প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তাজকিয়া
কলবের চিকিৎসা করবেন যেভাবে

আমিন মুনশি : পৃথিবীতে সব পদার্থের বস্তু ময়লা বা অপরিস্কার হয়। মানব দেহে বাম স্তরের
নিচে একটি গোশতের টুকরা আছে, সেই টুকরাটির নাম কলব বা আত্মা। সেটি বালেগ
হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জানা অজানা বিভিন্ন গোনাহে অপরিস্কার বা
রোগাক্রান্ত হয়। আর তা পাপের দরুণ রোগাক্রান্ত বা ময়লা হলে সমস্ত শরীরটা
অসুস্থ বোধ হয় এবং তা সুস্থ হলে সমস্ত শরীরটা সুস্থ মনে হয়।

হাদিসের ভাষায়, ‘জেনে রাখ! নিশ্চয়ই মানুষের শরীরের মধ্যে এমন একটি গোশতের টুকরা
আছে সেটা যখন পরিশুদ্ধ হয়, তখন পুরো শরীর ঠিক হয়ে যায়। আর যখন তা ময়লা
হয় তখন সমস্ত শরীর দূষিত হয়ে যায়। আর সেটা হচ্ছে কলব তথা আত্মা।’
(সহিহ বোখারি)

মহান আল্লাহ তা’য়ালা জন্মগতভাবে উক্ত কলব নির্মল করে দান করেছেন। আর সেই
কলবকে সর্বরকম মলিনতা থেকে হেফাজত রাখতে আদেশও করছেন। পবিত্র কোরআনে পাকে
ইরশাদ করেছেন, “যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্তুতি কোনো কাজে আসবে না,
সেদিন উপকৃত হবে কেবলমাত্র সে, যে আল্লাহর নিকট আসবে বিশুদ্ধ কলব নিয়ে”।
(সূরা শু’য়ারা : ৮৮-৮৯)

আল্লাহর সন্তুষ্টি লক্ষ্যে প্রয়োজন বিশুদ্ধ কলব। নতুবা রোগাক্রান্ত কলবই
এক সময় রোগ বৃদ্ধি হয়ে মৃত্যু ঘটে কুফরি অবস্থায়। পবিত্র কোরআনের ভাষায়,
“যাদের কলবে ব্যাধি আছে, তার কলব আরও বেশি কলুষিত হয় এবং অবশেষে মৃত্যু
ঘটে কাফির অবস্থায়”। (সূরা তওবা : ১২৫)

জেনে রাখা উচিত যে, শরীরের বাহ্যিক অসুস্থতা যেমন: জ্বর, স্বর্দি, কফসহ
নানা ধরণের ব্যাধি হয়। ঠিক তেমনি কলবেরও কিছু ব্যাধি আছে যা অভিজ্ঞ
আলেমগণ দশ প্রকার বলে অভিমত দিয়েছেন। এসব রোগ হলো:

(১)অহংকার করা। (২) আত্মাভিমান, গর্ব, দম্ভ ও অহমিকা ইত্যাদি। (৩)দ্বীনের
বিষয়ে উদাসীনতা প্রদর্শন। (৪) অকারণে কাউকে ঘৃণা করা, কারণ ছাড়া অন্যের
সাথে শত্রুতাপোষণ করা ইত্যাদি। (৫) হিংসা বিদ্বেষ। (৬) মিথ্যা বলা। (৭)
অন্যের ব্যাপারে কুধারণা করা। (৮)ওয়াদা ভঙ্গ করা। (৯) লৌকিকতা করা। (১০)
গীবত করা।

উল্লেখিত বিষয়াবলী ছাড়াও আরো কিছু রোগ আছে। যেমন: কাউকে অপবাদ দেয়া,
দোষারোপ করা, কারো প্রতি কুদৃষ্টি ইত্যাদি।

কলব সংশোধনকে আরবি ভাষায় তাজকিয়াতুন নফস বলা হয়। আত্মশুদ্ধি এমন একটি
বিষয় যার দ্বারা কালবকে সংশোধন করা যায়,আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি অর্জন করা
যায় এবং তার মা’রেফাত অর্জন করা যায়।

