নোয়াখালী প্রতিনিধি: নোয়াখালীর কবিরহাটে মৎস্য খামারি ও যুবদলের সক্রিয় কর্মী মিজানুর রহমান রনি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে আব্দুল বাচেত হিরন ও এনামুল হক মাসুদের নাম উল্লেখ করে তাদেরসহ জড়িত সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে নিহতের পরিবার। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ফাঁসি দাবি করেছেন তারা।
রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে জেলা শহর মাইজদীর টাউন হল মোড়ের একটি দৈনিক পত্রিকার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন নিহত মিজানুর রহমান রনির মামা মোশারেফ হোসেন, মা লাইলী বেগম, স্ত্রী সীমা আক্তার ও বোন শ্রাবণী আক্তার।
নিহতের পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, মিজানুর রহমান রনি কবিরহাট উপজেলার নরোত্তমপুর ইউনিয়নের কালিরহাট বাজার এলাকার মৃত মো. শহিদ উল্যার ছেলে। তিনি মাছের প্রজেক্ট ও মুরগির খামারের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং স্থানীয় ইউনিয়ন যুবদলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো ও জমি-জমা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং তিনি কারাগারে ছিলেন। ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। ওই সময় স্থানীয় আব্দুল বাচেত হিরন ও এনামুল হক মাসুদসহ কয়েকজন বিএনপির নাম ব্যবহার করে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাটি কাটা ও সালিশ-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন।
পরিবারের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতেন মিজানুর রহমান রনি। এমনকি স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়েও কথিত ‘হাইব্রিড বিএনপি’র বিরুদ্ধে তিনি বক্তব্য দেন। এ কারণে হিরন ও মাসুদসহ একটি পক্ষ তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ১০ জানুয়ারি জমি নিয়ে বিরোধের জেরে রনির শ্বশুর ও শ্যালক আরাফাত হোসেন ওরফে জামালের সঙ্গে একই এলাকার নূর মোহাম্মদ ওরফে বাচ্ছুর বিরোধ সৃষ্টি হয়। পরে বিরোধ মীমাংসার কথা বলে তাদের ডেকে নিয়ে মারধর করা হলে তারা গুরুতর আহত হন। এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় রনির সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরোধ আরও বেড়ে যায়।
তারা আরও জানান, ১৭ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টার দিকে অজ্ঞাতনামা দুই ব্যক্তি মাছের প্রজেক্টের কাজের কথা বলে রনিকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। ওই দিন রাত ৯টা ৫৯ মিনিটের দিকে রনির ভায়রা আবু তাহেরকে ফোন করে মাসুদ হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়। রনিকে কোনো ধরনের বাধা দিতে নিষেধ না করলে তাকে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, রনির মাছের প্রজেক্টের স্ট্যাম্প এনামুল হক মাসুদের কাছে ছিল। ওই স্ট্যাম্প ফেরত চাওয়া এবং তা ফেরত না দিলে বিনিয়োগ করা ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি করাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় ‘আলেম’ নামের এক ব্যক্তি রনিকক মারধর করেন।
পরিবারের দাবি, মারধরের পর প্রাণ বাঁচাতে রনি কালিরহাট বাজারের পেছনের উত্তর পাশের সড়কের দিকে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় পূর্বপরিকল্পিতভাবে হিরন ও মাসুদের সঙ্গে জড়িত একটি পক্ষ তার মাথা ও মুখমণ্ডলে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে ঘটনাটিকে গণপিটুনি হিসেবে প্রচার করা হয়। তাদের আরও দাবি, রনির মাথা ও মুখমণ্ডল ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। এমনকি তার পরনের শার্টের বোতামও ছেঁড়া ছিল না।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী সীমা আক্তার বাদী হয়ে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি কবিরহাট থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে নিহতের পরিবারের সদস্যরা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান। একই সঙ্গে আব্দুল বাচেত হিরন ও এনামুল হক মাসুদসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা এবং আদালতের মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।