শিরোনাম
◈ ভিসা ব্যবস্থায় সংস্কার, বাড়ল শ্রেণি; নতুন নীতিমালা অনুমোদন ◈ বিদেশে শিক্ষার খরচ মেটাতে ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সুযোগ ◈ সিঙ্গাপুরে প্রবাসী ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের’ সম্মাননা প্রদান করলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ◈ মা‌ঠে জিসান ঝড়, মালয়েশিয়াকে হোয়াইটওয়াশ করলো এইচপি ◈ বাংলা‌দেশ যুব দলের ইং‌লিশ কোচ জেরার্ডের ঘটনায় ব্রিবত বাফুফে ◈ আগামী ১২ আগস্ট বুধবার যেসব অঞ্চল থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে ◈ স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টার নিষিদ্ধ, বাড়ল জরিমানা: আচরণবিধি চূড়ান্ত ইসির ◈ আগামী ন‌ভেম্ব‌রে চার জাতির ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে ইরাক ◈ ক্রিশ্চিয়া‌নো রোনালদো-জর্জিনার বিয়ে ম‌নে ক‌রে গির্জায় মানু‌ষের ভিড়, এরপর যা হলো ◈ সৌদি আরবের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক

প্রকাশিত : ১০ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:১৩ বিকাল
আপডেট : ১০ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:১২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শেষবার বাবা-মাকে ফোন, নেট না থাকায় বলা হলো না শেষ কথাটুকু

কারখানার ভেতর তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। চারদিকে ধোঁয়া আর আতঙ্ক। বের হওয়ার দরজাটিও বন্ধ। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন দুই ভাই মোহন প্রামাণিক ও সুমন প্রামাণিক। বারবার ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করছিলেন তারা। কিন্তু বাড়িতে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। মোবাইলে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় সেই ফোন আর পৌঁছায়নি বাবা-মায়ের কাছে। বলা হয়নি শেষ কথাটুকুও।

পরে ভয়েস মেসেজে নিজেদের শেষ আকুতির কথা জানান দুই ভাই। বলেন, ‘কারখানায় আগুন ধরেছে। দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছি না। হয়তো আমরা মারা যাব। আমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’ এরপর আর কোনো ফোন আসেনি। ভয়েস মেসেজেই শেষ হয়ে যায় বাবা-মায়ের সঙ্গে দুই সন্তানের যোগাযোগ।

নিহত মোহন ও সুমন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের ছেলে। রোববার সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই সহোদরসহ অন্তত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তাদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জন রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে।

দুই ছেলের মৃত্যুর খবরের পর থেকে নির্বাক হয়ে পড়েছেন বাবা গোফ্ফার প্রামাণিক। একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে মৃত্যুর আগে তাদের সঙ্গে শেষবার কথা বলতে না পারার আক্ষেপ তাকে আরও ভেঙে দিয়েছে।

গোফ্ফার প্রামাণিক জানান, তার তিন ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি নিজে এবং ছোট ছেলে মামুন হোসেন (১৭) শারীরিক প্রতিবন্ধী। পরিবারের নিজস্ব কোনো জমিজমাও নেই। সংসারের অভাব দূর করতে প্রায় আট বছর আগে ধারদেনা করে বড় ছেলে মোহনকে সৌদি আরবে পাঠান তিনি।

প্রবাসে গিয়ে মোহন কাজ শুরু করার পর কয়েক বছরের মধ্যে পরিবারের ধারদেনা শোধ করেন। এরপর ছোট ভাই সুমনকেও প্রায় দুই বছর আগে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। দুই ভাই একই সঙ্গে কাজ করতেন। তাদের স্বপ্ন ছিল, প্রবাসে কাজ করে টাকা জমিয়ে দেশে একটি পাকা বাড়ি করবেন। এরপর দুই ভাই একসঙ্গে দেশে ফিরে বিয়ে করে সংসার শুরু করবেন।

সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে গত বুধবার বাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণের জন্য ভিত্তি স্থাপন করা হয়। কাজও শুরু হয়। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই দুই ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছায় বাড়িতে।

রোববার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের ওই সোফা তৈরির কারখানায় আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের অনেকেই ভেতরে আটকা পড়েন। পরে আগুনে অন্তত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।

সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন গোফ্ফার প্রামাণিক। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার পর দুই ছেলে বারবার ইমু আর হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তখন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। তাই ফোনে নেট পায়নি। আমরা তাদের সঙ্গে শেষবারের মতো কথাও বলতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘পরে ওরা ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছে। বলেছে, কারখানায় আগুন ধরেছে, দরজা বন্ধ থাকায় বের হতে পারছে না। হয়তো মারা যাবে। আমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। ওদের এই কথাগুলো শুনে আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে আত্রাই উপজেলার ১৩ জন রয়েছেন। তারা হলেন- পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে মো. জালাল, ডুবাই গ্রামের বাদলের ছেলে মো. সুমন হোসেন, একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে মো. হাসিবুল হাসান শুভ, গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের ছেলে মো. মোহন প্রামাণিক ও মো. সুমুন প্রামাণিক, একই গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে মো. রুবেল হোসেন, ফজলুর ছেলে মো. কলিউদ্দিন প্রামাণিক, সাধনগর গ্রামের মো. সাগর হোসেন, উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে মো. ফরিদ শেখ, মাদবপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে মো. মজিদুল ইসলাম, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা, মধ্যেবোয়ালিয়া গ্রামের মো. মিনহাজ এবং খরসতী গ্রামের মো. মহিদুল ইসলাম।

নিহতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। গন্ডগোহালী গ্রামের গোফ্ফার প্রামাণিকের বাড়িতে এখন কেবলই কান্না। যে বাড়িতে কয়েক দিন আগে দুই ছেলের স্বপ্নের নতুন ঘরের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল, সেই বাড়িতেই এখন অপেক্ষা তাদের মরদেহের।

স্বজনরা দ্রুত নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়