রাজধানীতে সরকারি গণপরিবহনে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি মেট্রোরেল লাইন। দুই দফা বাদ যাওয়ার পর অবশেষে আলোর মুখ দেখছে আলোচিত ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের লাইন-৫ (এমআরটি-৫ দক্ষিণ লাইন)। এর মাধ্যমে রাজধানীর পশ্চিম অংশ গাবতলী থেকে পূর্ব অংশ দাশেরকান্দিতে যাওয়া যাবে মাত্র ২৮ মিনিটে। ব্যয়সাশ্রয়ীও হবে এ প্রকল্প। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পর প্রকল্পটি শুরুর সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসন, নিরাপদ ও সময় সাশ্রয়ী করার উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। মোট্রোরেল-৫ (দক্ষিণ) রুটে প্রতিদিন যাতায়াত করবে ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী। প্রতিটি ট্রেনে যাত্রী ধারণ ক্ষমতা দুই হাজার ৩১২ জন। ভাড়া নির্ধারণ করা হবে মানুষের আর্থিক সামর্থ্য ও মেট্রোরেলের পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে। উড়ালে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার ও পাতালে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলবে এই মেট্রোরেল।
আশা করা হচ্ছে, এর ফলে ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে। সড়কে গাড়ি চলাচল কমবে ১ হাজার ৪৯টি। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে বাতাসে ২ লাখ ৮ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারবে এ প্রকল্প।
জানা গেছে, এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পটি অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ ও পরিবহন খাত নিয়ে যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ঢাকার যানজট নিরসনে মেট্রোরেল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। সেই প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, মৌলিক প্রকৌশল নকশা, ডিটেইল্ড ডিজাইন, দরপত্র, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন-সংক্রান্ত পরিকল্পনার কাজ শেষ করা হয়েছে। শিগগিরই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাদীউজ্জামান সমকালকে বলেন, প্রকল্পটি অবশ্যই গণমুখী। তবে অন্য মেট্রোরেল প্রকল্পের তুলনায় এ প্রকল্পে যাত্রী চাহিদা তুলনামূলক কম। সে ক্ষেত্রে একনেকে অনুমোদনের আগে প্রতিটি স্টেশনের সঙ্গে আন্তঃসংযোগের বিষয়টি প্রকল্পভুক্ত করতে হবে, যাতে প্রকল্পটি আরও বেশি গণমুখী হয়। মেট্রোরেল বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রকল্প। জনগণের অর্থের আরও অর্থবহ ব্যবহারের কথা ভাবতে হবে। প্রকল্পটির বড় অংশ পাতাল হওয়ায় নির্মাণ ও পরিচালনও চ্যালেঞ্জিং। সে বিষয়েও সতর্কতা প্রয়োজন।
প্রকল্প প্রস্তাব থেকে জানা গেছে, প্রকল্পটির শুরুর দিকে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও কোরিয়া সরকারের ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশান ফান্ড (ইডিসিএফ) নির্মাণ ব্যয়ের জোগান দিচ্ছে। আগের প্রাক্কলনে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এবার ব্যয় ধরা হচ্ছে ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। এই ব্যয়ে এডিবি ও ইডিসিএফ দিচ্ছে ৩২ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা সরকারের নিজস্ব জোগান।
প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়ন বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, আলোচনা ও চুক্তি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। ইআরডির অতিরিক্ত সচিব এস এম জাকারিয়া হক সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে এডিবির সঙ্গে আগেই কাঠামো চুক্তি হয়েছিল। নতুন করে আবার এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, প্রকল্পটি রাজধানীর পূর্ব অংশ থেকে পশ্চিম অংশের মধ্যে পরিবহন যোগাযোগ সহজ করবে। রাজধানীর পূর্ব-পশ্চিম করিডোরে সড়ক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাবে। আগামীতে এই রুটের সঙ্গে মেট্রো লাইন-২ এর সংযোগ দেওয়া হতে পারে।
রাজধানীতে যানজটের সমস্যা কমাতে সরকারি গণপরিবহন নেটওয়ার্ক হিসেবে ৫টি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। মেট্রোরেল-৬ ইতোমধ্যে চালু হয়েছে, যা নগর যাতায়াতে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে।
জানা গেছে, গাবতলী থেকে আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালে। ২০২২ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করা হয়। এ বাবদ এবং ডিটেইল্ড ডিজাইনে মোট ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা শেষে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পটির অনুমোদন আটকে যায়। পরে ব্যয় কমিয়ে একনেকে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সাড়া না পাওয়ায় প্রকল্পটি ওঠানো যায়নি।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব সমকালকে বলেন, আগে হয়নি হয়তো সরকারের নীতির কারণে। এখন নতুন সরকার; নীতি পরিবর্তন হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীরাও তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনেছে। নগরবাসীর যোগাযোগ উন্নয়ন এবং যানজট থেকে মুক্তির জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ।
এই মেট্রোরেল লাইনের দৈর্ঘ্য হবে ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার পাতালপথ। উড়ালপথ ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার। পাতাল স্টেশন হবে ১১টি। উড়াল স্টেশন ৪টি। রুট অ্যালাইনমেন্ট হচ্ছে গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল-কল্যাণপুর-শ্যামলী-কলেজ গেট-আসাদ গেট-শুক্রাবাদ-কারওয়ান বাজার-হাতিরঝিল-তেজগাঁও-আফতাবনগর-আফতাবনগর সেন্টার- আফতাবনগর পূর্ব-নাছিরাবাদ-দাশেরকান্দি।
সূত্র: সমকাল