নুর উদ্দিন, সুনামগঞ্জ : টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের নিয়ে যেতে নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার না করে মাটিয়ান হাওরের মাঝ দিয়ে একের পর এক বিলাসবহুল হাউসবোট চলাচলের অভিযোগ উঠেছে। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়দল গ্রামের মেশিনবাড়ি এলাকা দিয়ে এসব হাউসবোট মাটিয়ান হাওরে ঢুকে টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারের দিকে যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এতে হাওরের পরিবেশ, জলজ জীববৈচিত্র্য ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টাঙ্গুয়ার হাওরে যাতায়াতের জন্য নদীপথ ও নৌযানের নির্ধারিত চলাচলের পথ রয়েছে। এসব পথ ব্যবহার করে ওয়াচ টাওয়ার, শহীদ সিরাজ লেকসহ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কিছু হাউসবোট নির্ধারিত পথ এড়িয়ে মাটিয়ান হাওরের মাঝ দিয়ে চলাচল করছে বলে তাঁদের অভিযোগ। প্রতিবছর পর্যটন মৌসুমে একইভাবে হাউসবোট চলাচল করলেও তা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ তাঁদের।
বড়দল গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ আসকর আলী বলেন, হাউসবোটের চলাচলে হাওরের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ধান চাষের মৌসুমে জমিতে কাচের বোতল পাওয়া যায়। এসব বোতল ও ভাঙা কাচে জমিতে কাজ করতে গিয়ে কৃষকদের হাত-পা কেটে আহত হতে হচ্ছে।
একই গ্রামের বাসিন্দা শামসু মিয়া বলেন, মেশিনবাড়ি এলাকা দিয়ে হাউসবোটগুলো হাওরে ঢুকে মাঝ বরাবর টাঙ্গুয়ার হাওরের দিকে যায়। তাঁদের বারবার নিষেধ করা হলেও অনেকেই তা মানেন না। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে জমিতে পড়ে থাকা কাচের বোতল ও ভাঙা কাচ বেরিয়ে আসে। এতে ধান চাষের সময় কৃষকেরা আহত হন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাউসবোট থেকে কাচের বোতলসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য হাওরের পানি ও আশপাশের জমিতে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো কোনো হাউসবোটে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকায় পর্যটকদের অবস্থানের সময় জেনারেটর চালু রাখতে হয়। এতে শব্দ ও ধোঁয়ার কারণে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।
সুনামগঞ্জ জনউদ্যোগের আহ্বায়ক সুখেন্দু সেন বলেন, পর্যটন ও বাণিজ্যের সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। পরিবেশকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলতে পারে না। হাওরে শত শত হাউসবোট চলাচল করছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত বিলাসিতা যুক্ত হলে পরিবেশের ওপর চাপ আরও বাড়ে। হাওরের মাঝ দিয়ে হাউসবোট চলাচল করলে পানি, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই স্থানীয় মানুষের স্বার্থ ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনের কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া উচিত।
তবে হাউসবোট চলাচলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাউসবোট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আরাফাত হোসাইন আখন্দ। তিনি বলেন, তাঁদের অ্যাসোসিয়েশনের আওতাধীন কোনো হাউসবোট মাটিয়ান হাওরের মাঝ দিয়ে চলাচল করে না। নদীপথ ঘুরে পর্যটকদের ওয়াচ টাওয়ার, শহীদ সিরাজ লেক ও যাদুকাটা নদীতে নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, হাউসবোট মালিকদের হাওরের মাঝ দিয়ে চলাচল না করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত নদীপথেই পর্যটকদের নিয়ে চলাচল করতে হবে। হাওরে পানি বেশি থাকায় এখন বাঁশ ও লাল পতাকা দিয়ে পথ চিহ্নিত করার কাজ কিছুটা সময়সাপেক্ষ হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে নির্ধারিত পথ চিহ্নিত করে দেওয়া হবে, যাতে হাউসবোটগুলো অবাধে হাওরের মাঝ দিয়ে চলাচল করতে না পারে।
টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে পরিচিত। পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি এর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পর্যটনকে টেকসই করতে হলে নির্ধারিত নৌপথে নৌযান চলাচল নিশ্চিত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং হাওরের কৃষিজমি ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে।