শিরোনাম
◈ শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ◈ ভারতের বাজারে বাড়ছে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা, রপ্তানি বেড়েছে ৭.৬৭% ◈ শুরু হচ্ছে চ্যাম্পিয়নস লিগ, আজ রা‌তেই ৬‌টি ম‌্যাচ ◈ ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২০% নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় পরিকল্পনা ◈ বাংলা‌দেশ ও জিম্বাবুয়ে‌কে নি‌য়ে ত্রিদেশীয় সিরিজের সূচি প্রকাশ কর‌লো আফগা‌নিস্তান ◈ সুইসাইড নোট পোস্টের পর অচেতন অবস্থায় উদ্ধার ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা মেঘমল্লার ◈ ইসরায়েলিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ◈ জুনিয়র এশিয়া কাপ হকি‌তে কাজাখস্তানকে হা‌রি‌য়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ ◈ আগামী ১২ সে‌প্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী বি‌শেষ অ‌ভিযান ◈ রোনাল্ড কোমান গোলকিপার হয়েও জোড়া গোল কর‌লেন 

প্রকাশিত : ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৪১ রাত
আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:২৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পুঠিয়ায় সারের জন্য কৃষকের মহাসড়ক অবরোধ, ডিলারের গুদামে ৫১ টন ইউরিয়া!

ইফতেখার আলম বিশাল, রাজশাহী প্রতিনিধি: গুদামে সার থাকার পরও কৃষকেরা কেন সার পাচ্ছেন না—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে রাজশাহীর পুঠিয়ায়। পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ও খুচরা বাজারে কথিত সার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার দাবিতে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন প্রায় তিন শতাধিক কৃষক। তাদের অভিযোগ, ডিলারের কাছে সরকারি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না; অথচ বেশি টাকা দিলে খুচরা বাজারে সার মিলছে।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ডিলারের দাবি, তার গুদামে এখনো ৫১ মেট্রিক টন ইউরিয়া মজুদ রয়েছে। ফলে কৃষকের ‘সার নেই’ অভিযোগ এবং ডিলারের ‘পর্যাপ্ত মজুদ আছে’ দাবির মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অসঙ্গতি। প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে কৃষকের হাতে সার যাচ্ছে না কেন?

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রায় তিন শতাধিক কৃষক মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

কৃষকেরা জানান, রোপা আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময় চলছে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় স্থানীয় ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। সার নিতে ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে খালি হাতে ফিরছেন বলে অভিযোগ তাদের।

বিড়ালদহ গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম (৪৫) বলেন, “আমন ধানের গাছে এখন সার দেওয়ার আসল সময়। তিন দিন ধরে বানেশ্বর বাজারে ঘুরছি। ডিলার বলছে সার নেই। কিন্তু খুচরা দোকানে গোপনে বেশি টাকা দিলে সার পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি দামে সার না পেলে চাষাবাদ করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।”

আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, “ভোর ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। সকাল ১০টার দিকে ডিলার ওছমান আলী বলেন সার শেষ। আমরা সার না পেলে জমি রক্ষা করব কীভাবে? সিন্ডিকেট করে আমাদের পকেট কাটা হচ্ছে। আমরা এর বিচার চাই।”

কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দ ও সরবরাহ থাকার পরও ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একটি অংশের যোগসাজশে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এতে কৃষকদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। তাদের দাবি, ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং নির্ধারিত মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে সার নিয়ে কৃষকদের এমন অভিযোগের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ডিলার ও রাজশাহী জেলা সার ও কীটনাশক কমিটির সভাপতি ওছমান আলী দাবি করেছেন, তার কাছে পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে।

ওছমান আলী বলেন, “কৃষকরা ভিত্তিহীন অভিযোগে মহাসড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন। আমাদের এখানে এখন পর্যন্ত ইউরিয়ার কোনো সংকট নেই। আমার কাছে এখনো ১ হাজার ৪০ বস্তা অর্থাৎ ৫১ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার মজুদ আছে। ডিএপি আছে দেড় টন, এমওপি প্রায় এক টন এবং টিএসপি আছে ১ দশমিক ৬৫ মেট্রিক টন। তবে মাসের শেষ দিকে নন-ইউরিয়া সারের মজুদ কমে গেছে।”

ডিলারের এই বক্তব্যের পর সার সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদি সত্যিই ৫১ মেট্রিক টন ইউরিয়া মজুদ থাকে, তাহলে কৃষকেরা দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন কেন? মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃষকের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছাতে ব্যর্থতার কারণ কী—এটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কারণ সার সংকটের অভিযোগ শুধু একজন ডিলারের বিরুদ্ধে নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে কৃষকের উৎপাদন খরচ, ফসলের ফলন এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম। মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কৃষক যদি নির্ধারিত মূল্যে সার না পান, তাহলে অতিরিক্ত দামের বোঝা সরাসরি তার ঘাড়ে পড়ে।

এ অবস্থায় শুধু ডিলারের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ডিলারের বরাদ্দ, গুদামে থাকা মজুদ, দৈনিক বিক্রির হিসাব এবং কোন কৃষকের কাছে কত সার বিক্রি হয়েছে—এসব তথ্য যাচাই করা। পাশাপাশি খুচরা বাজারে সার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, সেটিও সরেজমিনে তদারকি করা প্রয়োজন।

কৃষকদের অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সার বিতরণ ব্যবস্থায় নজরদারি জোরদার করা দরকার। আর অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে প্রশাসনের উচিত প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করে কৃষকদের মধ্যে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করা। এতে একদিকে কৃষকের আস্থা ফিরবে, অন্যদিকে সার নিয়ে অনিয়মের সুযোগও কমবে।

এদিকে প্রায় এক ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধের কারণে সড়কের উভয় পাশে শত শত বাস, ট্রাক ও যাত্রীবাহী যান আটকা পড়ে। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট। চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।

খবর পেয়ে বেলা ১১টার দিকে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে। এ সময় পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমান চরচা কৃষকদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখার, অসাধু ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং দ্রুত নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।

প্রশাসনের আশ্বাসে কৃষকেরা অবরোধ তুলে নিলে বেলা সাড়ে ১১টার পর ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

তবে কৃষকদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ডিলারের দাবিকৃত মজুদের সঙ্গে বাস্তব সরবরাহের হিসাব মিলিয়ে দেখা এখন জরুরি। কারণ গুদামে সার থাকলেও যদি কৃষকের জমিতে না পৌঁছায়, তাহলে সংকটটি সার উৎপাদন বা সরবরাহের নয়—বরং বিতরণ ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও।

  • সর্বশেষ