এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করছে। এসব দুর্যোগের সামনে উপকূলের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সুরক্ষা-কবচগুলোর একটি সৃজিত ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় বনভূমি। অথচ সেই বনভূমি সম্প্রসারণ ও ক্ষতিগ্রস্ত বন পুনরুদ্ধারে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নেই কোনো সমন্বিত নতুন প্রকল্প বা কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি।
বন বিভাগের তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, উপকূলীয় বনায়নের মাধ্যমে গত কয়েক দশকে দেশের উপকূলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সবুজ বেষ্টনী গড়ে উঠেছে। ১৯৬৪ সাল থেকে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনায়ন সম্প্রসারণের ফলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায়ও এর ভূমিকা তৈরি হয়েছে। অনেক চরভূমি স্থিতিশীল হয়েছে, কোথাও কোথাও নতুন ভূমি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সবুজ বেষ্টনীর একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক গাছ নষ্ট হচ্ছে। নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে বনভূমি। বাড়ছে লবণাক্ততা। কোথাও অতিরিক্ত পলি জমে নদী-খাল ভরাট হচ্ছে, আবার কোথাও ভূমির পরিবর্তিত উচ্চতার কারণে গাছ প্রয়োজনীয় পানি পাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত মানবিক চাপ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত।
৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটারের উপকূল
সরকার দেশের ৭১০ কিলোমিটার উপকূলীয় তটরেখার ১৯ জেলার ৪৮ উপজেলাকে উপকূলীয় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর আয়তন প্রায় ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৩০ শতাংশ। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করে।
এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জানমাল রক্ষায় উপকূলীয় বনভূমির গুরুত্ব শুধু পরিবেশগত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্নও। অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশবিদদের মতে, দেশের সুনীল অর্থনীতি গড়ে তুলতেও উপকূলীয় বনায়নকে আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে।
উপকূলের বন ঝড়ের গতিবেগ ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে গাছের শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখায় নদী ও সমুদ্রের ভাঙন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। ম্যানগ্রোভ বন মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজনন ও আশ্রয়স্থল হিসেবেও কাজ করে। ফলে একটি উপকূলীয় বন ধ্বংস হলে ক্ষতিটা শুধু গাছ হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
আড়াই লাখ হেক্টরের বনায়নে ক্ষয়
দেশের উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন সময়ে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর বনভূমি গড়ে উঠেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ হেক্টর এলাকায় লবণাম্বুজ বন, সাড়ে আট হাজার হেক্টর এলাকায় নন-ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বন, প্রায় তিন হাজার হেক্টরে গোলপাতা এবং প্রায় ২০০ হেক্টরে বাঁশসহ বিভিন্ন প্রজাতির বনায়ন করা হয়েছে। উপকূলীয় বাঁধ ও বিভিন্ন সড়কের পাশেও বিপুলসংখ্যক গাছ লাগানো হয়েছে।
কিন্তু পুরোনো বনভূমির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পূর্বে সৃজিত উপকূলীয় বনভূমির অন্তত ৩০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে বিনষ্ট হয়েছে। প্রতিটি বড় ঘূর্ণিঝড়ের পর বনভূমির ক্ষয়ক্ষতি হলেও সেই ক্ষতি পূরণে ধারাবাহিক ও পর্যাপ্ত পুনর্বনায়ন কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না।
ফলে যে বনভূমি দুর্যোগের সময় উপকূলের মানুষের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করে, সেই ঢালই ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আম্পানে ক্ষতির চিত্র
উপকূলীয় বনভূমির দুর্বল হয়ে পড়ার চিত্র উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণাতেও। কয়েক বছর আগে ভারত, ব্রাজিল ও মালয়েশিয়ার গবেষকদের একটি গবেষণায় সুন্দরবনসহ বরিশাল অঞ্চলের উপকূলীয় বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ারের Estuarine, Coastal and Shelf Science জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় আম্পানসহ সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের বনাঞ্চলের ৫৬ দশমিক ১৯ শতাংশ এলাকায় ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়।
গবেষণায় উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নদী-খাল ভরাট এবং চরাঞ্চলে পলি জমে ভূমির পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলোও বনভূমির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সিডর, ইয়াস, বুলবুল ও আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে দক্ষিণ উপকূলের বিভিন্ন বনাঞ্চলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুয়াকাটা সংলগ্ন উপকূলীয় বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও উদ্বেগজনক। ঝাউবন, নারকেলবাগান, ইকোপার্ক ও লবণাম্বুজ বনাঞ্চলের বিভিন্ন অংশ ভাঙন ও ঝড়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নদীভাঙনেও হারাচ্ছে বন
উপকূলীয় বনের জন্য আরেকটি বড় হুমকি নদীভাঙন। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবছর উপকূলীয় এলাকায় বিপুল পরিমাণ বনভূমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় উপকূলীয় বনায়ন-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে ১৯৭৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় এলাকায় বনভূমি হ্রাসের তথ্যও উঠে এসেছে।
নদীভাঙনে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার হেক্টর জমি হারিয়ে যাওয়ার তথ্যও বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। এর প্রভাব পড়ে বসতি, কৃষিজমি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকার ওপর। উপকূলীয় বনায়নের ক্ষেত্রে এই ভাঙন আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি বনভূমি নদীগর্ভে চলে গেলে একই জায়গায় নতুন করে বন গড়ে তুলতে সময় লাগে বহু বছর।
ভোলার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি ভূমি পরিবর্তনের চিত্র রয়েছে। উপগ্রহভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে ১৯৭৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ভোলার মূল ভূখণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নদীভাঙনের পাশাপাশি চর জাগলেও নতুন চরকে স্থিতিশীল করতে পরিকল্পিত বনায়ন জরুরি।
২৫ কোটি গাছের কর্মসূচিতে উপকূল কোথায়?
দেশে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি নেওয়া হলেও এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে ঠিক কত গাছ লাগানো হবে, কত হেক্টর জমিতে বনায়ন হবে কিংবা কোন কোন ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার করা হবে—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়।
বন অধিদপ্তরের কোস্টাল সার্কেলের সংশ্লিষ্ট বন সংরক্ষকের সঙ্গে কথা বললে তিনি উপকূলে নতুন করে আলাদা কোনো বনায়ন কর্মসূচির কথা নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় বন অধিদপ্তর যে সাড়ে তিন কোটি গাছ লাগাবে, তার একটি অংশ উপকূলীয় অঞ্চলেও লাগানো হবে বলে তিনি আশাবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু কত হেক্টর এলাকায় কতসংখ্যক গাছ লাগানো হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য যদি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, এলাকা ও অর্থায়ন নির্ধারণ না থাকে, তাহলে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সুফল উপকূলীয় বনভূমি পুনরুদ্ধারে কতটা কার্যকর হবে?
চর জাগছে, বন ফিরছে না
উপকূলীয় বনায়নের অন্যতম সাফল্য হলো নতুন জেগে ওঠা চরকে স্থিতিশীল করা। গাছের শিকড় মাটিকে ধরে রাখে, পলি আটকে ভূমিকে শক্ত করে এবং সময়ের সঙ্গে নতুন চরকে বসতি, কৃষি ও অন্যান্য ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে সহায়তা করে।
নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকূলীয় চরগুলোতে পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে ভূমিকে স্থিতিশীল করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এ কাজকে বিচ্ছিন্ন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি উপকূলীয় ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবন সংরক্ষণেও আরও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
বনায়ন মানেই শুধু গাছ লাগানো নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় বনায়নের ক্ষেত্রে শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির গাছ টিকবে, লবণাক্ততা কতটা, জোয়ার-ভাটার প্রভাব কেমন, নদীভাঙনের প্রবণতা কোথায়, স্থানীয় জনগোষ্ঠী কীভাবে যুক্ত হবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সামাজিক বনায়নের ক্ষেত্রেও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ রয়েছে। দরিদ্র ও ভূমিহীন জনগোষ্ঠীকে বনায়নের সঙ্গে যুক্ত করলে একদিকে যেমন বন রক্ষা সহজ হয়, অন্যদিকে তাদের জীবিকারও সুযোগ সৃষ্টি হয়। অতীতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক ও গোষ্ঠীভিত্তিক বনায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
অর্থাৎ উপকূলীয় বনায়নকে কেবল পরিবেশগত কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, দারিদ্র্য বিমোচন, জীবিকা, মৎস্যসম্পদ, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সুনীল অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
এখনই সমন্বিত পরিকল্পনার দাবি
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এই অঞ্চলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আঘাত যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে লবণাক্ততা ও নদীভাঙনের চাপ। এমন পরিস্থিতিতে উপকূলীয় বনভূমি কমে গেলে দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তাই ক্ষতিগ্রস্ত বনভূমি চিহ্নিত করে পুনর্বনায়ন, নতুন জেগে ওঠা চরে পরিকল্পিত ম্যানগ্রোভ সৃষ্টি, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় সবুজ বেষ্টনী, উপকূলীয় বাঁধের পাশে উপযুক্ত প্রজাতির বৃক্ষরোপণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের মোট বনায়ন কর্মসূচির সঙ্গে উপকূলীয় বনায়নকে একীভূত করলেও চলবে না; উপকূলের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনায় আলাদা লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
কারণ উপকূলীয় বন কেবল বন নয়—এটি ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে ঢাল, নদীভাঙনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল, মৎস্যসম্পদের প্রজননক্ষেত্র এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার অংশ। সেই প্রাকৃতিক ঢাল দুর্বল হওয়ার আগেই নতুন করে বনায়ন ও পুরোনো বন পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতের দুর্যোগে এর মূল্য দিতে হতে পারে আরও বেশি।