বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বিশেষায়িত বাসটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৬০৩৯। রাজধানীর জোয়ারসাহারা ডিপো থেকে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বাসটি ছাড়ার সময় স্বাভাবিকভাবেই যাত্রী ছিল না। পরে আবদুল্লাপুর হয়ে মতিঝিলের পথে বিভিন্ন স্টপেজ থেকে কিছু যাত্রী ওঠে। সকাল ৯টার দিকে ফার্মগেটে বাসটি যাত্রীর অপেক্ষায় প্রায় ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেও ওঠে হাতে গোনা চারজন। আবদুল্লাপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যাত্রী কিছুটা বাড়লেও ফাঁকা ছিল বেশির ভাগ আসন। ৭৫ আসনের বাসটিতে ওই ট্রিপে যাত্রী ছিল ২০ থেকে ৩০ জন বলে জানান চালক মোছা. লতা আক্তার।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকার অন্যান্য পিংক বাসের চিত্রও অনেকটা একই। নারীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে চালু হওয়া আলোচিত এই বাসসেবায় উদ্বোধনের এক মাস পরও আশানুরূপ যাত্রী মিলছে না। প্রতিদিনই লোকসান গুনছে বিআরটিসি। বাসসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে যাত্রীস্বল্পতার পেছনে অন্তত পাঁচটি কারণের কথা জানা গেছে।
গত ১৮ আগস্ট নারীদের জন্য ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু করে বিআরটিসি। ওই দিন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া জেলায় ১৪টি পিংক বাস উদ্বোধন করা হয়। ভবিষ্যতে বাস ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে কর্তৃপক্ষের। তবে আশানুরূপ যাত্রী না মিললে বিশেষায়িত এই সেবা কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
গতকাল সোমবার বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে শাহবাগ মোড়ে থামে একটি পিংক বাস।
বাসটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৫৯১৭। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর চালক কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চালকের সহকারী (হেল্পার) জানান, ওই সময় বাসটিতে যাত্রী ছিল ২০ থেকে ২৫ জন। বাসটির জন্য শাহবাগ মোড়ে অপেক্ষা করছিলেন কয়েকজন নারী। তাঁদের একজন ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সানজানা হক চৈতি। তিনি বলেন, ‘কয়েকবার পিংক বাসে যাতায়াত করেছি। বেশির ভাগ সময়ই বাস ফাঁকা থাকে। তবে যাত্রীসেবার মান নিয়ে আমি সন্তুষ্ট। অন্যান্য গণপরিবহনের তুলনায় পিংক বাসের সেবা অবশ্যই ভালো।’
সরেজমিনে এবং বাসসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্তত পাঁচটি কারণে পিংক বাসে আশানুরূপ সাড়া মিলছে না। তাঁদের মতে, অতীতে নারীদের জন্য চালু করা বাসসেবাগুলো যেসব কারণে যাত্রীস্বল্পতা ও লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে, সেসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন সেবা চালুর আগে পর্যাপ্ত মাঠ পর্যায়ের গবেষণা ও চাহিদা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। রুট নির্ধারণ, ট্রিপের সংখ্যা, সময়সূচি ও যাত্রীদের যাতায়াতের ধরন নিয়ে কার্যকর ফিল্ড ওয়ার্ক করা হলে বর্তমান সমস্যাগুলোর অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
স্বল্প ট্রিপ ও শিডিউল : পিংক বাসে যাত্রী কম হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে অনেকে বলছেন স্বল্প ট্রিপ ও শিডিউলের কথা। প্রতিটি রুটে দিনে মাত্র এক বা দুটি ট্রিপ পরিচালিত হওয়ায় যাত্রীরা প্রয়োজনের সময় বাস পাচ্ছে না। ফলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে অনেকেই অন্য গণপরিবহন ব্যবহার করছে। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা নওরীন সুলতানা বলেন, ‘পিংক বাসে যাতায়াত অবশ্যই স্বস্তিদায়ক। অন্যান্য গণপরিবহনের চেয়ে ভালো। তবে বেশির ভাগ সময় বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। কখনো বাস আসে বিকেল ৪টায়, কখনো ৫টায়। পর্যাপ্ত বাস না থাকায় বাধ্য হয়েই অনেক সময় অন্য গণপরিবহনে উঠতে হয়।’
সীমিত রুট : দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সীমিত রুটের কথা। রাজধানীর কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের বড় অংশকে প্রতিদিন একাধিক এলাকা অতিক্রম করে গন্তব্যে যেতে হয়। পিংক বাসের রুট ও পরিধি সীমিত হওয়ায় অনেকের গন্তব্যের সঙ্গে তা মিলছে না। ফলে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হলেও প্রয়োজনের সময় এই বাস তাঁদের কাজে আসছে না।
অপর্যাপ্ত বাস : একটি রুটে পর্যাপ্ত বাস না থাকায় অপেক্ষার সময়ও বাড়ছে। বিআরটিসি সূত্র জানায়, বর্তমানে রাজধানীতে ১৩টি পিংক বাস চলাচল করছে। এসব বাস পরিচালনায় রয়েছেন ১৫ জন নারী চালক এবং ২৪ জন হেল্পার। আরো ৩২ জন নারী চালক ও হেল্পার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বাসের সংখ্যা বাড়ানো গেলে অপেক্ষার সময় কমবে এবং যাত্রীদের আস্থাও বাড়তে পারে।
চালকসংকট ও দক্ষতা : পিংক বাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য নারী চালক ও হেল্পার দিয়ে পরিচালনা। তবে নারী চালকের সংখ্যা এখনো প্রয়োজনের তুলনায় কম। নতুন চালকদের অনেকেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। বড় বা দ্বিতল বাস চালনায় পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা তৈরি হতেও সময় লাগছে। ফলে চালকের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার বিষয়টিও।
প্রচার ও যাত্রীর অভ্যাস : যাত্রীস্বল্পতার আরেকটি কারণ হিসেবে অনেকে বলছেন প্রচারের ঘাটতি ও যাত্রীদের প্রচলিত অভ্যাসের কথা। অনেক নারী এখনো পিংক বাসের রুট ও সময়সূচি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জানেন না। আবার অনেক নারী পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে যাতায়াত করেন। ফলে শুধু নারীদের জন্য নির্ধারিত বাস সব যাত্রার ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য উপযোগী হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও পিংক বাস নিয়ে নেতিবাচক প্রচার রয়েছে বলে জানান অনেক যাত্রী। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিংক বাসে যাত্রীস্বল্পতার প্রভাব পড়ছে বিআরটিসির আয়ে। সংস্থাটির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজধানীর ১০ রুট মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে।
পিংক বাসের সেবা ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিআরটিসির প্রশাসন ও অপারেশন বিভাগের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. রাহেনুল ইসলাম এবং ডিজিএম শুকদেব ঢালীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হয় এবং মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে তাঁরা কেউই ফোন ধরেননি। পরে বিআরটিসির জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোস্তাকিম ভূঞা বলেন, পিংক বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা বাড়ানো হবে বলেও জানান তিনি। সূত্র: কালের কণ্ঠ