারী পুলিশ) এবং "ডাবলস্পিক" (দ্বিমুখী কথাবার্তা) এখন পূর্ণ শক্তিতে মোতায়েন করা হয়েছে, ঠিক যেমন নজরদারি ব্যবস্থা। উপন্যাসের সেই "দুই মিনিটের ঘৃণা" এখন বাস্তব জীবনে ২৪ ঘণ্টার ঘৃণায় পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতিকে জর্জ অরওয়েলের '১৯৮৪'-এর সাথে তুলনা করা কি খুব বেশি হবে, যেখানে "মহান নেতার" গুণগান না করাটাকেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে গণ্য করা হয়?
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড