শিরোনাম
◈ মানসিক সমস্যায় আক্রান্তদের অবহেলা নয়, সম্মান ও সহমর্মিতা দেখাতে হবে: রাষ্ট্রপতি ◈ মানব পাচার নির্মূলে ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ : মার্কিন প্রতিবেদন ◈ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী ◈ সাইকেল চালিয়ে দেশের প্রথম চার লেনের সাইকেল ট্র্যাক উদ্বোধন করলেন অর্থমন্ত্রী ◈ রেলের টিকিট কালোবাজারি ও পাথর নিক্ষেপ বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক মাসের দায়িত্ব চাইলেন মাহবুব কবীর মিলন ◈ ম‌্যা‌ডিসন ১০ বছর পর মা‌ঠে ফিরে লজ্জার রেকর্ড কর‌লেন ◈ চাঁদা না পেয়ে ট্রাক এনে লুটপাট, সরকার কেন চাঁদাবাজি-দখল থামাতে পারছে না? ◈ অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ইতিহাসে এবারই প্রথম, একাদশের সবার বয়স ৩০ বছ‌রের উপ‌রে ◈ অ‌স্ট্রেলিয়ার সাম‌নে দিশাহারা বাংলা‌দেশ, নারী দল হার‌লো ৭ উইকেটে ◈ রাজধানীতে মুষলধারে বৃষ্টি, জলাবদ্ধতায় বেড়েছে যানজট

প্রকাশিত : ০৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:২৯ বিকাল
আপডেট : ০৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৩৪ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, খুন-চাঁদাবাজি-ছিনতাই থেকে মাদক কারবারে তরুণদের ব্যবহার

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনায় কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করে অপরাধ বিস্তারের অভিযোগ ক্রমেই সামনে আসছে। খুন, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে তাদের ব্যবহার করছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র। নগরীর পাশাপাশি জেলা পর্যায়েও কিশোরদের সংঘবদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অপরাধী চক্রগুলো কিশোরদের ব্যবহার করছে তুলনামূলক সহজে সংগঠিত করা যায় এবং অপরাধে যুক্ত করার সুযোগ থাকে—এমন বিবেচনায়।

খুলনা জেলা পুলিশের প্রাথমিক তালিকায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ২৫০ কিশোরের নাম এসেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক। তাঁর দাবি, নগরীর বাইরে থানা পর্যায়েও কিশোরদের নিয়ে সংঘবদ্ধ বলয় তৈরির চেষ্টা চলছে। মাদক নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন অপরাধে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কিশোর গ্যাং দমনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশও এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করেছে বলে জানিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি কিশোর অপরাধের পেছনে থাকা মাদক, রাজনৈতিক প্রভাব, অপরাধী চক্রের আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন আইনজীবী ও সমাজসংশ্লিষ্টরা।

২৫০ কিশোরের প্রাথমিক তালিকা

Advertisement

খুলনা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, কিশোর গ্যাং নির্মূলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয়েছে। জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ২৫০ কিশোরের একটি প্রাথমিক তালিকা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নগরীর বাইরেও থানা পর্যায়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কিশোরদের সংঘবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। তাদের মাধ্যমে মাদক কারবার, মারামারি ও অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে।

পুলিশের তথ্যানুযায়ী, অতীতে খুলনা নগরীতে ‘ডেঞ্জার বয়েজ’, ‘গোল্ডেন বয়েজ’, ‘টিপসি বয়েজ’ ও ‘কিং অব রূপসা’ নামে কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। পুলিশের ভাষ্য, এসব গ্রুপের অনেক সদস্য পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অপরাধী ও সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে।

বর্তমানে খুলনার অপরাধজগতে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব গ্রুপের অপরাধ কর্মকাণ্ডে কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে।

অপরাধের ‘সহজ হাতিয়ার’ কিশোররা

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্কুল থেকে ঝরে পড়া, মাদকাসক্ত, পারিবারিক নজরদারির বাইরে থাকা এবং অপরাধপ্রবণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা কিশোরদের একটি অংশ ধীরে ধীরে অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। শুরুতে ছোটখাটো অপরাধে যুক্ত হলেও পরে তাদের কেউ কেউ মাদক কারবার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি এমনকি হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।

অপরাধী চক্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের মিছিল-মহড়া কিংবা আধিপত্য বিস্তারের ঘটনায় তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও পাওয়া যায়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধ পরিচালনা করলে মূল হোতারা অনেক সময় আড়ালে থাকার সুযোগ পায়। ফলে কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িত মূল পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা ও আইনের আওতায় আনা জরুরি।

২৪ ঘণ্টা অভিযান

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। কিছু ফলও পাওয়া গেছে। দ্রুত খুলনায় কিশোর গ্যাংসহ সন্ত্রাসী বাহিনীর দৌরাত্ম্য কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এসআরবি-৬-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ বলেন, সন্ত্রাসীরা বর্তমানে বিভিন্ন অপরাধে কিশোরদের সম্পৃক্ত করছে। কিশোরদের ব্যবহার করে অপরাধ করানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এসআরবি-৬-এর অভিযান ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত রয়েছে। খুলনাকে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে।

সামাজিক সংকটও দায়ী

খুলনা বারের সিনিয়র আইনজীবী শাহ আলমের মতে, কিশোর অপরাধ এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক সংকট। পারিবারিক বন্ধনের শিথিলতা, সঙ্গদোষ, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকের সহজলভ্যতা, নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার ঘাটতি এবং সুস্থ বিনোদনের অভাব কিশোরদের অপরাধে ঠেলে দিতে পারে।

তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অনলাইন গেমে আসক্তি এবং অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের প্রভাবও ভূমিকা রাখছে। মাদকাসক্ত হওয়ার পর মাদকের অর্থ জোগাড় করতে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাইসহ গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

আইনজীবী শাহ আলম বলেন, কিশোরদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের অনলাইন কার্যক্রমের ওপর নজর রাখতে হবে। নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ত করা জরুরি।

একই সঙ্গে মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ এবং কিশোরদের অপরাধী চক্রের হাত থেকে দূরে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

শুধু কিশোর নয়, ধরতে হবে পৃষ্ঠপোষকদেরও

কিশোর গ্যাং দমনে শুধু কিশোর সদস্যদের গ্রেপ্তার বা আইনের আওতায় আনা যথেষ্ট নয়—এমন মত সংশ্লিষ্টদের। তাঁদের মতে, কিশোরদের যারা ব্যবহার করছে, মাদক সরবরাহ করছে, অপরাধে অর্থ ও অস্ত্র জোগান দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবের মাধ্যমে তাদের রক্ষা করছে, তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে।

অন্যথায় একটি গ্রুপ ভেঙে দেওয়ার পর নতুন নামে আবারও একই ধরনের কিশোর গ্যাং গড়ে উঠতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, মাদকবিরোধী কার্যক্রম, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ—সবকিছুকে সমন্বিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুলনায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য কমাতে তাই এখন বড় প্রশ্ন শুধু কতজন কিশোর অপরাধে জড়িত তা নয়; বরং কারা তাদের ব্যবহার করছে, কোথা থেকে আসছে মাদক ও অর্থ, এবং অপরাধী চক্রের পেছনে কারা রয়েছে—সেসব মূল হোতাকে কতটা আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই কিশোর গ্যাং দমনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

  • সর্বশেষ