ডেস্ক রিপোর্ট : সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় করতে এতে একগুচ্ছ নতুন সুবিধা যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন সুবিধা দেওয়া, পেনশনারদের স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনা।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। এতে সভাপতিত্ব করবেন অর্থমন্ত্রী, যিনি পদাধিকারবলে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদেরও চেয়ারম্যান। --- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান জানান, জনআগ্রহ বাড়াতে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর আজীবন পেনশন সুবিধাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব পর্ষদ সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। পর্ষদের অনুমোদন পেলে এবং বিদ্যমান বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা সম্ভব হলে– আগামী ১ থেকে ২ মাসের মধ্যেই এগুলো বাস্তবায়ন শুরু হবে।
ধীরগতি ও প্রত্যাশার চেয়ে কম সাড়া
দেশের জনগণের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে, ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে টেকসই ও সুসংগঠিত সমাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতাভুক্ত করার লক্ষ্যে এবং ভবিষ্যতে কর্মক্ষম জনসংখ্যা হ্রাসের কারণে—নির্ভশীলতার হার বৃদ্ধি পাবে, এসব বিবেচনায় নিয়ে ২০২৩ সালের আগস্টে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করে সরকার।
তবে চালুর তিন বছর পার হলেও স্কিমগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি। ব্যাংকের আমানতের সুদের হারের তুলনায় এর রিটার্ন কম হওয়া এবং গ্রাহকদের জন্য পর্যাপ্ত আনুতোষিক বা অন্যান্য তাৎক্ষণিক সুবিধার অভাবকে এর মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফলে গত তিন বছরে সর্বজনীন পেনশনের চারটি স্কিমে এ পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছেন মাত্র ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন গ্রাহক। তাঁদের জমা করা মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারীদের জন্য সমতা স্কিমে অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন এবং তাদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ৫৬.৮৫ কোটি টাকা।
ডলার সংকট মোকাবিলা এবং প্রবাসীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রবাসীদের এই পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনার বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল সরকারের পক্ষ থেকে। তবে প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত প্রবাস স্কিমেই সবচেয়ে কম সাড়া পাওয়া গেছে। এই স্কিমে এপর্যন্ত মাত্র ১,১৭১ জন প্রবাসী নিবন্ধিত হয়েছেন, যার মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র ৯৭ জন। তাঁদের মোট জমা করা আমানতের পরিমাণ ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
যুক্ত হচ্ছে আরও সুযোগ-সুবিধা
এই প্রেক্ষাপটে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করতে একগুচ্ছ সুবিধা যুক্ত করা এবং বেসরকারি ব্যাংকখাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ— বিভিন্নখাতের কর্মীদের বাধ্যতামুলকভাবে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভূক্ত করার পরিকল্পনা করছে সরকার।
একই সঙ্গে পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর নির্ধারণের প্রস্তাবও উঠছে পর্ষদ সভায়।
বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী, সর্বজনীন পেনশনে অন্তর্ভূক্ত ব্যক্তির বয়স ৬০ বছর হলে তিনি মাসিক পেনশন পাওয়া শুরু করবেন। তবে পেনশনে থাকাকালীন সময়ে তিনি মৃত্যুবরণ করলে—তাঁর বয়স ৭৫ বছর হওয়া পর্যন্ত মৃত পেনশনারের নমিনি সমহারে মাসিক পেনশন পাবেন।
এর বিপরীতে, সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী আজীবন পেনশন সুবিধা পেয়ে থাকেন। তাই সর্বজনীন পেনশন স্কিমের প্রতি আকর্ষণ বাড়াতে – পেনশনারের নমিনির বদলে, তার স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপিত হবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদ সভায়।
ঋণ সুবিধা ও স্কিম থেকে বের হওয়ার সুযোগ
সর্বজনীন পেনশন আইন অনুযায়ী, গ্রাহকদের বিশেষ প্রয়োজনে তাঁর জমা করা অর্থের একটি অংশ ঋণ নেওয়ার সুযোগ আছে। ওই ঋণের সুদও তাঁর হিসাবেই জমা হওয়ার কথা। কিন্তু জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ এখনও ঋণ সুবিধা চালু করেনি। তাই ঋণ সুবিধা চালু করে তা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করছে তারা।
বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দেওয়ার আগে মারা গেলে—তাঁর জমা করা অর্থ মুনাফাসহ নমিনিকে ফেরত দেওয়ার কথা বলা আছে। তবে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভূক্ত ব্যক্তিদের জন্য বর্তমানে কোনও এক্সিট সুযোগ রাখা হয়নি।
পাঁচ বছর অর্থ জমা করার পর – শারীরিক ও আর্থিক অক্ষমতার কারণে কেউ সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা থেকে বের হতে চাইলে – কর্তৃপক্ষের বিশেষ বিবেচনায়, পেনশনারকে পুরো অর্থ উত্তোলন করে এক্সিট নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
স্বাস্থ্য বিমা ও শরিয়াহভিত্তিক স্কিম
এছাড়া, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে বিমা সুবিধা সংযোজনের সিদ্ধান্ত হলেও— তা এখনও বাস্তবায়ন শুরু করতে পারেনি পেনশন কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে পেনশনারদের জন্য বিমা পরিকল্পনার খসড়া প্রস্তুত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান জানান, স্বাস্থ্য বিমার সুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকার মতো নামমাত্র মাসিক প্রিমিয়াম নেওয়া হতে পারে।
সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে পেনশন ব্যবস্থাটিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় করতে, এর একটি শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামীকাল পরিচালনা পর্ষদের সভায় অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই বিমা ও নতুন সুবিধাগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।