সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের গর্ত থেকে বের হওয়া গ্যাসে জ্বলে ওঠা আগুন এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মঙ্গলবার সকাল ছয়টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পর থেকে এখনো আগুন জ্বলছে । আগামী এক সপ্তাহ পর্যন্ত এভাবে আগুন জ্বলবে বলে জানিয়েছে বাপেক্স। বুধবার বিকালেও বেশ কিছু নমুনা সংগ্রহ করার কথা জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।গ্যাসের প্রবাহ জোর করে বন্ধ করার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) প্রতিনিধিদল।
এদিকে নিরাপত্তার স্বার্থে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বিকল্প লাইনের মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর আশা করছে কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এতে প্রায় চার হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন।
মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাপেক্সের তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল। দলটির সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, ভূগর্ভের উচ্চচাপের গ্যাস কোনো ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসছে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিকুন আরহাম বলেন, আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার ধরন দেখে গ্যাসে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তবে গ্যাসের প্রকৃত উপাদান ও বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করতে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করতে হবে।
তিনি বলেন, প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে নলকূপ খননের সময় গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর উচ্চচাপের গ্যাস বিভিন্ন ফাটল বা দুর্বল স্তর দিয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। পরে কোনো উৎস থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সংস্পর্শে এসে গ্যাসে আগুন ধরে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এসএম নাফিকুন আরহাম আরও বলেন, গ্যাসের চাপ বেশি থাকায় জোর করে প্রবাহ বন্ধ করতে গেলে অন্য কোনো ফাটল দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই আপাতত মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের চাপ ও নির্গমনের মাত্রা বিশ্লেষণ না করে আগুন কত দিন জ্বলবে, তা বলা সম্ভব নয়। স্থানীয় জালিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শামশুল আলম বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আগুনের তীব্রতা বাড়ছে। ওই এলাকায় মাটির নিচে গ্যাসের কোনো পাইপলাইন নেই। তাঁর ধারণা, এটি প্রাকৃতিক গ্যাস। আগুন জ্বলতে থাকায় স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানীতে ছোট ব্রিজসংলগ্ন মো. আবদুল্লাহর বাড়ির আঙিনায় প্রায় ১০ দিন আগে গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য খননকাজ শুরু হয়। প্রায় এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করেও পানি পাওয়া যায়নি। পরে তিন দিন আগে খননকাজ অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরই মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে আগের খনন করা স্থান থেকে হঠাৎ গ্যাস বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে তাতে আগুন ধরে যায়।
বাড়ির মালিক মো. আবদুল্লাহ বলেন, মঙ্গলবার সকাল ছয়টার দিকে আগের খনন করা স্থান থেকে হঠাৎ গ্যাস বের হয়ে আগুন জ্বলে ওঠে। শ্রমিকেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পানি ও বালি ছিটিয়েও আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। ভূগর্ভ থেকে অব্যাহতভাবে গ্যাস বের হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, পাইপলাইনের গ্যাস হলে ভালভ বন্ধ করে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু এখানে ভূগর্ভ থেকে উচ্চচাপে গ্যাস বের হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে আগুন নেভানো যাচ্ছে না।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, আমি প্রতিদিন একাধিকবার ঘটনাস্থলে নিজে গিয়ে পরিদর্শন করছি। মানুষদের সতর্ক করছি। বাপেক্সের প্রতিনিধি দল মঙ্গলবার ও বুধবার বিকেলে কয়েক দফা নমুনা সংগ্রহ করেছেন। নমুনাগুলো তারা তাদের পরীক্ষা গাড়ি নিয়ে পরীক্ষা করার পর আমরা জানতে পারবো কি কারনে এই আগুন।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের নিচে আগুন জ্বলতে থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের ২০০ থেকে ২৫০ মিটারের মধ্যে জনসমাগম না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আছে কি না, তা যাচাই করতে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলকে ডাকা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
কক্সবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উখিয়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার কাইজার নুর বলেন, ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইনের মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। বাপেক্সের কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, বিকল্প লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এ কারণে এলাকাটি ইউএনও পান্না আক্তারের নেতৃত্বে নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় এনে আগুনের কারন জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।