প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: জীবন ও জীবিকার মহাসংকটে দিকভ্রান্ত যেন না হই

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা: সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে যখন আগামী অর্থবছরের জন্য করোনা বাস্তবতায় জাতীয় বাজেট প্রণয়নে ব্যস্ত, তখন প্রান্ত থেকে খারাপ সংবাদ। আবার যেন ভয় জাগাতে শুরু করেছে সীমান্ত। গত সোমবার ভারত সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ছিল ৫৫ শতাংশ। পাশের জেলা রাজশাহীতেও ছিল ৪৫ শতাংশ। করোনা মহামারিতে একদিনে দৃশ্যত এত বেশি শনাক্তের হার এর আগে দেশের কোথাও দেখা যায়নি। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ১০ জন করোনা রোগী।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আছড়ে পড়েছিল লকডাউনের তরঙ্গ। কিন্তু অদম্য মানুষকে ঈদ উদযাপন থেকে থামানো যায়নি। ফেরিঘাটে, রাস্তাকে জনসমুদ্র বানিয়ে বাড়ি যাওয়া আসা হয়েছে। করোনাভাইরাসকে পাত্তা না দেওয়ার এমন আয়োজন জগৎ সভায় আর দেখা যায় নি। এরমধ্যে আছে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের লাল চোখ। আর সেই সীমান্তেই কিনা এখন সংক্রমণের এমন উচ্চ হার।

লকডাউন এখনও চলছে, তবে সব খোলা রেখে, কিছু সাধারণ বিধিনিষেধ দিয়ে। প্রশ্ন ছিল, প্রশ্ন আছে– লকডাউন কি সবার জন্য? লকডাউনে কি সবার প্রাণ বাঁচবে? মানুষে মানুষে মেশামেশি বন্ধ করতে, সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে ঘরের মধ্যে বন্ধ থাকার নির্দেশ। কিন্তু যার ঘর নেই? যার ঘর এত ছোট যে, ঘরে থাকলেই গায়ে গা লাগে? যারা পরিযায়ী? যারা অন্য জেলা থেকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে যায় রুটি রুজির খোঁজে, কোনোরকমে মাথা গুঁজে থাকে? কথাগুলো এজন্য বলা যে, আমাদের শ্রমশক্তির বড় অংশই বেঁচে থাকে অস্থায়ী আয়ের পথ ধরে। এমনকি যাদের আমরা মধ্যবিত্ত বলি, তাদের জীবনও কচু পাতার পানির মতো টলমলে, চাকরি নেই, নিয়মিত বেতন নেই, কোনও সুরক্ষা নেই।

গত মার্চ মাসে করোনাভাইরাস শনাক্তের পর থেকে যারা কাজ হারিয়েছে তারা সবাই কাজ ফিরে পায়নি। এদের ওপর নির্ভরশীল পরিবার দ্রুত গরিবি রেখার নিচে নেমে যাচ্ছে। এরা জিরো-ইনকাম গ্রুপ থেকে কবে লোয়ার ইনকাম গ্রুপে ফিরবে আন্দাজ করা কঠিন। ঠিক এমন বাস্তবতায়ই আসছে বাজেট। আগামী ৩ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সরকার নতুন বাজেটের আকার ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যে অর্থবছরটি বিদায় নিচ্ছে, অর্থাৎ ২০২০-২১-এ মূল বাজেটের আকার ছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।

বড় আকারের বাজেট নিয়ে প্রতিবছরই আলোচনা হয়। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের সক্ষমতা নিয়ে। আমরা সবাই জানি যে গত বছর মার্চ থেকে করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটি, লকডাউন ও বিধিনিষেধের কারণে মার খেয়েছে গোটা অর্থব্যবস্থা। মূল বাজেটে যা ধরা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। তবে বছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ বা ৪ শতাংশের খানিক বেশির কথা বলা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার খেয়েছে ছোট ছোট দোকান, রেস্তোরাঁ, ছোট কারখানা, সেবা খাতের ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো। লকডাউন শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে মার খেয়েছে ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ব্যবসা। উৎপাদনের চাকা ঘোরেনি বহুদিন। নিম্ন আয়ের মানুষ জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। রফতানি আয় কমেছে। আমদানিও হ্রাস পেয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই হয়েছে নেতিবাচক। অবশ্য প্রবাসী আয় বৃদ্ধির পেছনে সরকারের ঘোষিত ২ শতাংশ এবং অনেক ব্যাংকের বাড়তি আরও ১ শতাংশ প্রণোদনার বড় ভূমিকা রয়েছে।

যে বাজেট দেবেন অর্থমন্ত্রী সেখানে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, চাকরি হারানো শ্রমিকদের নগদ সহায়তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ প্রাধান্য পাওয়ার কথা। করোনার ধাক্কা সামলে ব্যবসাপাতি, কারখানায় উৎপাদন আবার আগের ছন্দে ফিরবে কবে কেউ জানে না। জীবন-জীবিকা নিয়ে মানুষ এক আতঙ্কে বাস করছেন। এ অবস্থায় চাহিদা কমে যায়, চাহিদা কমলে জোগান ও উৎপাদনও কমে যায়। পুরো অর্থনীতিই ধীরগতির দিকে ধাবমান। বেশি সমস্যায় পড়ছেন ছোট উদ্যোক্তা, অল্প আয়ের মানুষ। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের একটা বড় বাজার বৈশাখ আর ঈদ। সারা বছরের বড় বিক্রি তাদের এই সময়ে হয়। যারা তাদের সঙ্গে কাজ করেন তাদের ওপরও প্রভাব পড়েছে। ফলে কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়েছে।

বাজেট আয়ের বড় অংশ আসে এনবিআরের মাধ্যমে। বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম আট মাস জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বাকি চার মাসে আদায় করতে হবে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা, যা প্রায় অসম্ভব। আবার সেটা আদায় করতে গিয়ে নিবর্তনমূলক আচরণ করলে প্রভাব পড়বে ব্যবসা বাণিজ্যে।

এক বছরের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা বলছে, দেশব্যাপী লকডাউন কোভিড সংক্রমণ আটকানোর জন্যে কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। আর্থিক চক্র থামিয়ে দিয়ে কিছু হবে না। তাই বাধ্য হয়েই আংশিকভাবে সব চালু করতে হচ্ছে। এখন আপৎকালীন পরিস্থিতি চলছে। আর এসব বিবেচনা মাথায় রেখেই বাজেট করতে হবে। নিশ্চয়ই আসল দৃষ্টি থাকবে দরিদ্র মানুষকে খাদ্য ও সহায়তা দেওয়ার ওপর। জীবন ও জীবিকার মহাসংকটে দিকভ্রান্ত যেন না হই। লেখক: সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত