কালুরঘাট সেতু পার হতে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয় পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীদের। সেতু পার হয়ে নগরে প্রবেশ করতেই তাদের পড়তে হয় আরও বড় বিড়ম্বনায়। মোহরা থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা সড়কের ওপর বসা দুটি বাজার বড় বাধা হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচলে। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত এই অংশে ছয় লেনের সড়কের চার লেনই থাকে হাটের বিভিন্ন দোকানের দখলে। ইজারাদারের ‘বর্ধিত বাজার’-এর কারণে সড়কে ‘নেই’ হয়ে গেছে ফুটপাতও। ফলে সড়কে একই সঙ্গে চলে গাড়ি আর মানুষ।
শুধু দোকানপাট কিংবা হাটবাজারই নয়, কাপ্তাই রাস্তার মোড়ে অবৈধভাবে গাড়ির স্ট্যান্ড গড়ে ওঠা, সড়কের যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, যাত্রী উঠানো-নামানোর কারণেও এখানে নিয়মিত যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে, বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত যানজট হয়। বিশেষ করে, মঙ্গল ও শুক্রবার সাপ্তাহিক হাটের দিনে দুর্ভোগ বহুগুণে বেড়ে যায়। থমকে যায় গাড়ির চাকা। ইঞ্চি ইঞ্চি করে সামনে এগিয়ে যায় যানবাহন।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে দুটি পথ দিয়ে নগরে প্রবেশ ও বের হওয়া যায়। এর একটি হচ্ছে– কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু, অপরটি কালুরঘাট সেতু। এছাড়া উত্তর চট্টগ্রামের হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ আশেপাশের কিছু এলাকার নগরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ হচ্ছে কাপ্তাই রাস্তার মাথা। ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ জংশন এখন লোকজনের জন্য রীতিমতো ‘দুর্ভোগের জংশনে’ পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে চলে আসলেও বিষয়টি যেন দেখারই কেউ নেই।
গত মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় কাপ্তাই রাস্তার মাথায় যেতেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। এরইমধ্যে কালুরঘাট সেতু পার হয়ে আসা দক্ষিণ চট্টগ্রামের ও কালুরঘাট থেকে ছেড়ে আসা সিটি সার্ভিসের বিভিন্ন যানবাহন, কাপ্তাই সড়ক হয়ে আসা উত্তর চট্টগ্রামের যানবাহন এবং নগরের বহদ্দারহাট থেকে আরাকান সড়ক হয়ে আসা যানবাহনে একাকার এই ব্যস্ততম পয়েন্ট।
একসঙ্গে এত গাড়ির স্রোত, সঙ্গে কাজীরহাটে সড়ক দখল করে বসা দোকানি ও ক্রেতাদের বেচাকেনার ধুম– সব মিলিয়ে থমকে যায় গাড়ির গতি।
মঙ্গলবার বসা কাজীর হাটে গিয়ে যে চিত্র দেখা গেছে, তা এক কথায় বিস্ময়কর। দুপুরের পর থেকে ছয় লেনের সড়কের চার লেনই হাটের দোকানিদের দখলে চলে যায়। সড়কের দুই পাশে সারি সারি দোকানের সামনে যে ফুটপাত, তাও খুঁজে বের করা কঠিন। কারণ যার দোকান যেখানে, সেই দোকানদার তার সামনের ফুটপাতের অংশটি দখল করে রেখেছেন। ফলে ফুটপাত ধরে হাঁটার সুযোগও নেই। ওয়ানওয়ে সড়কের দুপাশের সড়কে একটি করে সচল থাকা লেনেও মানুষ আর মানুষ। ফলে চলাচলকারী গাড়িগুলোকে বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে ধীরগতিতে চলতে হয়।
সরেজমিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশে দোকানের সামনে ফুটপাত। এরপরেই মূল সড়ক। সড়কের দুটি লেনে তিন থেকে চারস্তরের, অর্থাৎ তিন থেকে চার সারির পসরা। ‘ওয়ানওয়ে সড়কটির’ দুপাশেই একই চিত্র। কেউ ভ্যানে করে, কেউবা সড়কে পলিথিন বিছিয়ে পসরা নিয়ে বসেন। তাদের কেউ বিক্রি করছিলেন শাকসবজি, কেউ মাছ-মাংস, আবার কেউ ফল-ফলাদিসহ নানা
নিত্যপণ্য। ফলে সড়কটি এত বেশি সংকুচিত হয়ে পড়ে যে, সেটিতে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হয়।
দেখা যায়, কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে শুরু হয়ে কালুরঘাটের দিকে যাওয়ার পথে সড়কের হাতের বাম পাশে মনোয়ার স্টোর নামে একটি মুদির দোকান। সামনে হাঁটাচলার ফুটপাতে সেই দোকানের পিঁয়াজ, আদা, রসুনসহ এই ধরনের পণ্য। সামনে সড়ক। সড়কে কয়েক স্তরের নিত্যপণ্যের দোকান। মনোয়ার স্টোরের কর্মচারি মো. ইমন সমকালকে বলেন, ‘ফুটপাতে মালামাল রাখায় লোকজন হাঁটতে পারে না। এ কথা ঠিক। কিন্তু আমরা তো একা না, সব দোকানের সামনেই মালামাল রাখা হয়েছে। এজন্য ইজারাদারের লোকজন আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে যান।’
দোকানটির সামনে একটি করে আরও দুটি ফল ও পানের দোকান। তাদের এক দোকানির নাম মো. মামুন। তিনি সমকালকে বলেন, ‘একজনের পেছনে আরেকজন জিনিসপত্র নিয়ে বসলে বেচাকোন কমে যায়। কিন্তু জায়গার অভাবে এভাবে বসতে হচ্ছে। এতে অবশ্য ইজারাদারই লাভবান হচ্ছেন।’ এভাবে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে ব্যাখ্যা দেন আরও কয়েকজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ি। তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, ইজারাদাররা নিজেদের ইচ্ছেমতো দোকান বসাচ্ছেন, ভাড়াও নিচ্ছেন। তাদের রয়েছে পেটোয়া বাহিনীও। ফলে কেউ তাদের ভয়ে মুখ খোলার সাহস পান না।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘গাড়ি চলাচল যাতে ব্যাহত না হয় সেজন্য হাটটির ইজারাদারদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। কিন্তু তারা তা মানেন না। ইচ্ছেমতো সড়কে দোকান বসান। বিষয়টি আমরা মেয়র মহোদয়ের নজরে আনবো।’
সূত্র: সমকাল