শিরোনাম
◈ জাতিসংঘে কিউবা-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়, অধিবেশন স্থগিত করলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ মেয়াদ শেষের পথে গঙ্গা চুক্তি, সাড়া নেই ভারতের ◈ বাংলাদেশ-নেপালের পর ইউরোপজুড়ে জেন-জি আন্দোলন, ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন হারানোর ক্ষোভে রাজপথে তরুণেরা ◈ এবার এক নারীর সঙ্গে নাটোর-৪ আসনের এমপি আজিজের আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল! ◈ অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপে সেশেলসকে হারালো বাংলাদেশ ◈ এশিয়া কাপ আর্চারিতে কাজাখস্তানকে হারিয়ে বাংলাদেশের স্বর্ণজয় ◈ সেঞ্চুরির দুয়ারে সাদমান, দাপুটে দিনে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২১৩ ◈ আইইডিসিআর পরিচালককে মারধরের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ◈ তরুণ ফুটবলার ইয়ামাল ব্যালন ডি’অর ও ব্যক্তিগত ট্রফি অনেক জিতবে ◈ শাকিলের জানাজায় এমপিকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান, পরে শপিং মলে ভাঙচুর-লুটপাট

প্রকাশিত : ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৩২ বিকাল
আপডেট : ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৪০ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশ-নেপালের পর ইউরোপজুড়ে জেন-জি আন্দোলন, ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন হারানোর ক্ষোভে রাজপথে তরুণেরা

রয়টার্সের প্রতিবেদন: ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষোভ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থানের সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি, আবাসন সংকট এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে নিজেদের কথা গুরুত্ব না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে রাস্তায় নামছে জেন-জি প্রজন্ম। কোথাও বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে, আবার কোথাও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আসছে রাজনৈতিক পরিবর্তন।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালে এবং নেপালে ২০২৫ সালে তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনের পর চলতি বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও জেন-জির বিক্ষোভ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্যারিসের উপকণ্ঠ থেকে সার্বিয়ার বেলগ্রেড, ইতালির মিলান থেকে আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানা—বিভিন্ন শহরে হাজারো তরুণ বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, সাশ্রয়ী আবাসন, দুর্নীতি বন্ধ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের মতামতের গুরুত্ব নিশ্চিত করা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণদের এই আন্দোলনের পেছনে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা বড় ভূমিকা রাখছে। তাদের অনেকেরই ধারণা, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ক্ষোভ থেকে রাজপথে তরুণেরা

Advertisement

ব্রাসেলসে নিজের ডেস্কে বসে দেশের শাসকদের বিরুদ্ধে স্লোগান লিখছিলেন ১৯ বছর বয়সি শিক্ষার্থী মায়া গুরদেল। তার লেখা স্লোগান, ‘আমরা পুড়লে তোমরাও আমাদের সঙ্গে পুড়বে!’ ২০১২ সালের চলচ্চিত্র ‘দ্য হাঙ্গার গেমস’ থেকে নেওয়া এই বাক্যটি বিশ্বের বিভিন্ন তরুণ আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইউরোপজুড়ে জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভেও প্রতিফলিত হচ্ছে ক্ষোভ, হতাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিক্ষোভের সময় হাজারো দোকান ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে স্টান গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করেছে।

ইতালির বিক্ষোভকবলিত মিলানের ২১ বছর বয়সি শিক্ষার্থী কিয়ারার মতে, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে অংশ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, ‘ক্ষোভের বিস্ফোরণ থেকেই এমন সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শাসকশ্রেণি আমার প্রজন্মের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি করেছে, তা হলো ভবিষ্যৎ কল্পনা করার, স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নেওয়া।’

কিয়ারার অভিযোগ, ইতালির শিক্ষার্থীদের এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, ভবনগুলো জরাজীর্ণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কম বেতনের চাকরি এবং শহর থেকে দূরে ছোট, অতিরিক্ত ভাড়ার বাসায় থাকার অনিশ্চয়তা।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও কর্মসংস্থানের সংকট

জেন-জি বিক্ষোভের অন্যতম কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক জরিপ অনুযায়ী, ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের ৪০ শতাংশের উদ্বেগের বড় কারণ মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে ২০২৫ সালে দারিদ্র্য বা সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ছিল ৯ কোটি ২৭ লাখ। এর মধ্যে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের ২৬ দশমিক ৩ শতাংশ এই ঝুঁকিতে ছিলেন। বিপরীতে, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

তরুণদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ, বেশি ভোট দেওয়ার প্রবণতা থাকা বয়স্ক প্রজন্মের আর্থিক ব্যয়ভার ভবিষ্যতে তাদেরই বহন করতে হতে পারে। ফ্রান্সের গবেষণা সংস্থা ওএফসিইর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি। অথচ দেশের মোট সম্পদের ৬০ শতাংশের মালিক এই বয়সি মানুষ।

