শিরোনাম
◈ গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু নিশ্চিত ভেবেছিলেন, ‘মায়ের নাম্বারটা লেখেন’ বলার পর যা ঘটল ◈ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে, জানাল ভারত সরকার ◈ ‘গো বিগ’ কৌশলে ইরানে বড় অভিযানের ছক যুক্তরাষ্ট্রের, দাবি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ◈ শ‌নিবার সা‌ফের ড্র, নি‌ষেধাজ্ঞা প্রত‌্যাহার হ‌লে নেপাল খেল‌বে বাংলাদেশ গ্রুপে  ◈ দেশে ধর্মের নামে বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ◈ রাজধানীবাসীর জন্য আসছে আরও একটি মেট্রোরেল ◈ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাল থেকে গণপরিবহনে বাধ্যতামূলক জিপিএস ◈ গঙ্গা পানিচুক্তি: বিলম্ব না করে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা শুরুর সুপারিশ ভারতের সংসদীয় কমিটির ◈ ক্যানসার ভ্যাকসিনে সফলতার দাবি রাশিয়ার, প্রথম রোগীর শরীরে কার্যকর প্রতিরোধ ◈ ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হবে না: সংসদীয় কমিটিকে ভারত সরকার

প্রকাশিত : ৩১ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২৩ রাত
আপডেট : ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

৩৪ বছর বয়সেও উচ্চতা মাত্র ২৮ ইঞ্চি : মিলির স্বপ্ন শুধু একটি ঘর, একটি গরু আর একটি ছাগল

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্যের সুন্দরবনের কোলঘেঁষা জনপদ বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ। নদী, খাল, বন আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝেও এখানে বসবাস করেন এমন অনেক মানুষ, যাদের জীবন সংগ্রামের গল্প আড়ালেই থেকে যায়। তেমনই এক ব্যতিক্রমী জীবনের নাম মিলি আক্তার।

মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের গুলিয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা মিলি আক্তারের বর্তমান বয়স ৩৪ বছর। বয়সের হিসাবে তিনি একজন পূর্ণবয়স্ক নারী। কিন্তু শারীরিক গড়নে তিনি যেন এখনো একটি ছোট্ট শিশু। জন্মের পর থেকে তার শরীরের উচ্চতা আর স্বাভাবিকভাবে বাড়েনি। বর্তমানে তার উচ্চতা মাত্র ২৮ ইঞ্চি, অর্থাৎ ২ ফুট ৪ ইঞ্চি।

তবে শরীরের বৃদ্ধি থেমে গেলেও থেমে নেই তার স্বপ্ন। জীবনকে ঘিরে তার চাওয়া খুবই সামান্য—একটি নিরাপদ থাকার ঘর, একটি গরু আর একটি ছাগল। এই ছোট ছোট স্বপ্নগুলোই তার কাছে যেন বিশাল এক পৃথিবী।

জন্ম থেকেই সংগ্রামের শুরু

পরিবারের সদস্যরা জানান, হরমোনজনিত জটিলতার কারণে জন্মের পর থেকেই মিলির শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। ১৯৯২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া মিলির বয়স এখন ৩৪ বছর হলেও তার শারীরিক গঠন শিশুর মতোই রয়ে গেছে।

জন্মের আগেই মিলির বাবা নজরুল ইসলাম তার মাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর আর কখনো পরিবারের খোঁজ নেননি। মাত্র দুই বছর বয়সে মিলিকে নানা-নানির কাছে রেখে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরব পাড়ি জমান তার মা ফরিদা ইয়াসমিন।

দীর্ঘ ২৭ বছর বিদেশে কাটিয়ে দেশে ফিরে তিনি দেখেন, মেয়ের বয়স বেড়েছে, কিন্তু বাড়েনি তার উচ্চতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে পৃথিবী, বদলেছে মানুষ, কিন্তু মিলির জীবন যেন একই জায়গায় থমকে আছে।

ছোট্ট শরীর, বড় স্বপ্ন

মিলির পৃথিবী খুব ছোট। কিন্তু সেই ছোট্ট পৃথিবীর ভেতরেও রয়েছে রঙিন কিছু স্বপ্ন।

নিজেদের জরাজীর্ণ ঘরের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝেই মাকে প্রশ্ন করেন, “আমাদের ঘরটা এত ছোট কেন? দোতলা ঘর হবে কবে? আমি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠব।”

এই প্রশ্ন শুনে মা উত্তর খুঁজে পান না। কারণ সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যে একটি সাধারণ ঘর তৈরিই যেখানে কঠিন, সেখানে দোতলা বাড়ির স্বপ্ন যেন অনেক দূরের।

মিলি গরু পালন করতে চান, ছাগল পালন করতে চান। নিজের ছোট্ট উঠানে সেগুলো নিয়ে সময় কাটানোর স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সেই ইচ্ছাগুলোও আজ পর্যন্ত অপূর্ণ রয়ে গেছে।

মায়ের ফিরে আসায় কিছুটা পূর্ণতা

দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে মা ফরিদা ইয়াসমিন দেশে ফিরে আসার পর মিলির জীবনে যেন নতুন আলো আসে। মায়ের সান্নিধ্যে তার ছোট্ট পৃথিবী আবার কিছুটা পূর্ণতা পায়।

তবে জীবন তখনও সহজ হয়নি। সংসারে অভাব, অসুস্থ মায়ের চিকিৎসা, কলেজপড়ুয়া ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই সংগ্রাম করতে হচ্ছে পরিবারটিকে।

মিলি নিজের কাজ নিজেই করার চেষ্টা করেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করেন, গোসল করেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান। বিশেষ করে ছোট ভাইয়ের প্রতি তার গভীর টান রয়েছে।

অসুস্থ মায়ের প্রতিও তার রয়েছে অগাধ মমতা। নিজের মতো করে মায়ের খোঁজখবর রাখেন। তবে শিশুসুলভ অভিমানও রয়েছে তার মধ্যে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু ঘটলে কিংবা পছন্দের জিনিস না পেলে অভিমান করেন, কখনো রাগও করেন।

শৈশবের আনন্দেই আজও বেঁচে থাকা

বয়স ৩৪ হলেও আনন্দ-বিনোদনের জগতে মিলি যেন এখনো শিশু।

মুঠোফোনে গেম খেলতে ভালোবাসেন। গান শুনতে পছন্দ করেন। সুযোগ পেলে নাচতেও ভীষণ আনন্দ পান।

মাছ-মাংস, পিঠা, আপেল ও কমলা তার প্রিয় খাবার। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় সবসময় তার পছন্দের খাবার জোটে না।

দামী খেলনা কেনার সামর্থ্যও নেই পরিবারের। তাই কখনো জুসের খালি বোতল, কখনো সাধারণ কোনো জিনিসই হয়ে ওঠে তার খেলার সঙ্গী।

মায়ের কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাসের গল্প

মিলির মা ফরিদা ইয়াসমিনের জীবনও সংগ্রাম আর কষ্টে ভরা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “মিলিকে গর্ভে রেখে আর সাড়ে তিন বছরের বড় মেয়ে পলিকে নিয়ে যখন জীবনযুদ্ধ শুরু করি, তখন পাশে কেউ ছিল না। অনেক কষ্ট করে বড় মেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছি, বিয়ে দিয়েছি। কিন্তু মিলির জন্য ভালো চিকিৎসা বা পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করতে পারিনি।”

জীবনের প্রয়োজনে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দুই মেয়েকে নিয়ে চলে যান সিলেটের গোয়াইনঘাটে স্বামীর বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও স্থায়ীভাবে থাকা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত আবার ফিরে আসতে হয়েছে নিজের জন্মভূমি মোরেলগঞ্জে।

বর্তমানে ৪২ শতক জমির ওপর বসতভিটাটুকুই তাদের একমাত্র সম্বল।

অনিশ্চয়তার ভবিষ্যৎ

পরিবারে এখন একজন কলেজপড়ুয়া ছেলে রয়েছে। দ্বিতীয় স্বামী দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। আয় সীমিত হওয়ায় ছেলের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।

একদিকে বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা, অন্যদিকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মেয়ে—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই নতুন এক সংগ্রামের নাম।

ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, “সরকারি সাহায্য বলতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী ভাতাটাই আমাদের একমাত্র ভরসা। মেয়ের গরু আর ছাগল পালনের শখ এখনো পূরণ করতে পারিনি। কোথায় গেলে কী ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যায়, সেটাও জানি না। আমি বেঁচে থাকতে মেয়ের জন্য অন্তত দুবেলা খাবার আর মাথা গোঁজার একটা নিরাপদ ব্যবস্থা করে যেতে পারলে শান্তি পেতাম।”

কথাগুলো বলতে বলতে অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে তার চোখ।

সহযোগিতার আশ্বাস প্রশাসনের

উপজেলা প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা কায়কোবাদ আকুঞ্জী বলেন, “মিলির চলাচলে সমস্যা হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। এছাড়া জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলে সেটিও দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”

মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুল্লাহ বলেন, “মিলি বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে। এছাড়া সরকারের যেসব সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলোর আওতায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

মানবিক সহায়তার প্রত্যাশা

সুন্দরবনের উপকূলীয় এই জনপদে মিলির জীবনসংগ্রাম হয়তো হাজারো মানুষের গল্পের মতোই। তবে তার স্বপ্নগুলো খুব বড় নয়। তিনি চান না বিলাসবহুল জীবন কিংবা বিপুল সম্পদ। তার চাওয়া কেবল একটি নিরাপদ ঘর, একটি গরু, একটি ছাগল এবং পরিবারের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ।

সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি সহায়তা যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো মিলির ছোট্ট পৃথিবীর বড় স্বপ্নগুলো একদিন সত্যি হবে। আর তখন সুন্দরবনের কোলঘেঁষা গুলিয়াখালী গ্রামের এই ক্ষুদ্রকায় নারীও বলতে পারবেন—জীবন তাকে সবকিছু না দিলেও কিছু স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দিয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়