পারতপক্ষে কলব সংশোধন ছাড়া কখনও একটি মানুষ ভাল মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতে
পারে না। সেজন্যই কলবকে সংশোধনের বিভিন্ন উপায় রয়েছে। তন্মধ্যে
কলবকে বেশ কয়েকটি অবস্থায় বিশুদ্ধতা অর্জন করানো যায়। যে সকল বিষয় আত্মিক
পরিশুদ্ধতা অর্জন করা যায় তা হল নিম্নরুপঃ
১ . ঈমান পরিশুদ্ধ করণঃ তাজকিয়াতুন নফসের চাবি হল ঈমান। আল্লাহর প্রতি
ঈমান না আনলে আত্মশুদ্ধি হবে না।

২. তাকওয়াঃ আল্লাহ পাকের ভয়ে যাবতীয় পাপাকার্জ থেকে বিরত থাকার নাম হল
তাকওয়া। তাকওয়ার দ্বারা যে কেউ নিজের কলবকে পরিশুদ্ধ করতে পারে।

৩.তওবাঃ আল্লাহর হুকুম অমান্য করে বা সীমালঙ্ঘনকারী ব্যক্তি কর্তৃক চরম
অনুশোচিত হয়ে আল্লাহর কাছে অপরাধ স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বিনয়ের সাথে ক্ষমা
প্রার্থনা করার নাম হল তওবা। আর তওবার মাধ্যমেই কলবের রোগ দূরিভূত হয়।

৪.তাওয়াক্কুলঃ সর্বাবস্থায় এক আল্লাহের উপর কেবল নির্ভর হওয়াকে
তাওয়াক্কুল বলে। তাওয়াক্কুল ছাড়া কলব সংশোধন সম্ভব নয়।

৫.জিকিরঃ আল্লাহকে স্মরণ করার নাম জিকির। কলবের যত ধরণের ময়লা আবর্জনা
আছে তা থেকে পাক সাফ করার অন্যতম মাধ্যম জিকির।

৬. কুরআন তিলওয়াতঃ কুরআন তিলওয়াত হল নফল ইবাদতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ইবাদত।
কুরআন তিলওয়াতের মাধ্যমে একজন বান্দার সাথে আল্লাহ পাকের কথোপকন হয় এবং
জিকিরের মর্যাদা লাভ করতে পারে। তার মানবিক গুণাবলী বৃদ্ধি পায়।

৭.সুন্নাতকে অনুসরণঃ সুন্নাতকে অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহর একজন
প্রিয়বান্দা হওয়া যায়। যার দ্বারা আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পারে। মুসলমান
হিসাবে সুন্নাতকে অনুসরণ করা সকলের জন্য জরুরি।

৮.নেক আমল করাঃ আত্মশুদ্ধি করার আরেকটি বিশেষ রাস্তা হল নেক আমল করা।
শুধুমাত্র ঈমান থাকলেই হবে না। মানব সৃষ্টির অন্যতম লক্ষ্য হল আল্লাহ
পাকের জন্য ইবাদত তথা নেক আমল করবে। এই ইবাদত-বন্দেগীর দ্বারা একজন
বান্দা আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পারে।

৯.সালাত আদায়,যাকাত প্রদান,সিয়াম সাধনা এবং হজ্জ পালনঃ সালাত,সিয়াম,হজ্জ
এবং যাকাত হল ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের ভিতর অন্যতম। পারতপক্ষে এ সকল আমল
ছাড়া কেউ কখনও মুসলিম থাকতে পারে না। এ সকল আমলসমূহের দ্বারা আত্মশুদ্ধি
অর্জন করা যায়।

১০. সবর করাঃ সবর অর্থ হল ধৈর্য। আর ধৈর্য হল ওই বিষয়টি যার সাহায্যে
একজন মানুষ তার বিপদ-আপদ,সুখে-দুঃখে,ক্ষুধা-তৃষ্ণায়,অত্যাচার-অবিচার
ইত্যাদি সর্বাবস্থায় এক আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে মগ্ন থাকবে এবং আল্লাহ ও
তার রাসূলের সা.পথ অনুসরণ করবে।

১১.পশুত্ব চরিত্র পরিবর্তনঃ আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য গীবত করা,মিথ্যা
বলা,অপবাদ দেওয়া,উপহাস করা,সুদ খাওয়া,ঘুষ খাওয়া,ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া
ইত্যাদির মত জঘন্য পশুত্ব চরিত্র থেকে নিজেকে সাবধান রাখাই হলো কলব
সংশোধনের অন্যতম ব্যবস্থা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