ফ্রান্সে সরকারি ব্যয়ের সবচেয়ে বড় খাত পেনশন। জনসংখ্যার বার্ধক্য এবং অবসরের বয়স বাড়ানো বা পেনশন সুবিধা কমানোর বিরোধিতার কারণে দেশটির অর্থনৈতিক উৎপাদনের ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন খাতে ব্যয় হতে পারে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিস ও ইতালি জাতীয় আয়ের প্রায় ১৬ শতাংশ সরকারি পেনশনে ব্যয় করে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া, চিলি, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এ খাতে ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশেরও কম।

ফ্রান্স সরকারের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে পেনশন ব্যয় ২ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। একই সময়ে শিক্ষায় ব্যয় কমেছে ০ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ৩২ শতাংশ পেনশন খাতে চলে যাওয়ায় শিক্ষার অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও উপেক্ষিত হওয়ার ক্ষোভ

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের উত্তরের একটি উপশহরের ১৭ বছর বয়সি স্কুলশিক্ষার্থী বিলাল নারজিসি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও কর্মী সংকটের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন। তার ভাষ্য, আগে স্কুলে ইঁদুর দেখা যেত। গত বছর স্কুলের আঙিনায় ছাদের একটি অংশ ধসে পড়লে শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এতে কেউ আহত হয়নি বলে জানান তিনি।

বিক্ষোভের বিষয়ে বিলাল বলেন, ‘এটি দেখিয়েছে, ইউরোপের তরুণেরা ঐক্যবদ্ধ। একটি বিষয়ে আমরা সবাই একমত—তরুণদের সঙ্গে অতিরিক্ত শিশুসুলভ আচরণ করা হয় এবং তাদের কথা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয় না।’

বেলজিয়ামেও স্কুলের পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন মায়া গুরদেল। তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে চেষ্টা করেছিলাম। কেউ আমাদের কথা শোনেনি। মানুষ যখন আবর্জনায় আগুন দিতে বা এ ধরনের কাজ করতে শুরু করল, তখনই শুধু গণমাধ্যম ও ক্যামেরা আমাদের দিকে নজর দিল।’

জার্মানিতেও জীবনযাত্রার ব্যয়, বৈষম্য, যুদ্ধ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা নিয়ে বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।

আলবেনিয়ায় বিক্ষোভ, তরুণদের চোখে বিদেশে ভবিষ্যৎ

আলবেনিয়াতেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ রাজধানী তিরানাসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্নীতির অভিযোগ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ এই আন্দোলনের অন্যতম কারণ।

১৯ বছর বয়সি স্থাপত্যের শিক্ষার্থী জাইকে কুর্তি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী ১৩০ দিন ধরে আমাদের কথা শোনেননি।’

তিনি বলেন, ‘আপনি যদি আলবেনিয়ার কোনো শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করেন, সে ভবিষ্যৎ কোথায় দেখে, সবাই বলবে—দেশের বাইরে। এখানে আপনার প্রতিভা থাকলেও কোনো সংযোগ বা প্রভাবশালী পরিচয় থাকা ব্যক্তি সব সময় আপনার চেয়ে এগিয়ে যাবে।’

এই বক্তব্য তরুণদের মধ্যে কর্মসংস্থান ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিয়ে হতাশার চিত্র তুলে ধরে। নিজ দেশে ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের বিদেশমুখী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও বাড়াচ্ছে।

সার্বিয়ায় আন্দোলনের পর নতুন চ্যালেঞ্জ

প্রায় দুই বছর ধরে দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা বিস্তারের অভিযোগে আন্দোলনের পর সার্বিয়ায় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের নেতা আলেক্সান্দার ভুচিচের পতন ঘটেছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কাছে এটি বড় অর্জন।

শিক্ষার্থী আন্দোলনকারী স্তাসা পিলেতিচ বলেন, ‘ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আমরা স্বস্তি ও স্বাধীনতার অনুভূতি পেয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিজয়ের অনুভূতি পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে, অবশেষে আমরা বিক্ষোভ থেকে দায়িত্ব গ্রহণের পর্যায়ে পৌঁছেছি।’

তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশ পরিচালনার কঠিন দায়িত্বও সামনে এসেছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও তাদের প্রার্থীদের প্রশাসন পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন নন আরেক আন্দোলনকারী লুকা স্তোয়াকোভিচ। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ আমাদের কোথায় নিয়ে এসেছে, তা তো আমরা দেখেছি।’

কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে জেন-জি আন্দোলন?

জেন-জি বলতে সাধারণত ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে বোঝানো হয়। এই প্রজন্মের আন্দোলন শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের তরুণদের বিক্ষোভের পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের অসন্তোষ সামনে এসেছে।

আন্দোলনগুলোর দাবিতে দেশভেদে পার্থক্য থাকলেও কয়েকটি বিষয়ে মিল রয়েছে—শিক্ষার মান, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের অংশগ্রহণ। অনেকের কাছে সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়; নিজেদের কথা শোনা হচ্ছে না এবং ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে—এমন অনুভূতিও ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।

ইউরোপজুড়ে এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সরকারগুলো তরুণদের দাবির জবাবে কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর। কোথাও বিক্ষোভ রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারলেও সেই পরিবর্তনকে কার্যকর নীতি ও বাস্তব উন্নয়নে রূপ দেওয়া হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ। 

  • সর্বশেষ