২০২০-২১ অর্থবছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ঘিরে নেওয়া হয়েছিল একটি বড় ধরনের সমন্বিত উপকূলীয় সড়ক পরিকল্পনা। পরিকল্পনায় ছিল কলাতলী মেরিন ড্রাইভ থেকে নাজিরারটেক পর্যন্ত সৈকতের তীর ঘেঁষে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গ সড়ক তৈরি করা। এর মধ্যে কলাতলী থেকে লাবনী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার অংশে হওয়ার কথা ছিল মাল্টিফাংশনাল সড়ক। যেখানে থাকবে শপিংমল, দোকানপাট, ওয়াশরুম, লকার, কফিশপ ও রেস্তোরাঁ। থাকার কথা ১০ ফুট প্রস্থের সাইকেলওয়ে, ৯০-১০০ ফুট প্রশস্ত ওয়াকওয়ে। সূত্র: সমকাল
২০৫১ কোটি ২০ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ে সড়ক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা ছিল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কক্সবাজার পৌরসভা, জেলা প্রশাসন, বন, পর্যটন, পরিবেশ ও বিদ্যুৎ বিভাগের।
সেই পরিকল্পনার পাঁচ বছর পর কক্সবাজার পৌরসভা এখন সুগন্ধা থেকে কলাতলী পর্যন্ত সৈকতের বালিয়াড়ি (ডেইল) কোথাও ভরাট ও কোথাও কেটে তৈরি করছে ২৮ মিটার (৯২ ফুট) প্রশস্ত সড়ক। ১ দশমিক ২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থায়ন করছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। প্রকল্পটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিটি গভর্ন্যান্স প্রজেক্টের আওতাধীন।
প্রশ্ন উঠেছে– আগের পরিকল্পনায় সৈকতের সঙ্গে সমন্বিত, পর্যটনবান্ধব সুড়ঙ্গের আদলে সড়ক ও মাল্টিফাংশনাল সড়কের কথা থাকলেও সেটি বাস্তবায়ন না করে কক্সবাজার পৌরসভা কেন বালিয়াড়ি কেটে নতুন করে চার লেনের সড়ক নির্মাণ করছে?
বড় প্রশ্ন– কক্সবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায়, যেখানে বালিয়াড়ি সমুদ্রের ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে ‘প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা’ হিসেবে কাজ করে, সেই বালিয়াড়ি কেটেই কেন উপকূল রক্ষার অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে?
গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট কক্সবাজারের ইসিএভুক্ত সুগন্ধা-কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধে আট সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা দেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) পক্ষ থেকে করা রিটে বলা হয়, সৈকতের বালিয়াড়ি উপকূল সুরক্ষার প্রাকৃতিক ঢাল এবং সেখানে সড়ক নির্মাণের জন্য বালিয়াড়ি, সাগরলতাসহ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা হচ্ছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগও হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি) প্রকল্পটি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি কক্সবাজারের ইসিএভুক্ত সুগন্ধা-কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক ও শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
এ ব্যাপারে গবেষক ও পরিবেশকর্মী পাভেল পার্থ বলেন, বালিয়াড়ি হলো উপকূল সৈকত সুরক্ষার একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। সমুদ্রসৈকত, বালিয়াড়ি, উঁচু-নিচু জমি, পাহাড় পর্যন্ত ছয়টি স্তরে বিভক্ত কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলের ভূমি। ভূমির এই শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। এখন বালিয়াড়ি কেটে যে সড়ক তৈরি করা হচ্ছে, সেটি একটি ‘আজব শহর রক্ষা বাঁধ’ হবে। এ ধরনের প্রকল্প সৈকতের বাস্তুতন্ত্রসহ সামগ্রিক জনজীবন, পরিবেশ প্রক্রিয়ায় চরম বিশৃঙ্খলা ও ক্ষত তৈরি করবে।
পাভেল পার্থ বলেন, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করায় নাজিরারটেক থেকে ইনানী পর্যন্ত সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন চলছে। টেকনাফের সাবরাংয়ে প্রাকৃতিক ঝরনার গতিপথ বন্ধ করে ইকো টুরিজম পার্ক তৈরি করায় সেখানে সমুদ্রের ঢেউয়ে পুরো অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৈকতের বালিয়াড়ি কেটে সড়ক তৈরি করলে কক্সবাজারের অবস্থাও এমন হতে পারে।
বালিয়াড়ি কেটে সড়ক কেন?
পাউবো কক্সবাজার অফিস সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রায় দুই হাজার ৫১ কোটি টাকার উপকূলীয় সড়ক প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই কমিটির সভায় সেটি অনুমোদনের পর একনেকে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছিল। পরে আর অগ্রগতি হয়নি।
গত ৫ মে সুগন্ধা থেকে কলাতলী হোটেল সায়মন পর্যন্ত বালিয়াড়ি কেটে ১ দশমিক ২৮০ কিলোমিটার সড়ক প্রকল্পের কাজ পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের ৫ মে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সুগন্ধা সৈকতের একটি অংশে আগে থেকেই প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত ইটের রাস্তা রয়েছে। প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ মিটার দক্ষিণে গিয়ে সেই রাস্তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে গেছে। দ্য প্রিন্সেস হোটেল ও সার্ফ ক্লাবের সামনে বালিয়াড়ি ও ঝাউবন কেটে মাটি ভরাট করা হয়েছে।
স্থানীয় দোকানদার আবদুর রহিম বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ শুরুর কিছুদিন আগেও সুগন্ধা সৈকতে ১০-১২টি বড় বালুর ডেইল ছিল। খননযন্ত্র দিয়ে সেগুলো কেটে সমান করা হয়েছে। ডেইলে লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল ছিল।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সেক্রেটারি মোহাম্মদ আলমগীর কবির বলেন, ইতোমধ্যে কক্সবাজার সৈকতের একাধিক স্থানে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। হোটেল সায়মন পর্যন্ত চলে আসে জোয়ারের পানি। এই অবস্থায় ৯২ ফুট প্রশস্ত সড়ক তৈরি করতে গেলে ওই অংশে সৈকত বলে আর কিছু থাকবে না।
পরিবেশ অধিদপ্তর বনাম পৌরসভা
প্রকল্পটি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিরোধ তৈরি হয়েছে পরিবেশগত ছাড়পত্রের প্রশ্নে। ইসিএভুক্ত সমুদ্রসৈকতে বড় ধরনের সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। সড়ক নির্মাণে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কিনা এবং বালিয়াড়ি কাটার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা– জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের পরিচালক এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার অনুরোধ জানিয়ে বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যান।
তবে কক্সবাজার পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়ার দাবি, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই শহর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সৈকতের বালিয়াড়ি কাটা হয়নি, কোনো গাছও কাটা হয়নি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বেইলি হ্যাচারি থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়কটি সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এখন কলাতলী থেকে লোকালয়ের ভেতর দিয়ে একটি সরু সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল করে। এতে প্রতিদিন ওই অংশে যানজট হয়। তাই ওই অংশে শহর রক্ষার জন্য বাঁধ নির্মাণ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। উন্নয়নের স্বার্থে কিছু বিষয়ে সেক্রিফাইস করতে হবে।’
পাউবো কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলামের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, সৈকতের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা দরকার। পর্যটন মৌসুমে সুগন্ধা, কলাতলী ও লাবনী এলাকায় যানজট হয়। কিন্তু সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ঠিক রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। সৈকতের তীর ঘেঁষে একটি সড়ক অলরেডি আছে, সেটাকে বড় করলেই তো হয়, সৈকতের বালিয়াড়ি কেটে কেন সড়ক তৈরি করতে হবে?