দীর্ঘ ২১ দিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে উৎপাদনে ফিরেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। আজ শুক্রবার (৮ মে) সকাল থেকে চট্টগ্রামের এই শোধনাগারটিতে পুনরায় পরিশোধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে আমদানিতে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, নতুন চালান আসার মাধ্যমে তার অবসান ঘটল।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেল ৫টার পর থেকেই রিফাইনারির ভেতরে যান্ত্রিক কর্মতৎপরতা শুরু হয়।
তবে প্রাথমিক কারিগরি সমন্বয় ও নিরাপত্তার খাতিরে প্রথম কয়েক ঘণ্টা সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালানো হয়। শুক্রবার সকাল থেকে পুরোদমে উৎপাদন শুরু হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) মামুনুর রশীদ খান জানান, বর্তমানে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টন তেল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে। শুরুতে যান্ত্রিক কিছু সমন্বয়ের প্রয়োজন হয় বলে গতি কিছুটা কম রাখা হয়েছে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎপাদন মাত্রা আরো বাড়ানো হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘ বিরতির পর সৌদি আরব থেকে আসা ১ লাখ ৯৪ হাজার টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি বিশাল জাহাজ কক্সবাজারের কুতুবদিয়া বহির্নোঙরে অবস্থান করছে। এই জাহাজটি আসার মাধ্যমেই শোধনাগারের নিস্তেজ হয়ে পড়া ইউনিটগুলোতে আবার প্রাণ ফিরে এসেছে। জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাস করে তা শোধনাগারের প্রধান ইউনিটে পাঠানো হচ্ছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত বলেন, আমরা একটি বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করলাম। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখন আমাদের লক্ষ্য সর্বোচ্চ সক্ষমতায় পরিশোধন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছি।
মার্চ ও এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে অপরিশোধিত তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। আন্তর্জাতিক শিপিং রুটগুলোতে অস্থিরতার ফলে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী কোনো জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারির তেলের মজুদ আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়।
একপর্যায়ে মজুদ তলানিতে ঠেকলে বাধ্য হয়ে উৎপাদনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে পরিশোধন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে নতুন তেলের চালান পৌঁছানোকে বড় ধরনের স্বস্তি ও জ্বালানি খাতের জন্য ইতিবাচক মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইস্টার্ন রিফাইনারি সূত্র নিশ্চিত করেছে, বর্তমানে যে পরিমাণ ক্রুড অয়েল মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে আগামী ২০ থেকে ২৫ দিন অনায়াসেই পরিশোধন কার্যক্রম চালানো সম্ভব। তবে সংকট যেন আর দানা না বাঁধে, সে জন্য আগাম প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০ মের পর অপরিশোধিত তেলের আরো একটি বড় চালান দেশে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
কর্মকর্তারা আশা করছেন, সৌদি আরব থেকে চলতি মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে নতুন একটি চালান লোডিং সম্পন্ন হবে। ওই চালানেও প্রায় ১ লাখ টনের মতো অপরিশোধিত তেল থাকতে পারে। জাহাজটির সক্ষমতা অনুযায়ী এর পরিমাণ কিছুটা কমবেশি হতে পারে। যদি পরবর্তী চালানটি সময়মতো পৌঁছে যায়, তবে দেশের জ্বালানি সরবরাহে আর কোনো বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকবে না।
ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ থাকা মানেই সরকারকে উচ্চমূল্যে পরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত এই শোধনাগারটি চালু হওয়ায় একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল থাকবে। বিশেষ করে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে এই শোধনাগারটির গুরুত্ব অপরিসীম।