অনুজ দেব বাপু, চট্টগ্রাম : আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের মন্ডপে মন্ডপে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রতিমা তৈরির শিল্পীরা। কে কত ভালো প্রতিমা তৈরি করে ভক্তদের হৃদয় ছুঁতে পারেন তারই প্রতিযোগিতা চলছে মন্ডপে মন্ডপে। সামর্থ্য অনুযায়ী স্থানীয় এবং অন্য জেলা থেকে শিল্পী এনে প্রতিমা তৈরি করছেন বিভিন্ন পূজামন্ডপ কমিটি।
একেকটি প্রতিমার বাজেট ৩০-৪০ হাজার থেকে শুরু করে ২-৩ লক্ষ টাকা। গত এক-দেড় মাস আগে থেকে প্রতিমাশিল্পীরা শুরু করেন দুর্গাসহ বিভিন্ন প্রতিমা তৈরির কাজ। এখন সবগুলো মন্ডপেই প্রতিমা তৈরি শেষ। বর্তমানে শিল্পীদের রংতুলির আঁচড়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে একেকটি প্রতিমা। দুর্গাই শুধু নয়, রংয়ের কারুকাজে শিব, অসুর, সিংহ, মহিষ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক আর গণেশের মূর্তিও হয়ে উঠছে বর্ণিল। নগরীর হাজারী লেনের মহামায়া স্টুডিও, সদরঘাটের লোকনাথ শিল্পালয়, নটরাজ শিল্পালয়, স্বর্গীয় দুলাল পাল প্রতিমালয়, দেওয়ানজীপুকুর পাড়ের রূপশ্রী শিল্পালয়সহ সব প্রতিষ্ঠানের শিল্পীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার দেবীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে বৃহৎ এই উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। তাই দেবী দুর্গার আগমনে দম ফেলবার ফুসরত নেই মৃৎশিল্পীদের। বেশিরভাগ মন্ডপে পূজা উপলক্ষে মন্ডপ তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। জেলা, উপজেলা ও মহানগরীর মন্ডপ, প্রতিমা তৈরির মাঠ ও মন্দিরগুলোতে এখন চলছে পূজা আয়োজনের শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতি। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে উৎসব।
নগরীর বিভিন্ন প্রতিমালয় ও মন্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, রংতুলির আঁচড়ে একেকটি প্রতিমা ফুটিয়ে তোলার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মৃৎশিল্পীরা। প্রায় প্রতিটি শিল্পালয়ে ১৫ থেকে ৪০টি পর্যন্ত প্রতিমা তৈরি করা হয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিমাই বিভিন্ন পূজা মন্ডপের আয়োজকদের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। প্রতিমার কাজ দ্রুত শেষ করতে সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করছেন কারিগররা। সব প্রতিমার মাটির কাজ শেষে শুরু হয়েছে রং ও সাজসজ্জার কাজ।
মৃৎশিল্পীরা জানান, বিভিন্ন শিল্পালয়ে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে উপকরণগুলোর দাম দ্বিগুণ হওয়ায় সংকটের মুখে পড়ছে এ শিল্প। প্রতিমা তৈরির কাজে এখন খরচ বেশি, মুনাফা কম। কারিগরের সমস্যাও প্রকট। প্রত্যাশা অনুযায়ী মূল্যায়ন না থাকায় পরবর্তী প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছে।
মৃৎশিল্পীরা আরও জানান, প্রতিমা বানাতে প্রয়োজন হয় পরিমাণ মতো কাঠ, বাঁশ, তারকাটা, রশি, খড়কুটো, এঁটেল ও বেলে মাটি, রং, ধুতি, চুল ও হাতিয়ার। আবার শুধু খড়কুটো ও মাটি দিয়েও করা যায়। প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রে উচ্চতা ও মানভেদে দামের ভিন্নতা রয়েছে। চুক্তি ও মজুরি দুভাবেই প্রতিমা তৈরি হয়। চাহিদা অনুযায়ী ক্যাটালগ দেখে আবার কখনো নিজের মতো করে প্রতিমাগুলো তৈরি করেন শিল্পীরা। ক্যাটালগ দেখে করতে পরিশ্রম একটু বেশি হয়। চাহিদা অনুযায়ী সর্বনিম্ন ৩০-৪০ হাজার থেকে ২-৩ লাখ টাকার প্রতিমা তৈরি করেন শিল্পীরা। পারিবারিক সূত্রে ছোটবেলা থেকেই প্রতিমা তৈরির কাজ করে আসছেন অনেকে। তাদের পূর্বপুরুষরাও এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
মৃৎশিল্পী পরেশ পাল জানান, নিজের পরিবারের কেউ কারিগর নন বা কেউ এ কাজের সাথে যুক্ত নন, শুধুমাত্র তিনিই প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। চট্টগ্রামে প্রায় ১৭ বছর ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তিনি। এবার ১৮টি মন্ডপের জন্য প্রতিমা তৈরি করেছেন। সবগুলো প্রতিমার কাজই প্রায় শেষ। মাটি আর রঙের কাজ শেষে প্রতিমা সাজানোর কাজ চলছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ ব্যানার্জি আমাদেরসময়ডটকমকে বলেন, এবার নগরীর ১৬ থানায় পূজামন্ডপের সংখ্যা ২৯৪টি। নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য প্রত্যেক পূজা মন্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের পাশাপাশি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠনের বিষয়ে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি। এছাড়া মহানগরের সব থানা কমিটিকে সতর্ক থাকা এবং প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মেয়র, সিএমপি কমিশনার, জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বৈঠক করে পূজা ও প্রতিমা বিসর্জন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট নিতাই প্রসাদ ঘোষ বলেন, পূজার সার্বিক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে আলোচনা হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে বলে আমরা আশাবাদী।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. রাসেল বলেন, পূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
নগরীর ঐতিহ্যবাহী পূজামন্ডপ পি কে সেন ভবন পূজা উদযাপন পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক রোহিত চৌধুরী জানান, এবার ‘দুর্গাভক্তি তরঙ্গিনী’ শিরোনামে কলকাতার বড়িশার ঐতিহ্যবাহী রায় পরিবারের পুজো ও ইতিহাসকে তুলে ধরা হবে। মাতৃরূপায়নে প্রহ্লাদ পাল। পূজার বাজেট সাড়ে ৪-৫ লক্ষ টাকা।
আনোয়ারার ঐতিহ্যবাহী পড়ৈকোড়া বিরেশ^র ঘোষ বাড়ি পূজা মন্ডপের মুখ্য সমন্বয়কারী অর্পণ ঘোষ জানান, সর্বশেষ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রতিমার রংতুলির কাজ গত মঙ্গলবার শেষ হয়েছে। হাজার থিমের ভিড়ে আমরা এবার মা দুর্গাকে সাত্ত্বিকরূপে মেয়ের আদরে বরণ করতে চলেছি। মা যেখানে ঘরের মেয়ে হয়ে সাবেকিরূপে ঘোষ বাড়িতে আসছে। তাই এবার আমরা পূজার থিম নির্বাচন করেছি ‘সাবেকিয়ানা’। প্রণয় দাশের আলোক পরিকল্পনায় এবারের প্রতিমা তৈরি করেছেন পরেশ পাল। এবার মন্ডপের পূজার বাজেট প্রায় ৩ লক্ষ টাকা।
দক্ষিণ আগ্রাবাদ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ডা. মানস শেখর জানান, আমাদের ঐতিহ্যবাহী পূজা এবার ৩০ বছরে পড়েছে।
এবারের পূজার থিমে ‘চিত্রগুপ্ত’ প্রতীকী দরবার হিসেবে উঠে আসবে, যেখানে মানুষ নিজের কর্মের মুখোমুখি দাঁড়াবে। যেখানে প্রতিটি দর্শনার্থী বুঝবে- পাপ ও পুণ্যের বিচার কোনো দূর আকাশে নয়, প্রতিদিন নিজের ভেতরেই হয়। বাঁধন কান্তি দেব ও নিশান শীলের ভাবনায় এবারের প্রতিমা তৈরি করেছেন সুকান্ত সুশীল। পূজার বাজেট ৬-৭ লক্ষ টাকা।
জেলা ও মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলায় এবার পূজার সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর জেলায় পূজা হয়েছিল ২ হাজার ২০২টি। এবার ৭২টি বেড়ে হবে ২ হাজার ২৭৪টি। এর মধ্যে প্রতিমা পূজা ১ হাজার ৬৫৫টি এবং ঘট পূজা ৬১৯টি। দক্ষিণ চট্টগ্রামের আট উপজেলায় এবার মোট ১ হাজার ৩৯৬টি পূজার মধ্যে প্রতিমা পূজা ৭৯৬টি এবং ঘট পূজা ৬০০টি। উত্তর চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় ৮৭৮টি পূজার মধ্যে প্রতিমা পূজা ৮৫৯টি এবং ঘট পূজা ১৯টি। মহানগরে ২৯৪টি পূজার মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক ৮৭টি পূজার আয়োজন হবে কোতোয়ালি এলাকায়। জেলায় প্রতিমা পূজার হিসাবে সবচেয়ে বেশি রাউজানে ২৩৩টি পূজার আয়োজন হচ্ছে। আর প্রতিমা ও ঘট দুই ধরনের পূজা মিলিয়ে সর্বোচ্চসংখ্যক পূজার আয়োজন হবে আনোয়ারায়।
গত ৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসন আয়োজিত এক প্রস্তুতি সভায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। গত ৪ অক্টোবর জেলার ১৭টি থানার পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে জেলা পুলিশ। সভায় পূজাকে কেন্দ্র করে পূজামন্ডপের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, সিসি ক্যামেরা, অগ্নিনিরাপত্তা, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধসহ বিভিন্ন বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া ৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ আয়োজিত মতবিনিময় সভায় সবার সহযোগিতায় এবারও চট্টগ্রামে আনন্দঘন পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
এদিকে নগরীর বিভিন্ন পরিচিত মার্কেটে দুর্গাপূজার শেষ সময়ের কেনাকাটায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে টেরিবাজার, রিয়াজউদ্দিন বাজার, নিউমার্কেট, সানমার ওশান সিটি, আফমি প্লাজা, মিমি সুপার মার্কেট, আমিন সেন্টার, বালি আর্কেডসহ নগরীর বিভিন্ন শপিংমলগুলোতে দেখা গেছে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়।