প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অনিয়ম-দুর্নীতিতে ধ্বংস হতে চলেছে যশোর বিসিক

জাহিদুল কবীর মিল্টন: যশোর বিসিক শিল্প নগরীটি বর্তমান ও সদ্য অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়া দুই কর্মকর্তার কারণে ধ্বংস হতে চলেছে। এই দুই কর্মকর্তা নিজেদের আখের গুছাতে বিসিককে ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার সম্পাদের পাহাড় গড়েছেন। বিসিক শিল্প নগরীটি যেন তাদের বাপ-দাদার সম্পদ। ওই দুই কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে যে সম্পদ গড়েছেন তা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন যশোর বিসিক শিল্প নগরীরর মালিকরা।

অভিযোগে জানা যায়, যশোর বিসিক শিল্প নগরী ৫০ একর জমি ওপর নির্মিত একটি অতি পুরাতন শিল্প নগরী। এখানে ১২৩টি বিভিন্ন ধরণের শিল্প কল-করখানা রয়েছে। আর এসব কলকারখানার মালিকরা তাদের প্রতিষ্ঠানটি নিয়ম বর্হিভূতভাবে অন্যের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। প্রকৃত মালিকদের এখানে কোন কারখানা নেই বললেই চলে। অথচ নিয়ম রয়েছে, বিসিকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ভাড়া দেবার। আর এ ভাড়ার একটি অংশ বিসিক পাবে। কিন্তু সদ্য অবসরোত্তর উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান ও শিল্প নগরীর কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী যোগসাজসে ওই কারখানার মালিকদের কাছে প্রতি মাসে মোটা অংকের মসোহারা নিয়ে অবৈধ কাজকে বৈধতা দিচ্ছেন। এ রকম কারখানার মধ্যে রয়েছে মেসার্স আজিজ সিল্ক মিলস, জাকির মেশিন টুলস, আজিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, সদ্য অবসরে যাওয়া উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান ও শিল্প নগরী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী শিল্প প্লটের লে-আউট প্লান পাশ করা ছাড়া উভয় পক্ষের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে মালিকানা হস্তান্তর দলিল সম্পাদনা করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য আদ-দ্বীন ফার্মাসিউটিক্যালসসহ আরও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া যশোর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিসিক শিল্প নগরীর মধ্যে অবৈধদোকান ও প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করার জন্য বার বার নির্দেশ দিলেও তারা কখনো পালন করেননি। অভিযোগ রয়েছে, ওই সব দোকান থেকে উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান ও শিল্প নগরী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী প্রতিমাসে ভাড়া আদায় করে থাকেন। আর বিসিকের মধ্যে অবৈধ দোকান ও প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে সন্ধ্যার পর মাদক সেবী ও সন্ত্রাসীদের অভয়রণ্যে পরিণত হয়। শুধু তাই নয়, নারীদেরকে নিয়ে এসে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান বলেন, বিষয়টি তন্ত করেন তারপর আপনারা সংবাদপত্রে লেখালেখি করেন।

বিষয় সম্পর্কে সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর বলেন, বিসিকের হেড অফিসের অনুমতি সাপেক্ষে এসব করা হয়েছে।

অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান কোটি কোটি টাকার সম্পাদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। তিনি ঢাকা মগবাজারে একটি ফ্লাট, যশোর শিল্প নগরীরর পাশে বালিয়াডাঙ্গায় মৌজায় একটি বাড়ি কিনেছেন, তার শ্বশুর বাড়ি যশোরের মণিরামপুরের কাশেমনগর ইউনিয়নে লেবুতলা গ্রামে ১৫ থেকে ২০ বিঘা জমি কিনেছেন। যশোর শহরের রেলরোডে ফুড গোডাউনের কোটি টাকা মূল্যের জমি কিনেছেন। সেখানে বর্তমানে বাড়ি নির্মানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমানের এসব সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলতে অস্বীকার করেন।

যশোর বিসিক শিল্প সহায়ক কেন্দ্রের উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান অবসরে গেলেও থেমে নেই তার অনিয়ম ও দুর্নীতি। তিনি শিল্প সহায়ক কেন্দ্রের শিল্প নগরীর কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর সহায়তায় দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন। সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর নামে বরাদ্দকৃত কোয়াটারটি একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারির নামে বরাদ্দ দেখিয়ে সেখানে উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। যাতে করে তার কোন হাউজ ভাড়া না কাটা হয়। এমনকি ওই কোয়াটারে সাবলেট ভাড়াও দিয়েছেন লুৎফুর রহমান। এতে করে ওই তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারির বেতন থেকে প্রতিমাসে টাকা কেটে নিচ্ছে সরকার। ইতিপূর্বে উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমানকে দুই বার ঝিনাইদহে বদলি করা হলেও তিনি পরিবার নিয়ে যশোর বিসিকে বসবাস করে আসছেন। আর এভাবে দীর্ঘ দুই দশক চলে আসছে।

এ বিষয়ে উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান বলেন, আমার বেতন থেকে প্রতিমাসে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া কাটা হয়। যশোরে এ রকম ভাড়ার কোন ফ্লাট নেই। তিনি এ ব্যাপারে তদন্ত করার আহবার জানান।

অভিযোগ রয়েছে, উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান দাযিত্ব থাকা কালীন সময়ে ড্রেন, কালভার্ট, রাস্তা মেরামত ও পুন:নির্মাণের কোন কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান করতে পারেনি। টেন্ডারে কার্যদেশ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ থেকে ওই সকল কাজ কিনে নিতেন উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান। পরে তিনি নামমাত্র কাজ করে টাকা তুলে নিতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ২০১৫ সালে যশোর বিসিকে ড্রেন নির্মাণের জন্য ১৯ লাখ টাকার টেন্ডার আহবান করা হয়। টেন্ডারে কার্যাদেশ পায় ঢাকার মেসার্স নির্মাণ এন্টারপ্রাইজ। কিন্তু ওই প্রতিষ্টানকে কোন কাজ করতে দেওয়া হয়নি। উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান ওই কাজ কিনে নিয়ে নিজে লোক দিয়ে করেন। আর ওই কাজের স্থায়ী ছয় মাসও হয়নি। এরপর থেকে সামান্য বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় যশোর শিল্প নগরী। আবারও এ বছর ওই কাজের নতুন টেন্ডার আহবান করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান জানান, আমি কোন কাজ করিনি। সব টেন্ডারের মাধ্যমে করা হয়েছে। এর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।

গত বছর ৩০ অক্টোবর ডিজিএম (উপ-মহাব্যবস্থাপক) লুৎফর রহমান অবসরোত্তর ছুটিতে যান। এজন্য তাকে ১ নভেম্বর উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমানকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শিল্প নগরী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী শিল্প মালিক ও অফিসের কর্মচারীদেরকে জিম্মি করে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে। এই চাঁদার টাকা দিয়ে উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমানকে একটি এসি, কম্পিউটারসহ প্রিন্টার, ও লুৎফর রহমানের স্ত্রীর জন্য শাড়ি, স্বর্ণলংকার উপহার দেন। অথচ সরকারি চাকরির নিয়ম অনুয়ায়ী কোন উপহার গ্রহণ করা নিয়ম বর্হিভূত ও পরিপন্থি।

অবসরোত্তর ছুটিতে যাওয়ার সময় উপহার সামগ্রী নেওয়া সরকারি চাকরির বিধিমালা আছে কিনা জানতে চাইলে উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান জানান, আমি তো কারো কাছে কিছু চাইনি। তারা আমাকে ভালোবেসে দিয়েছে। একজন মানুষকে কেউ কিছু দেয় সেটা নেওয়া কি খুব অপরাধ।

চাঁদা আদায় করে উপহার দেবার বিষয়ে সাইফুল ইসলাম চৌধুরী জানান, উপহার আমরা দিতেই পারি। একজন কর্মকর্তার স্ত্রীকে শাড়ি দেওয়া কোন অপরাধ নাকি ?

ঝালকাঠিতে পুকুর ভরাট কাজের দুর্নীতির অভিযোগে শিল্প নগরী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর নামে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করে। এরপর তাকে যশোরে বদলি করা হয়। এখানে এসেও চালিয়ে যাচ্ছেন তার অপকর্ম।
এ বিষয়ে সাইফুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন, এ বিষয়ে জানার আপনি কে ? আইন আছে আইন আমার বিচার করবে।

নারী নিয়ে বিসিকে আনন্দ ফূর্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার যা খুশি তা আমি করতে পারি। বিষয়টি আমার ব্যক্তিগত।
উপ-মহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমান দায়িত্ব পালন করার সময় বিসিকের জিপ গাড়িটি নিজের ইচ্ছামত ব্যবহার করেছেন। গত বছর সেপ্টম্বর মাসে তার ভাইপো ও ভাইঝির বিয়েতে বিসিকের গাড়িটি ব্যবহার করেছেন। জিপ চালক ইছহাক সর্দারকে অফিসে রেখে গাড়িটি নিজের ছেলেকে ড্রাইভ করতে দিয়ে যেমন খুশি তেমন ব্যবহার করেছেন। অথচ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যবহারের কোন নিয়ম নেই। এ ক্ষেত্রে কোন নিয়মই মানেননি লুৎফর রহমান। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি সম্পদ অপচয় করেছেন।
এ ব্যাপারে লুৎফুর রহমান বলেন, বিসিকের গাড়ি আমার ব্যক্তিগত কোন কাজে ব্যবহার করিনি।

বর্তমানে এই দুই কর্মকর্তা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে ও বকেয়া কাজ সম্পাদনের জন্য নড়াইল বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক কামরুল হাসানকে যশোর বিসিকের ডিজিএম পদে বসানোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যাতে করে লুৎফর রহমান ও সাইফুল ইসলাম চৌধুরী নিজেদের অপকর্ম চালাতে পারেন।

এ ব্যাপারে লুৎফুর রহমান বলেন, কারো পোস্টিং দেওয়া আমার কাজ নয়। সরকার যাকে খুশি তাকে নিয়োগ দিতে পারে। বিষয়টি সরকারের। এখানে আমার কোন হাত নেই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত