পরিবহন, শিল্প ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়িয়ে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে বাংলাদেশ। এতে খরচ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) নতুন ‘স্পেশাল রিপোর্ট অন ইলেকট্রিফিকেশন’ প্রতিবেদনে এমন সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিকারক উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিদ্যুতায়নের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার সুবিধা বেশি।
বাংলাদেশ আলাদাভাবে কত অর্থ সাশ্রয় করতে পারে, তার কোনো হিসাব প্রতিবেদনে নেই। তবে আইইএর হিসাবে, দ্রুত বিদ্যুতায়ন হলে চীন ছাড়া অন্যান্য উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে সম্মিলিতভাবে বছরে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি জ্বালানি আমদানি ব্যয় কমাতে পারে। এটি ২০২৫ সালে এসব দেশের মোট জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশের বেশি।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশে এখন বড় আকারে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও কয়লা আমদানি করা হয়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের জ্বালানি খাতেও চাপ তৈরি হয়।
আইইএর প্রতিবেদনে পরিবহন, বস্ত্র ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিদ্যুতায়নের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যানে সুযোগ
আইইএ বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর শহর সাধারণত ঘনবসতিপূর্ণ এবং মানুষের দৈনিক যাতায়াতের দূরত্ব তুলনামূলক কম। তাই এসব দেশে বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ও তিন চাকার যান ব্যবহারের বড় সুযোগ রয়েছে।
বর্তমানে জনপ্রিয় বৈদ্যুতিক দুই ও তিন চাকার যানের ব্যাটারির সক্ষমতা উন্নয়নশীল দেশের মানুষের গড় দৈনিক যাতায়াতের প্রায় ১০ গুণ দূরত্ব অতিক্রমের জন্য যথেষ্ট। আবার তেলচালিত যানের তুলনায় পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় বৈদ্যুতিক যান কেনার বাড়তি খরচ সাধারণত তিন থেকে ছয় বছরের মধ্যে উঠে আসতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ তেল আমদানিনির্ভর। তাই পরিবহনে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে তেল আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আইইএর হিসাবে, দ্রুত বিদ্যুতায়ন হলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বে দৈনিক ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেলের ব্যবহার এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই হবে জ্বালানি আমদানিকারক অঞ্চলে।
বস্ত্র ও খাদ্য শিল্পে সম্ভাবনা
বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে বস্ত্র ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। ইস্পাত ও সিমেন্টের মতো ভারী শিল্পে অনেক বেশি তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। কিন্তু বস্ত্র, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধ, ওষুধ ও পানীয় শিল্পে তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় গরম পানি, বাষ্প ও শুকানোর প্রক্রিয়া ব্যবহৃত হয়।
এসব কাজে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বয়লার ও শিল্পে ব্যবহৃত হিট পাম্প কাজে লাগানো তুলনামূলক সহজ।
আইইএর হিসাবে, বিশ্বে শিল্প খাতে নিম্ন ও মাঝারি তাপমাত্রার কাজে ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৪০ শতাংশ বর্তমান প্রযুক্তিতেই সাশ্রয়ীভাবে বিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। বস্ত্র ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণকে এক্ষেত্রে বিশেষ সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় এ সুযোগ দেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
আইইএ বলছে, আরেকটি সুবিধা আসতে পারে রপ্তানি বাণিজ্যে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সরবরাহব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর দিকে গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। ফলে শিল্পে কম কার্বন নিঃসরণকারী বিদ্যুতের ব্যবহার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতেও সহায়তা করতে পারে।
কৃষিতে সৌরচালিত সেচ
কৃষিতেও বিদ্যুতায়নের বড় সুযোগ দেখছে আইইএ। সংস্থাটির হিসাবে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১ থেকে ২ শতাংশ হলেও দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকায় তা ১৭ থেকে ১৯ শতাংশ। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় কৃষির বিদ্যুতায়নের প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
বিশেষভাবে সেচের কথা বলেছে আইইএ। যেসব এলাকায় গ্রিডের বিদ্যুৎ নেই বা নির্ভরযোগ্য নয়, সেখানে ডিজেলচালিত পাম্পের বিকল্প হতে পারে সৌরচালিত সেচপাম্প। কৃষিপণ্য সংরক্ষণে হিমাগার ও রেফ্রিজারেশনেও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বড় বাধা দুর্বল গ্রিড
সংস্থাটি বলছে, পরিবহন, শিল্প ও কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। তাই পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
আইইএ বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিদ্যুতায়নের অন্যতম বড় বাধা অনির্ভরযোগ্য ও ব্যয়বহুল গ্রিড বিদ্যুৎ। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকলে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি বেশি দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও শিল্পকারখানা ডিজেল বা গ্যাসচালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারে।
তাই বিদ্যুতায়নের পাশাপাশি উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হবে বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা ব্যাটারি, আধুনিক গ্রিড ও চাহিদা ব্যবস্থাপনারও।
আইইএর হিসাবে, দ্রুত বিদ্যুতায়নের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের গতি গত এক দশকের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়াতে হবে।
আমদানি কমাতে বিদ্যুতের উৎসও গুরুত্বপূর্ণ
তবে শুধু বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ালেই জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমবে না। সেই বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আইইএ বলছে, বিদ্যুতায়নের সুফল সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাবে যদি বাড়তি বিদ্যুৎ দেশীয় ও কম কার্বন নিঃসরণকারী উৎস থেকে আসে। নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্রিড ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করলে জ্বালানি নিরাপত্তার সুবিধা আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই পরিবহন বা শিল্পে পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সেই জায়গায় যদি আমদানি করা এলএনজি বা তেল দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়, তাহলে আমদানিনির্ভরতার একটি অংশ মূলত এক খাত থেকে অন্য খাতে চলে যেতে পারে।
বিশ্বের মোট চূড়ান্ত জ্বালানি ব্যবহারে এখন বিদ্যুতের অংশ প্রায় ২৩ শতাংশ। আইইএ বলছে, বর্তমানে থাকা প্রযুক্তি সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার করেই এ হার প্রায় ৩৩ শতাংশে নেওয়া সম্ভব। আর ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৩৫ শতাংশে নেওয়ার একটি বৈশ্বিক লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে সব দেশের জন্য একই পথ প্রযোজ্য নয় বলে জানিয়েছে আইইএ। একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, জ্বালানির দাম, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও অর্থায়নের সুযোগের ওপর বিদ্যুতায়নের গতি নির্ভর করবে।
সূত্র: জাগো নিউস ২৪