জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট, এমন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। গত বছরের অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘জুলাই সনদে’ স্বাক্ষরের পর নভেম্বরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা এই গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেন। সরকারের লক্ষ্য, নির্বাচনের পাশাপাশি জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কারের একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করা।
একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করায় নির্বাচন কমিশনের সামনে প্রশাসনিক ও কারিগরি নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও কমিশন জানিয়েছে, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
কী এই জুলাই সনদ: সরকার প্রণীত জুলাই সনদে মোট ৪৭টি সাংবিধানিক সংস্কার এবং ৩৭টি আইন ও বিধি সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে। তবে এতগুলো বিষয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ব্যালটে যুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় সংক্ষিপ্ত আকারে চারটি মূল বিষয়ের ওপর জনগণের সম্মতি চাওয়া হচ্ছে। ভোটারদের এসব বিষয় পড়ে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’, এই দুই বিকল্পের একটিতে ভোট দিতে হবে।
গণভোটের ব্যালটে ভোটারদের সামনে যে মূল প্রশ্নটি রাখা হয়েছে। তা হলো, আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন? এর অধীনে চারটি নির্দিষ্ট প্রস্তাব যুক্ত করা হয়েছে।
কী এই চার প্রস্তাব?: প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠিত হবে। অর্থাৎ, নির্বাচন ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।
তৃতীয় প্রস্তাবে রয়েছে সংসদ ও রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার। এর মধ্যে রয়েছে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সংক্রান্ত বিষয়। এসবসহ তফসিলে উল্লেখ করা মোট ৩০টি বিষয়ে জুলাই সনদে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে, যা বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
চতুর্থ ও শেষ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।
কেন গণভোট গুরুত্বপূর্ণ: বিশ্লেষকদের মতে, এই গণভোটের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো জনগণ সরাসরি সাংবিধানিক সংস্কারের মূল নীতিগত প্রশ্নে মতামত দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি গণভোটের রায় ভবিষ্যৎ সংসদ ও সরকারের জন্য একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, জাতীয় নির্বাচনের দিন শুধু সরকার গঠন নয়, রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার নিয়েও মত দেবে জনগণ। গণভোটের ব্যালটে থাকা চারটি প্রশ্ন তাই হয়ে উঠেছে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি।