যুক্তরাজ্যের বৈধ ভিসা, নিশ্চিত টিকেট এবং আনুষঙ্গিক সব কাগজপত্র থাকার পরেও বাংলাদেশ থেকে লন্ডনগামী যাত্রীদের বিমানে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। গত ৩০ জানুয়ারি থেকে সিলেট ও ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে। স্টুডেন্ট ভিসা, ডিপেন্ডেন্ট ভিসা এমনকি যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত যাত্রীরাও চেক-ইন কাউন্টার থেকে ফেরত আসছেন। এতে একদিকে যাত্রীরা যেমন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, তেমনি তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চেক-ইন করার সময় এয়ারলাইন্সের সিস্টেমে ‘সিস্টেমেটিক এরর’ বা ‘যুক্তরাজ্য হোম অফিসের নিষেধাজ্ঞা’ দেখানো হচ্ছে। অথচ যাত্রীদের দাবি, তাদের ভিসা ও ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস সম্পূর্ণ বৈধ।
ভুক্তভোগীদের চরম ভোগান্তি
সিলেটের যাত্রী শফিকুর রহমান জানান, তিনি এবং তার স্ত্রী একই ধরনের ভিসায় যুক্তরাজ্য যাচ্ছিলেন। গতকাল তাদের ফ্লাইট ছিল। কাউন্টারে তার স্ত্রীর বোর্ডিং পাস ইস্যু হলেও, কোনো কারণ ছাড়াই শফিকুর রহমানের বোর্ডিং পাস আটকে দেওয়া হয়। টিকেট ‘নন-রিফান্ডেবল’ হওয়ায় বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে একাই যুক্তরাজ্যে পাঠিয়ে তিনি দেশে থেকে যান। এতে তার টিকেটের পুরো টাকা গচ্চা গেছে।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী আরেক যাত্রী টেলিফোনে জানান, ম্যানচেস্টারগামী ফ্লাইটে ওঠার জন্য ৩০ জানুয়ারি তিনি বিমানবন্দরে যান। সেখানে সিস্টেম এরর দেখিয়ে তাকে আটকে দেওয়া হয়। অথচ তার পরিবারের অন্য সদস্যরা একই ফ্লাইটে যেতে পেরেছেন। তিনি জানান, ৩০ জানুয়ারি অন্তত ৭ থেকে ১০ জন যাত্রীকে একইভাবে ফ্লাইট থেকে ‘অফলোড’ করা হয়েছে এবং দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছে।
কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
বিষয়টি নিয়ে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমদ বলেন, ‘এটা সিলেট বিমানবন্দর বা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব কোনো সমস্যা নয়। আমরা জেনেছি, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী অনেক যাত্রীর ক্ষেত্রেই সিস্টেমে সমস্যা হচ্ছে। চেক-ইনের সময় ব্রিটিশ হোম অফিসের সার্ভার থেকে ক্লিয়ারেন্স না আসায় তাদের বোর্ডিং পাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমরা যাত্রীদের ব্রিটিশ হোম অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিচ্ছি।’
তিনি এ ব্যাপারে তিনি এ ব্যাপারে সিলেটে বিমানের ষ্টেশন ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। বিমানের সিলেটের স্টেশন ম্যানেজার শাকিল আহমদের ফোনে রোববার কয়েকদফায় যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বিমানের একটি সুত্র জানায়, অনেক যাত্রীর ক্ষেত্রে ব্রিটিশ হোম অফিসের রেস্ট্রিকশন দেখানোয় বোর্ডিং পাস ইস্যু হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে বিমানকে ঐ অফলোড করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে বিমান লন্ডন অফিসের পক্ষ থেকে হোম অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল কিনা, তা জানতে বিমানের ইউকে ও আয়ারল্যান্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার রিয়াদ সুলাইমানের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
কেন হচ্ছে এই সমস্যা?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই জটিলতার মূল কারণ যুক্তরাজ্যের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার ‘ডিজিটালাইজেশন’ বা ই-ভিসা প্রক্রিয়ায় রূপান্তর।
ই-ভিসা ও পাসপোর্ট লিঙ্কিং জটিলতা: যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব ধরনের ফিজিক্যাল ভিসা ডকুমেন্ট (যেমন- বিআরপি কার্ড) বাতিল করে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ‘ই-ভিসা’ চালু করার প্রক্রিয়ায় আছে। অনেক প্রবাসী তাদের বিআরপি (বায়োমেট্রিক রেসিডেন্স পারমিট) থেকে ই-ভিসায় মাইগ্রেট করেছেন ঠিকই, কিন্তু নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্টের তথ্য তাদের ইউকে ভিসা অ্যান্ড ইমিগ্রেশন অ্যাকাউন্টে আপডেট করেননি। ফলে এয়ারলাইন্সের সিস্টেম যখন পাসপোর্টের তথ্য দিয়ে হোম অফিসের ডাটাবেসে নক করছে, তখন সেখানে ‘নো ভ্যালিড ভিসা’ বা এরর দেখাচ্ছে।
সিস্টেমের ধীরগতি বা ‘গ্লিচ’:এয়ারলাইন্সগুলো ‘ইন্টারঅ্যাকটিভ অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার ইনফরমেশন’ সিস্টেম ব্যবহার করে। অনেক সময় যাত্রীর ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস আপডেট থাকলেও সার্ভার জটিলতায় এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে সেই তথ্য পৌঁছাতে দেরি হয় অথবা ভুল তথ্য দেখায়।
ভিন্ন ভিসায় একই সমস্যা: শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো থেকেও যারা যুক্তরাজ্যে যাচ্ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা সম্প্রতি পাসপোর্ট নবায়ন করেছেন কিন্তু ইউকেভিআই সিস্টেমে তা আপডেট করেননি, তারাই সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
যাত্রীদের এখন কী করণীয়?
এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের ভোগান্তি এড়াতে ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞ এবং এয়ারলাইন্স সংশ্লিষ্টরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন:
ইউকেভিআই অ্যাকাউন্ট চেক করা: ফ্লাইটের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে নিজের ইউকেভিআই অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করে নিশ্চিত হয়ে নিন যে, আপনার ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস ‘লাইভ’ বা ‘অ্যাক্টিভ’ দেখাচ্ছে।
পাসপোর্ট আপডেট: আপনার বর্তমান হাতে থাকা পাসপোর্টের নম্বরটি ই-ভিসা বা ইউকেভিআই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে লিংক করা আছে কি না, তা নিশ্চিত করুন। নতুন পাসপোর্ট করলে তা অবশ্যই সিস্টেমে আপডেট করতে হবে।
শেয়ার কোড প্রস্তুত রাখা: যদিও এয়ারলাইন্স অটোমেটিক সিস্টেমে চেক করে, তবুও যাত্রীদের উচিত তাদের ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাসের ‘শেয়ার কোড’ জেনারেট করে প্রিন্ট বা ফোনে রাখা। এটি কাউন্টারে দেখিয়ে অনেক সময় সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যেতে পারে।
হোম অফিসে যোগাযোগ: যদি যাত্রার আগে কোনো সন্দেহ থাকে, তবে দ্রুত ইউকে হোম অফিসের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করে নিজের স্ট্যাটাস যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন লন্ডনের বিশিষ্ট আইনজীবি ও ল ম্যাট্রিক সলিসিটর্সের কর্নধার ব্যারিষ্টার সালাহ উদ্দীন সুমন।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন