‘আমি তোর সাথে যাবোরে, ও সোনার বাজানরে। আমি আর কিছু চাই না।’ ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে এ আকুতিই জানাচ্ছিলেন অসুস্থ মুন্নি খাতুন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর ছেলে সাগর হোসেন। মাকে সঙ্গে রাখতে চান না তিনি। তাঁর সাফ কথা, মায়ের ভরণপোষণের খরচ দেবেন, কিন্তু তাঁকে নিজের সঙ্গে রাখা সম্ভব নয়।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে গত বৃহস্পতিবার মা-ছেলের বিরোধ নিয়ে শুনানিতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
শুনানিতে ইউএনও সেলিম আহমেদ ছেলেকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু সাগর নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, মাকে তাঁর সঙ্গে থাকতে দিলে আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
আমার পর্যবেক্ষণে এটি মূলত আর্থিক সমস্যা নয়, মানসিক সমস্যা। মা ভরণপোষণের টাকা বা আর্থিক সুবিধাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁর একটাই চাওয়া, ছেলের সঙ্গে থাকবেন। অন্যদিকে ছেলে মায়ের খরচ দিতে রাজি, কিন্তু তাঁকে সঙ্গে রাখতে চান না। কেন তিনি (সাগর) এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা বারবার জানতে চেয়েছি। কিন্তু তিনি কারণটি স্পষ্ট করে বলেননি।---সেলিম আহমেদ, ইউএনও, সাঁথিয়া
৫৫ বছর বয়সী মুন্নি খাতুনের সঙ্গে এ বিরোধ নিয়ে কিছু বলতে নারাজ সাগর (৩২)। তবে স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মা-ছেলের এ বিরোধের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি ও অভিমান। সাগরের বিয়ের পর থেকে তাঁর স্ত্রী ও মায়ের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। পরে এ বিরোধে সাগরের বোনও মায়ের পক্ষ নিয়ে জড়ালে অশান্তি আরও বাড়ে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে কয়েক দফা সমাধানের চেষ্টা করেও এ বিরোধ মেটেনি।
সাগর হোসেন সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) গ্রাম পুলিশ। তাঁর বাবা সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। বোনের বিয়ে হয়েছে। মুন্নি খাতুন এখন ছেলের সঙ্গে স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িতে থাকেন না, থাকেন মেয়ের বাড়িতে। মা ও ছেলে দুজনেরই কিছু জমিজমা রয়েছে। মুন্নি খাতুনের নিজের নামেও প্রায় ১০ লাখ টাকার জমি আছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী। তাঁরা বলছেন, মা-ছেলের এ বিরোধে মূলে আর্থিক অনটন নয়, বরং একসঙ্গে থাকা নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়েন।
‘মায়ের প্রতি অভিমান থেকে এমন সিদ্ধান্ত’
নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান বলেন, মা ও ছেলের বিরোধ মেটাতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছেন; কিন্তু দুই পক্ষেরই কিছু ভুল রয়েছে। ইউএনওর কার্যালয়ে শুনানির পর আজ শুক্রবারও তিনি সাগরের সঙ্গে কথা বলেছেন।
চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, সাগর তাঁকে জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকে তাঁর স্ত্রী ও মায়ের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। এ নিয়ে বিরোধ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সাগরের বোন মায়ের পক্ষ নিয়ে ঝগড়ায় জড়ান। এসব ঘটনার জের ধরে মুন্নি খাতুন বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেন। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করলে সাগরকে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল। এর পর থেকে মায়ের ওপর তাঁর অভিমান আরও বেড়ে যায়।
হাফিজুর রহমান বলেন, ‘মায়েরও কিছু ভুল থাকতে পারে; কিন্তু একমাত্র ছেলে হয়ে মাকে নিজের কাছে রাখতে না চাওয়াটা মেনে নেওয়া যায় না। আমি সাগরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। আশা করছি, তাঁকে রাজি করিয়ে বিষয়টির সমাধান করতে পারব।’
সাগরের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে মায়ের খরচ আমি দেব। কিন্তু আমার সঙ্গে রাখা সম্ভব না।’
‘সমস্যা আর্থিক নয়, মানসিক’
ইউএনও সেলিম আহমেদ বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে মুন্নি খাতুন ও সাগরের মামা তাঁর কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে মুন্নি খাতুন জানান, ছেলে তাঁকে বাড়িতে রাখেন না, ভরণপোষণও দেন না। তিনি অসুস্থ, জীবনের বাকি সময় ছেলের সঙ্গে থাকতে চান। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাগরকে শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়।
ইউএনও বলেন, শুনানিতে সাগরকে মা-বাবার ভরণপোষণসংক্রান্ত আইন সম্পর্কে বোঝানো হয়েছে। মানবিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁকে বোঝানোর পরও সাগর মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি হননি। একপর্যায়ে জানান, তিনি মায়ের যাবতীয় খরচ দিতে রাজি, কিন্তু একই বাড়িতে থাকতে রাজি নন।
সেলিম আহমেদ বলেন, ‘আমার পর্যবেক্ষণে এটি মূলত আর্থিক সমস্যা নয়, মানসিক সমস্যা। মা ভরণপোষণের টাকা বা আর্থিক সুবিধাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁর একটাই চাওয়া, ছেলের সঙ্গে থাকবেন। অন্যদিকে ছেলে মায়ের খরচ দিতে রাজি, কিন্তু তাঁকে সঙ্গে রাখতে চান না। কেন তিনি (সাগর) এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা বারবার জানতে চেয়েছি। কিন্তু তিনি কারণটি স্পষ্ট করে বলেননি।’
ইউএনও আরও বলেন, মুন্নি খাতুন একাধিক সরকারি ভাতা ও সহায়তা পান। আর্থিক অসচ্ছলতা থাকলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা যেত। কিন্তু এখানে মায়ের চাওয়া ছেলের সঙ্গে থাকা। শুনানি শেষে সাগর মাকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্তও হয়েছিলেন। তাই মায়ের প্রতি তাঁর কোনো অনুভূতি নেই, এমনটা বলা যায় না। তবে মাকে সঙ্গে রাখতে না চাওয়ার পেছনে আরও কোনো ঘটনা আছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আপাতত সাগরের ওপর আর চাপ না দিয়ে কিছুদিন পর মা-ছেলেকে আবারও শুনানিতে ডেকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন ইউএনও।
সূত্র: প্রথম আলো