জাহাজকে ‘গুদাম’ বানিয়ে সাগরে ভাসছে ৭২০ লাইটার জাহাজ। এসব জাহাজে তেল, চিনি, ডালসহ ১০ লাখ টনের বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রয়েছে। রয়েছে সারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যও। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে এসব জাহাজের কোনোটি সাগরে ভাসছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে।
অথচ পণ্য সংকটে চট্টগ্রামের পাইকারি মোকাম খাতুনগঞ্জে দাম বাড়তে শুরু করেছে এসব পণ্যের। সংকট তৈরি হয়েছে বন্দরের বহির্নোঙরেও। পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ না থাকায় সেখানে আসা মাদার ভেসেলে (বড় জাহাজ) থেকেও খালাস করা যাচ্ছে না পণ্য। বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় থাকা এমন বড় জাহাজও রয়েছে ১৩৪টি। এর মধ্যে অর্ধশত জাহাজে রয়েছে ছোলা, চিনি, তেল ও গমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য। এসব জাহাজের প্রতিটি প্রতিদিন গচ্চা দিচ্ছে ২৫ লাখ টাকা।
এদিকে, দিনের পর দিন সাগরে ভাসতে থাকা জাহাজগুলোকে পাঁচ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর। তা না হলে অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর মো. শফিউল বারী বলেন, সাগরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। ইচ্ছাকৃতভাবে যারা লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব করছে এবং রমজান সামনে রেখে পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে সাগরে অভিযান চালাব। গত ২০ জানুয়ারি সব পক্ষকে নিয়ে জরুরি বৈঠকও করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, লাইটার জাহাজের সংকট তৈরি হওয়ায় বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এসব জাহাজের মধ্যে রমজানের পণ্যও রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি লাইটার জাহাজ ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে পরবর্তী ট্রিপের জন্য প্রস্তুত হয়। এখন যেসব লাইটার জাহাজ সাগরে আছে, সেগুলোর কোনো কোনোটি ২০ থেকে ৩০ দিন ধরে ভাসছে। এতে বন্দরে আসা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রমে সংকট তৈরি হয়েছে। অথচ এক দিন অপেক্ষার জন্য বড় জাহাজগুলোকে প্রতিদিন ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার ডলার বাড়তি খরচও গুনতে হয়।
অধিদপ্তরের নজরদারিতে যারা
নৌপরিবহন অধিদপ্তর বলছে, সাগরে ভাসতে থাকা পণ্যগুলোর বেশির ভাগই মাত্র ছয় বড় আমদানিকারকের। তারা হচ্ছে– টিকে গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপ। এর মধ্যে আকিজ গ্রুপ একাই প্রায় ৮০টি লাইটার জাহাজ আটকে রেখেছে। সেগুলোতে ভোজ্যতেল, সার, বিটুমিন, সরিষা, গম ও চিনি রয়েছে। লাইটার আটকে রাখার ক্ষেত্রে এর পরই অবস্থান নাবিল গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপের। এদের অধীনে আটকে আছে কমবেশি ৫০টি লাইটার জাহাজ। এই ছয় আমদানিকারকের মধ্যে সিটি গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপের পণ্যবাহী জাহাজ তুলনামূলক কম আছে। অধিকাংশ বড় প্রতিষ্ঠান নিজেদের লাইটার জাহাজে পণ্য ‘গুদাম’ করে রেখেছে।
প্রাথমিক তালিকা যাচাই করে নৌপরিবহন অধিদপ্তর নিশ্চিত হয়েছে– নাবিল গ্রুপ, আরবি এগ্রো লিমিটেড, নোয়াপাড়া ট্রেডার্স, শবনম ভেজিটেবল অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, শেখ ব্রাদার্স, স্পেকট্রাসহ এক ডজন আমদানিকারক গ্রুপ অব কোম্পানি ও আমদানিকারক ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে লাইটার জাহাজ ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। দ্রুত পণ্য খালাস করতে এদের পাঁচ কর্মদিবসের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ২০ জানুয়ারি চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে অধিদপ্তর।
কার কত জাহাজ ভাসছে সাগরে
লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা থেকে সংগৃহীত তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পণ্য নিয়ে ৪১টি ঘাটে ৭২০টি জাহাজ ভাসছে সাগরে। এর মধ্যে এমএসটি মেরিন এন্টারপ্রাইজের ১৩৯টি, সমতা শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিংয়ের ১০১টি, মডার্ন লজিস্টিকসের ৮০টি, টিএসটি গ্লোবাল মেরিটাইমের ৭৮টি, এএনজে ট্রেডিংয়ের ৬১টি, হামিদিয়া এন্টারপ্রাইজের ৫১টি এবং কাদেরিয়া এন্টারপ্রাইজ ও গ্রিন ট্রেডাসের্র ৫৮টি করে জাহাজ পণ্যবোঝাই অবস্থায় আছে।
কোন জাহাজে আছে কী পণ্য
ভাসতে থাকা জাহাজের মধ্যে অপরিশোধিত চিনি আছে ১৭টিতে। এ ছাড়া গমবাহী জাহাজ রয়েছে ১৮০টি। এটি সব পণ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া মসুর ডালবাহী ২৫টি, ভুট্টাবাহী ৫৫টি, সয়াবিন ভুসিবাহী ১২টি এবং সয়াবিন সিডবাহী জাহাজ রয়েছে ১০টি।
লাইটার সংকটে বন্দরে অপেক্ষমাণ শতাধিক জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়েবসাইটে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত জাহাজের তথ্য আপডেট করা আছে। সেই তালিকা অনুযায়ী বন্দরসীমায় জাহাজ আছে ১৩৪টি। এসব জাহাজে আছে প্রায় ৩৫ লাখ টন পণ্য। বন্দরসীমায় কনটেইনারবাহী জাহাজ রয়েছে ১২টি। এগুলোর জন্য লাইটার জাহাজ প্রয়োজন হয় না। এসব জাহাজ জেটিতে এসে সরাসরি পণ্য খালাস করে। অন্য জাহাজের মধ্যে জেনারেল কার্গো আছে ৫৩টিতে। খাদ্যসামগ্রী আছে ২৫টিতে। সার আছে সাতটিতে ও সিমেন্ট ক্লিংকার ২০টিতে। এ ছাড়া পাঁচটিতে চিনি, দুটিতে লবণ ও তেল আছে ১০টিতে।
এক জাহাজের প্রতিদিন ক্ষতি ২০ লাখ টাকা
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে মাসের পর মাস বসে থাকার নজির স্থাপন করেছে বিদেশি বড় জাহাজ। শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল জানান, এসব জাহাজকে এক দিন অলস বসে থাকলে বাড়তি গুনতে হয় অন্তত ২০ হাজার ডলার বা প্রায় ২৫ লাখ টাকা। বন্দরের পরিবহন বিভাগ বলছে, লাইটার জাহাজ না পেয়ে এক মাসের বেশি সময় ধরে পণ্য নিয়ে অপেক্ষা করা জাহাজের সংখ্যা আছে অন্তত দুই ডজন।
গত বছরের ২২ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়া থেকে ৩৬ হাজার ১৭২ টন গম নিয়ে আসা ‘ডারিয়া দিয়া’, গত বছরের ৪ নভেম্বর ব্রাজিল থেকে ৩২ হাজার ৮৫৮ টন অপরিশোধিত চিনি নিয়ে আসা ‘লিমনাস’ ও ১৫ নভেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে ৩৫ হাজার ৮৯৩ টন গম নিয়ে আসা ‘আজিয়া ফেভরোনিয়া’ জাহাজ এখনও আছে বন্দরে। অথচ ৩০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করতে লাগার কথা সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ দিন।
অভিযান এড়াতেই গুদাম বানানো হচ্ছে জাহাজকে
খাতুনগঞ্জ হামিদ উল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিছ জানান, স্বাভাবিকভাবে একজন আমদানিকারক তাঁর পণ্য রাখেন তীরে থাকা কোনো গুদামে। গুদামে পণ্য রাখলে নজরদারিতে পড়তে হয়। মোকাবিলা করতে হয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও। জাহাজে পণ্য রাখলে এসব ঝামেলা এড়ানো যায়। আবার পণ্যের সংকট দেখিয়ে পাইকারি মোকামে দামও বাড়ানো যায়। তাই লাইটার জাহাজকে গুদাম বানানোর কৌশল গ্রহণ করেছে কোনো কোনো আমদানিকারক। তিনি বলেন, রমজানের এখনও প্রায় ২০ দিন বাকি থাকলেও তেল-চিনিসহ বেশ কিছু পণ্যের দর অস্থিতিশীল রয়েছে। যেসব পণ্যের সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে, সেগুলোর দাম বাড়ছে।
ভাসমান গুদাম খালি করার নির্দেশ মন্ত্রণালয়ের
নৌপরিবহন অধিদপ্তর আমদানিকারক ও তাদের এজেন্টদের কাছে ২২ জানুয়ারি পাঠানো এক চিঠিতে ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে পণ্যবোঝাই অবস্থায় থাকা লাইটার জাহাজ থেকে দ্রুত পণ্য খালাস করতে নির্দেশ দিয়েছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর শফিউল বারী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে সাম্প্রতিক সময়ে মাদার ভেসেলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে কিছু ফ্যাক্টরি, গ্রুপ অব কোম্পানি ও আমদানিকারক পণ্যবোঝাই লাইটার জাহাজ সময়মতো খালাস না করে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে পণ্য পরিবহনে জাহাজের সংকট দেখা দিয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে বাংলাদেশে আসা মাদার ভেসেল থেকে মালপত্র খালাসের জন্য পর্যাপ্ত জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আমদানি করা পণ্য খালাসে বিঘ্ন ঘটছে এবং স্বাভাবিক পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে পড়ে দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি করতে পারে।
শুরু হয়েছে অভিযানও
ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহারের দায়ে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের ভ্রাম্যমাণ আদালত গত ১৯ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরে এমভি সিদ্দিক আহমেদ-৩ ও এমভি আরজে-১ নামে দুটি লাইটার জাহাজকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করে। অভিযানের সময় গম, ভুট্টা, জিপসাম ও ফ্লাই অ্যাশ বহনকারী ২৭টি লাইটার জাহাজ পরিদর্শন করা হয়। এসব জাহাজে থাকা মালপত্রের আমদানিকারক নাবিল গ্রুপ, মদিনা গ্রুপ, এসএস ট্রেডিং, এন মোহাম্মদ, শবনম ও টিকে গ্রুপের প্রতিনিধিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে পণ্য খালাসের জন্য সতর্ক করা হয়।
যা বলছেন আমদানিকারকরা
টিকে গ্রুপের ফিন্যান্স অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আতাহার তসলিম সমকালকে বলেন, রমজানকে কেন্দ্র করে এবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেক পণ্য আমদানি করা হয়েছে। গম, সারসহ কিছু পণ্য আরও ২০ দিন আগে বন্দরে নোঙর করার কথা ছিল। রমজানের পণ্যের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে এসব পণ্যও। লাইটার জাহাজ ছাড়া এ ধরনের পণ্য খালাস করা যায় না। তাই হঠাৎ করে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
লাইটার জাহাজকে গুদাম বানানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব লাইটার জাহাজ রয়েছে। আমরা পণ্য খালাসে সেগুলো ব্যবহার করি। এগুলোকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই।’
সিটি গ্রুপের করপোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
আকিজ ও টিকে গ্রুপের পণ্য খালাস করে মিউচুয়াল গ্রুপের মালিকানাধীন জাহাজ। এ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ আবার বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র। তিনি বলেন, তিন কারণে বন্দরে আসা বড় জাহাজ চাহিদামতো লাইটার পাচ্ছে না। হঠাৎ করে অনেক পণ্য চলে আসা, পণ্য খালাসের জন্য অত্যাধুনিক জেটি না থাকা এবং লাইটারকে গুদাম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতার কারণে এ জাহাজ নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।
সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা সোমবার রাতে সমকালকে বলেন, আমি এখন দেশের বাইরে আছি। যতটুকু জানি, লাইটার জাহাজে আমাদের খুব বেশি পণ্য নেই।
সূত্র: সমকাল