কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৩) হত্যাকাণ্ডের রহস্যজট খুলতে শুরু করেছে। গ্রেপ্তার চালক মো. সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে, বিপদ জেনেও কেন ঘটনাস্থলে সিএনজি অটোরিকশা ফেলে যেতে হলো।
ঘটনাস্থলে ফেলে যাওয়া সিএনজি অটোরিকশার সূত্র ধরে শনাক্ত এবং গ্রেপ্তার হন চালক সুমন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাজমিন কুমিল্লা শহরের বাসায় ফিরতে গভীর রাতে ওই সিএনজিতে উঠলে একা পেয়ে ভিন্ন ফন্দি করেন সুমন। তাজমিনের হাতে থাকা আইফোনের প্রতিও তার লোভ জাগে। সিএনজিতে ওঠার পরই উল্টো পথে সিএনজি অটোরিকশা চালাতে থাকে সে। জনমানবহীন এলাকা খুঁজতে থাকেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, অনেকক্ষণ চলার পর ওই ধানক্ষেতের পাড়ে গিয়ে সিএনজি থামে। পরে ধানক্ষেতে দেবে যায় সিএনজি অটোরিকশা। সে সময় সুমন নেশাগ্রস্ত ছিল। হত্যার পর তাই বাধ্য হয়ে ঘটনাস্থলে সিএনজি অটোরিকশা ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি।
পুলিশের দাবি, আর কেউ জড়িত কিনা এবং কী কারণে তাজমিনকে হত্যা করা হয়েছে, তা তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত প্রকাশ করা যাচ্ছে না। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন গ্রেপ্তার সুমন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত, এবং সে একাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ এখনো চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুলিশ অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে। আটক অটোরিকশাচালককে জিজ্ঞাসাবাদে অনেকগুলো তথ্য পাওয়া গেছে। তাজমিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
শনিবার (১০ অক্টবর) সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তাজমিন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে সে বাসা থেকে বের হয়েছিল।
পরে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে, ওই দিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।
পুলিশ জানায়, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে তাজমিন। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা যায়।
পরে হোটেলের আশপাশের বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজে মোবাইল ফোন হাতে ও কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলিয়ে তাকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। একপর্যায়ে সে সড়কের দিকে চলে যায়। এরপর তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, কুমিল্লা শহরের রেসকোর্সের বাসায় ফিরতে একাই ওই সিএনজি অটোরিকশায় ওঠেন তাজমিন। তখন হাতে থাকা আইফোন দেখতে পান চালক সুমন। সুমন মাদকাসক্ত অবস্থায় সিএনজি অটোরিকশা চালান। শহরের পথে না গিয়ে ভিন্ন পথে নিয়ে যান তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করে পুলিশ।
অটোরিকশাটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার রাতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি জানান, তার অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন। সুমন লালমাই উপজেলার বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।
এরপর সুমনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালিয়ে শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেলে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
সুমন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে বিয়ে করে তিনি ঘরজামাই হিসেবে লালমাইয়ের জয়নগর গ্রামে বসবাস শুরু করেন। প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে তিনি শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবী, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলের কাছে গিয়ে তারা ধানক্ষেতের পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে থাকতে দেখেন। আশপাশের ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির আলামত দেখতে পান। পরে জমিতে থাকা আলামত অনুসরণ করে সামনের একটি ধানক্ষেতে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে নিহতের বাবা আবদুল আলীম লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
তাজমিন কেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে গিয়েছিল, সেখানে কার সঙ্গে দেখা করেছিল এবং কুমিল্লায় ফেরার পর কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। তার নতুন বা পুরোনো পরিচিতদের কেউ এ ঘটনায় জড়িত কি না, তা-ও যাচাই করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হত্যার আগে তাজমিন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কি না, তা মেডিকেল প্রতিবেদনের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার তার মরদেহ যশোরের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া আইফোনের তথ্য, কললিস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। শনিবার সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।’ সূত্র: কালবেলা