প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অজয় দাশগুপ্ত: চোখের তারায় ভাসিয়ে রেখো রায়ের বাজার বধ্যভূমি

অজয় দাশগুপ্ত, সিডনি, অস্ট্রেলিয়া থেকে: আমার মতে, মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলোর একটি এই দিন। যাকে ইতিহাস বা বিজ্ঞজনেরা সিভিল ওয়ার কিংবা গৃহযুদ্ধ বলেন, তাতে মানুষ মরা যাব এটাই স্বাভাবিক। ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়া লাওসের মতো দেশগুলোয় জীবনহানির সংখ্যা ছিলো ভয়াবহ। এই তিনটি দেশে যাবার সুবাদে আমি দেখেছি সেই বিভীষিকার রেখে যাওয়া প্রতিফলন। হ্যানয়ের জাদুঘরটি আমাকে স্হবির করে দিয়েছিল। সাদামাটা একটা বহুতল ভবনের সব ঘরগুলোই যেন আর্তনাদ আর কান্নার বাতাসে ভারী। দুনিয়া কাঁপানো সেই ছবিটির তলায় ঠাঁই দাঁড়িয়েছিলাম বেশ কিছুটা সময়। যে ছবিতে নাপাম বোমার তেজে কাপড় খুলে নগ্ন এক নারী ও পুরো গ্রামবাসীরা দৌড়াচ্ছিল। কিন্তু এতোকিছুর পর ও তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি দিনকে অতিক্রম করতে পারেনি। যে দিনটি দুনিয়ার ইতিহাসে পরিকল্পিতভাবে মেধা ও মগজহীন করার একটি কালো দিন।

পাকিস্তানীরা বোঝে গিয়েছিল তাদের সময় শেষ তাদের আর পালানো বা আত্মসমর্পণ ছাড়া পথ নেই। সে সময় তাদের দোসর দেশীয় দালাল ঘাতক বিভিন্ন বাহিনীর লোকেরা তাদের দিয়ে একটা কাজ করিয়ে নিয়েছিল। হয়তো এই পরিকল্পনা ছিলো পাকিদেরও। তারা জানতো এই দেশকে চালাতে লাগবে মেধা। যেকোনো জাতির সমানে যাবার পথ তৈরি করেন বুদ্ধিজীবী ও মেধাবী মানুষেরা। তাদের সরিয়ে দিলে নতুন দেশটি আর যাই হোক মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। তারপরের ইতিহাস রক্ত আর মেধার মগজে হোলিখেলার।

প্রশ্ন হচ্ছে আপনি আমি সবাই জানি কারা এসব নিরীহ অধ্যাপক শিল্পী, কবি, লেখক কিংবা চিকিৎসক সাংবাদিকদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কারা পাক বাহিনীকে বাড়ি চিনিয়ে নিয়ে গেছিল। কারা প্রবীণ অধ্যাপকের ছাত্র হয়ে গুরুকে ধরিয়ে দিয়েছিল। জি সি দেব তার ছাত্রকে খেতেও বলেছিলেন, আর তার প্রতিদান পেলেন পরদিন পেবাছনে হাত বাঁধা চোখে ঠুলি পরিয়ে লাশ হয়ে রায়ের বাজারে শুয়ে থাকা। এটা মনে রাখতেই হবে যাঁরা কোনোদিন অস্ত্র হাতে নেননি, গুলি চালানো কী তাও বোঝেন না, সেই কলম কালি তুলি হারমোনিয়ামের মানুষগুলোকে কেন মেরেছিল তারা? কারণ তারা চালে ভুল করে না। করেও নি। করি আমরা।
আমাদের মাফ মার্জনা আর কূট ইতিহাসের চাকায় এরা আবার দৃশ্যপটে। সেই চৌধুরী মাইনুউদ্দীন এখনো বহাল তবিয়তে লন্ডনে আছে। তার টিকিও স্পর্শ করতে পারিনি আমরা। এদিকে দেশজুড়ে আবার তৎপর সেসব দালালেরা। তারা খোদ জাতির পিতার ভাস্কর্য ভাঙতেও আজ বেপরোয়া। তাই চিন্তা করতেই হবে। এবার চোখ খুলে হাত না বেঁধেই মারবে, মরতে হবে। এখনো সময় আছে, ঘুরে না দাঁড়ালে সেই কবে আমার লেখা ছড়ার বাস্তবতাই মেনে নিতে হবে আমাদের, এ দেশেই দাঁড়িয়ে যখন লিখছো গদ্য পদ্য তুমি/চোখের তারায় ভাসিয়ে রেখো রায়ের বাজার বধ্যভূমি।
লেখক : কলামিস্ট

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত