শিরোনাম
◈ বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলার মামলায় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান গ্রেফতার ◈ শিক্ষার্থী আন্দোলনে উত্তাল ফ্রান্স, বন্ধ ৪ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ◈ বাস-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ময়মনসিংহে নিহত ৭ ◈ বিমানবন্দরে তর্ক-বিতর্ক : মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মামলা ◈ গয়না থেকে স্মার্টফোন-মহাকাশযান, খাবারেও ব্যবহার হয় সোনা—জেনে নিন স্বর্ণের যত ব্যবহার ◈ সরকারের অজানা শত্রু কারা: ক্ষমতা বদলের পর আমলাতান্ত্রিক অন্তর্ঘাতের ঝুঁকি, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ◈ ভিসা সহায়তা দিতে ঢাকায় আসছে রোমানিয়ার টিম  ◈ মক্কার পর এবার মদিনায় ড্রোন হামলা চালিয়েছে হুথি, দাবি সৌদির ◈ বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও তিন তরুণীর নেপালযাত্রায় বাধা, নেপথ্যে কী? যা জানাগেল ◈ শিল্পের আকার ও রফতানি সক্ষমতা বাড়লেও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ০২ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:১৮ দুপুর
আপডেট : ০২ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:১৮ বিকাল

প্রতিবেদক : মনজুর এ আজিজ

শিল্পের আকার ও রফতানি সক্ষমতা বাড়লেও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ

শিল্পোৎপাদনে সক্ষমতা তৈরি হলেও প্রযুক্তিগত গভীরতা ও উচ্চমূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগী ও তুলনীয় অর্থনীতিগুলোর চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের মোট রফতানির প্রায় পুরোটাই উৎপাদিত পণ্যনির্ভর হলেও এর বড় অংশ এখনো নিম্ন প্রযুক্তির। ফলে শিল্পের আকার ও রফতানি সক্ষমতা বাড়লেও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতায় বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (ইউনিডো) সর্বশেষ কম্পিটিটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পারফরম্যান্স (সিআইপি) সূচকেও বাংলাদেশের এ কাঠামোগত দুর্বলতা উঠে এসেছে। সূচকটি দেশগুলোর শিল্পোৎপাদন, রফতানি সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির তুলনামূলক অবস্থান পরিমাপ করে। সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন

ইউনিডোর ২০২৬ সালের দেশ শ্রেণীবিন্যাসে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামকে ‘এমার্জিং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিকস’ শ্রেণীতে রাখা হয়েছে। শিল্পোৎপাদনে ধারাবাহিক অগ্রগতি দেখানো অর্থনীতিগুলোকে এ শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করেছে সংস্থাটি। ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ শ্রেণীর দেশগুলোর মাথাপিছু উৎপাদন মূল্যসংযোজন গড়ে বছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে।

একই শ্রেণীভুক্ত প্রতিযোগী ও তুলনীয় অর্থনীতিগুলোর তুলনায় সিআইপি সূচকে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ইউনিডোর সিআইপি ২০২৬ অনুযায়ী, ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬২তম। দেশের স্কোর দশমিক শূন্য ৪৩, যেখানে বৈশ্বিক গড় দশমিক শূন্য ৬৪। বিপরীতে ভিয়েতনাম ৩০, ইন্দোনেশিয়া ৩৮ ও ভারত ৩৯তম অবস্থানে রয়েছে। তিন দেশের স্কোরই বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

সামগ্রিক শিল্প সক্ষমতার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত গভীরতার সূচকেও বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার চিত্র দেখা যায়। ২০২৪ সালে দেশের উৎপাদন মূল্যসংযোজনের ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশই এসেছে নিম্ন প্রযুক্তির কর্মকাণ্ড থেকে। মধ্যম প্রযুক্তির অংশ ছিল ১ দশমিক ৯ ও উচ্চ প্রযুক্তির অংশ মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। মধ্যম ও উচ্চ প্রযুক্তির কর্মকাণ্ডে উৎপাদন মূল্যসংযোজনের অংশের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম। একইভাবে মধ্যম ও উচ্চ প্রযুক্তিপণ্যের রফতানি অংশের সূচকে অবস্থান ১৪৬তম।

advertisement

রফতানির প্রযুক্তিগত কাঠামোতেও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বড় ব্যবধান রয়েছে বাংলাদেশের। উৎপাদিত পণ্য রফতানিতে মধ্যম ও উচ্চ প্রযুক্তির অংশ বাংলাদেশে মাত্র ৩ শতাংশ। বিপরীতে এ হার ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ, ভারতে ৪১ দশমিক ৫ ও ভিয়েতনামে ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থাৎ সমজাতীয় অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি এখনো মূলত নিম্ন প্রযুক্তির পণ্যের ওপর নির্ভরশীল।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রফতানি আয় বেড়েছে, কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীলতায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। আমাদের অন্যতম প্রতিযোগী ভিয়েতনামে নিম্ন প্রযুক্তির অংশ কমেছে এবং উচ্চ প্রযুক্তির অংশ বেড়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো নিম্ন প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনেই বেশি আটকে আছে। এ কারণেই আমরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছি।’

তবে ভিয়েতনামের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে বৈদেশিক বিনিয়োগ বড় অবদান রেখেছে জানিয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘ভিয়েতনাম বিদেশী বিনিয়োগনির্ভর শিল্পের দেশ। ফলে তাদের প্রযুক্তির উৎকর্ষ দ্রুত হয়েছে। বিপরীতে আমাদের রফতানিমুখী শিল্প স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত। এর পরও আমাদের রফতানি আয়ে গার্মেন্টেসের অবদান বেড়েছে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার ও প্রযুক্তি উন্নয়নে নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সবাইকে ঢালাও প্রণোদনা না দিয়ে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী খাতে বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেয়া যেতে পারে। এতে শিল্পের বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।’

তবে মোট রফতানিতে উৎপাদিত পণ্যের অংশের দিক থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। দেশে মোট রফতানির ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশই উৎপাদিত পণ্য। ভিয়েতনামে এ হার ৯২ দশমিক ৮ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৮০ দশমিক ৪ ও ভারতে ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের মূল দুর্বলতা শিল্পভিত্তির অভাব নয়; বরং বিদ্যমান শিল্পভিত্তিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী উৎপাদনে রূপান্তর করতে না পারা।

মাথাপিছু উৎপাদন মূল্যসংযোজনের ক্ষেত্রে অবশ্য কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে দেশের উৎপাদন খাতে মাথাপিছু মূল্যসংযোজন ছিল ৬১৫ ডলার, যা ভারতের ৩৪১ ও ভিয়েতনামের ৫১৮ ডলারের চেয়ে বেশি। তবে ইন্দোনেশিয়ায় এ পরিমাণ ছিল ৮১৫ ডলার। ইউনিডোর সূচকে মাথাপিছু উৎপাদন মূল্যসংযোজনের সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম। এ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর দশমিক শূন্য ২০, যেখানে বৈশ্বিক গড় দশমিক শূন্য ৭৪।

ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানি পণ্যকে তুরস্ক ও চীনের পণ্যের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। যদিও বৈশ্বিক শিল্প সক্ষমতা সূচকে চীন দ্বিতীয় ও তুরস্ক ২৬তম অবস্থানে রয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্প সক্ষমতা বাড়াতে এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের ব্যয় কমাতে নীতিগত ধারাবাহিকতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত ব্যয় কমানো জরুরি। তবে এসবের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত ও পেশাগত দক্ষ জনবল গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তি ও দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থা এখন এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা সেই পর্যায়ে নিতে পারিনি। আমাদের শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা শিল্পের বর্তমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যেও প্রয়োজনীয় সংযোগ তৈরি হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও পেশাজীবী তৈরি করতে পারলে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন খাতে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। দক্ষ জনবল ঘাটতির কারণে এসব খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং আমরা এখনো নিম্ন মূল্যের পণ্যে বেশি কেন্দ্রীভূত। তৈরি পোশাক খাতেও এখন উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী পণ্যে যেতে হবে। আর সেজন্য দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই।’

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতায় প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে থাকার এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ পালিত হবে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস। এ উপলক্ষে গতকাল শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে ওভারল্যাপিং বা একই ধরনের কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। এজন্য এডিপির আওতায় নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যক্রমের কোনো ধরনের ওভারল্যাপিং রয়েছে কিনা তা প্রযুক্তিনির্ভরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।’

এডিপির নতুন প্রকল্প প্রস্তাব এআই-ভিত্তিক ব্যবস্থায় যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সফটওয়্যার ব্যবহার করে একই উদ্দেশ্যে অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থায় প্রকল্প চলমান আছে কিনা তা শনাক্ত করা গেলে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়বে এবং অপচয় কমবে।’

বিশ্ববাজারের বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘উৎপাদনশীলতা বাড়ানো শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সব দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পণ্য প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদন করা না গেলে আন্তর্জাতিক বাজার অন্য দেশের দখলে চলে যাবে। তাই বাজার সুরক্ষার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। দেশের শিল্প ও অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।’

  • সর্বশেষ