সৌন্দর্য আর মিষ্টি কথাকেই যেন হাতিয়ার বানিয়েছেন শীতল আক্তার খুশি। প্রেম কিংবা বিয়ের প্রতিশ্রুতির মোড়কে তরুণ-যুবকদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পর সেই ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিদেশি নাগরিক—কেউই বাদ পড়েননি তার টার্গেটের তালিকা থেকে।
যুগান্তরের হাতে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগীর তথ্য-প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, ইমো, বিগো লাইভ, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথমে পরিচয় ও বন্ধুত্ব তৈরি করতেন খুশি। ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক গড়াত ঘনিষ্ঠতায়। এরপর নানা অজুহাতে অর্থ ও দামি উপহার নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
শীতল আক্তার খুশি রাজধানীর বড় মগবাজার এলাকার বাসিন্দা সজিবুর রহমানের মেয়ে।
খুশির এমন অভিযোগের শিকার হয়েছেন পাকিস্তানি তরুণ সালমান আজিজও। তিনি বর্তমানে সৌদি আরবে বসবাস করছেন। ২০২১ সালে বিগো অ্যাপে তাদের পরিচয় হয়। পরে তা বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের সম্পর্কে গড়ায়। একপর্যায়ে বিয়ের আশ্বাসে সালমানের কাছ থেকে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার, এসি, আইফোনসহ বিভিন্ন দামি সামগ্রী নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
সালমান আজিজ যুগান্তরকে বলেন, ‘২০২১ সাল থেকে তার পরিবারের বিভিন্ন খরচ আমি বহন করতাম। ২২ লাখ টাকা আদান-প্রদান ছাড়াও অসংখ্য স্বর্ণালংকার, এসি, আইফোনসহ অনেক দামি জিনিস নিয়েছে খুশি। ঢাকায় আসার পর বিয়ের কথা বলে আমি তাকে রিংও পরাই।’
তার ভাষ্য, পরে খুশি একটি ফ্ল্যাট এবং ৫০ লাখ টাকা দেনমোহর দাবি করেন। বিষয়টি নিয়ে তিনি দুই মাস সময় নেন। পরে প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে টাকা দেওয়া বন্ধ করে মামলা করেন। মামলায় খুশিসহ চারজনকে আসামি করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন- খুশির বাবা সজিবুর রহমান, তেজগাঁও কুনিপাড়া এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে সাকিব ইসলাম, বড় মগবাজার চেয়ারম্যান গলির ওয়াকিল আহমেদ পাপ্পু।
সালমানের দাবি, বিভিন্ন সময়ে ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির পুরোটা যাচাই করা সম্ভব না হলেও ব্যাংক লেনদেনের কিছু তথ্যের সঙ্গে তার বক্তব্যের মিল পাওয়া গেছে। সালমানের করা একটি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। ওই মামলার তদন্তে বিভিন্ন নথি ও আর্থিক লেনদেন যাচাই করে সিআইডি। তদন্ত প্রতিবেদনে সালমানের কাছ থেকে খুশিকে বিভিন্ন সময়ে সর্বমোট ১৯ লাখ ৬৯ হাজার ৯৪৩ টাকা পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে খুশির দাবি, সালমান তাকে টাকা দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলো উপহার হিসেবে দিয়েছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘সালমান আজিজের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল। অনলাইনে পরিচয় হয়েছিল। উনি আমাকে বিয়ে করতে চাইতেন। আমি অস্বীকার করছি না, তিনি আমাকে টাকা-পয়সা দিয়েছেন। তবে আমি কখনো তার কাছে টাকা চাইনি, তিনি নিজেই উপহার হিসেবে দিতেন।’
অনুসন্ধানে একই ধরনের অভিযোগে বাংলাদেশের এক যুবকের সঙ্গেও কথা বলেছে যুগান্তর। তার দাবি, খুশির সঙ্গে সম্পর্কের একপর্যায়ে তাদের ধুমধাম করে বিয়ে হয়। পরে সেই সংসার ভাঙনের মুখে পড়ে। ওই যুবকের অভিযোগ, খুশি নিয়মিত মাদক সেবন করতেন এবং বাধা দিলেও তা শুনতেন না। একপর্যায়ে দেনমোহরের টাকা আদায়ের জন্য সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ওই যুবক বলেন, ‘খুশি প্রচুর নেশা করত। তাকে এসব না করতে বলেছি। এ নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। সে আমাকে ব্লক করে রেখেছে এবং ডিভোর্স দিয়ে দেনমোহর বুঝিয়ে দিতে বলেছে।’
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে খুশি বলেন, ‘আমি তাকে বলেছি দেনমোহরের টাকা আমার লাগবে না। কিন্তু পুরোপুরি আলাদা হতে চাচ্ছি।’
যুগান্তরের অনুসন্ধানে আরও কয়েকজন তরুণের সঙ্গে খুশির ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তথ্য সামনে এসেছে। তার হাতে আসা কিছু ছবি ও ভিডিওতেও বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে খুশিকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়। এ বিষয়ে খুশির বক্তব্য, ‘আমার ছেলে ফ্রেন্ড ছিল অনেক, রিলেশনও ছিল। একটা মানুষের জীবনে ফ্রেন্ডশিপ-রিলেশন থাকে।’
হানি ট্র্যাপের অভিযোগে শীতল আক্তার খুশির বিরুদ্ধে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তদন্ত শেষে মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে খুশি, তার বাবা ও ফুফার বিরুদ্ধে সালমান আজিজের কাছ থেকে মোট ১৯ লাখ ৬৯ হাজার ৯৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করা হয়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে প্রতারণার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে দ্রুত ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে অর্থ, উপহার কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। আবেগ ও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কেউ প্রতারণার ফাঁদে পড়লে ক্ষতির পরিমাণ অনেক সময় বড় হয়ে যায়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে সতর্কতা এবং আর্থিক লেনদেনে বিশেষ সাবধানতা জরুরি। উৎস: যুগান্তর।