সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পালের গানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-শিক্ষিকারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রতি সংহতি প্রকাশ করছেন।
বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নেই। বিষয়টি আমি আপনার কাছ থেকেই প্রথম জানলাম। ভিডিওটিও দেখিনি। তবে যাদের কাছে শুনেছি, তারা বলেছেন সেখানে কোনো অশ্লীলতা নেই। যদি সত্যিই কোনো অশ্লীলতা না থাকে, তাহলে শুধু গান গাওয়াকে আমি অন্যায় মনে করি না। ভিডিও না দেখে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
এ ঘটনায় শিক্ষক সমাজের অনেকেই বলছেন, শিক্ষকরাও রক্ত-মাংসের মানুষ। তাদেরও আনন্দ-বেদনা, ব্যক্তিগত জীবন ও মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। প্রতিদিন সমাজে নানা অশালীন ও অনৈতিক ঘটনা ঘটলেও তা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। অথচ শিক্ষকরা ব্যক্তিগত জীবনের কোনো সাধারণ বিষয় প্রকাশ করলেই তা সমালোচনার মুখে পড়ে।
কলেজশিক্ষক জান্নাত আরা খান পান্না ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমিও শিক্ষক। নাচতে জানি না বলে হাঁটছি। কারও দৃষ্টিতে যদি নাচ মনে হয়, তবে নাচছি। আর কারও জাত গেলে আমার কিছু করার নেই। সংহতি বিউটি পাল।’
শিক্ষিকা সামিয়া শিকদার লিখেছেন, ‘বিউটি রানী পাল ম্যাডামকে হেনস্তার চেষ্টা সফল হয়নি। আজ প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী পাল। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাব।’
শিশুসাহিত্যিক হুমায়ুন কবীর ঢালী লিখেছেন, ‘একজন শিক্ষকও রক্ত-মাংসের মানুষ। তারও আনন্দ প্রকাশের অধিকার আছে, কষ্টে মন খারাপ হওয়ার অধিকার আছে। যা অশ্লীল, তা শুধু শিক্ষকের জন্য নয়, সবার জন্যই অশ্লীল। আর যা শালীন ও মার্জিত, তা কোনো নির্দিষ্ট পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।’
রাসেল আমিন লিখেছেন, ‘একটি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়া সহজ কথা নয়। বিউটি রানী পাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। তিনি অত্যন্ত মেধাবী। তাকে নিয়ে এক শ্রেণির বিকৃত মানসিকতার মানুষ নোংরামি করার চেষ্টা করেছে। তবে তারা সফল হয়নি।’
শিক্ষক দীপা মণ্ডল লিখেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের আনন্দময় পাঠদান নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের নাচ, গান, অভিনয়সহ নানা দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়। অথচ একজন শিক্ষক নিজের আনন্দের একটি মুহূর্ত প্রকাশ করলেই সমালোচনার মুখে পড়েন। শাড়ি পরিহিত অবস্থায় একটি সাধারণ ভিডিও কীভাবে অশ্লীল হতে পারে?’
শিক্ষক তন্দ্রা তনু লিখেছেন, ‘এখনও কেউ কেউ মনে করেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মানেই অভাবের প্রতীক। তাই একজন শিক্ষক পরিচ্ছন্ন পোশাকে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হাসিমুখে থাকলে তা অনেকের সহ্য হয় না। কিন্তু সময় বদলেছে। শিক্ষকও সুন্দরভাবে বাঁচবেন, হাসবেন, নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করবেন, এটাই স্বাভাবিক।’
জানা গেছে, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রানী পাল স্কুল চলাকালে নয়, বরং ছুটির পর ভিডিওটি ধারণ করেন বলে জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা। পরে ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে ভিডিওটি প্রকাশ করেন প্রবাসী তরুণ আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ।
বিউটি রানী পাল কালবেলাকে বলেন, ‘আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ আমার অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি ডাউনলোড করে তার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছেন। সেখানে আমাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যও করা হয়েছে।’
তার দাবি, আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণের পাঠানো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে এমন কাজ করেছেন। পরে ফোন করে ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রশ্ন করে হেনস্তার চেষ্টা করেন। ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
এ ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিউটি রানী পালের পক্ষে অবস্থান নেন। অনেকেই তার ব্যবহৃত একই গান দিয়ে ভিডিও তৈরি করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
বিউটি রানী পাল বলেন, ‘কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। এভাবে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা কাম্য নয়।’
তিনি শিক্ষক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হলে সমাজ আরও বেশি নৈতিক হবে।’
অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আইনি জটিলতায় যেতে চাই না। সারা দেশের মানুষের যে নৈতিক সমর্থন পেয়েছি, সেটিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
অভিযোগের বিষয়ে আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ কালবেলাকে বলেন, ‘আমি ম্যাডামকে আদাব জানিয়ে শুধু ভিডিওটি সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে চেয়েছি। এর বাইরে আর কিছু বলিনি।’
এ বিষয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সুহেল মোল্লা কালবেলাকে বলেন, ‘বিউটি রানী পালের মূল পোস্টটি আমি এখনো সরাসরি দেখিনি। তবে ভাইরাল ভিডিওটি দেখেছি। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নীতিমালার কোনো লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।’
তিনি আরও জানান, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দেশনায় ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারেন। তবে কী ধরনের পোস্ট বা মন্তব্য করা যাবে, সে বিষয়ে কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। বিউটি রানী পালের ভাইরাল ভিডিও বা পোস্টে নীতিমালাবিরোধী কোনো বিষয় রয়েছে কি না, সেটিই তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
প্রসঙ্গত, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ উপলক্ষে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা নির্বাচিত হন বিউটি রানী পাল। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।