শিরোনাম
◈ শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী আটক ◈ বৃহস্পতিবার রাত থেকে ২৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকতে পারে ডেসকোর প্রি-পেইড মিটার রিচার্জ, প্রযোজ্য যাদের জন্য ◈ ডিসেম্বরে পোশাকশ্রমিকদের বর্ধিত মজুরি চূড়ান্ত হবে, জানুয়ারিতে পাবেন বাড়তি বেতন ◈ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে চাপে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত, ঝুঁকিতে ফ্লাইট ও প্রবাসী যাত্রী পরিবহন ◈ বিশ্বকা‌পে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে টিকিটের আবেদন ৮৪ লাখ, আসন মাত্র ৩৪ হাজার ◈ সাভারে ফের পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগ ◈ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় ডেমোক্র্যাটদের, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারাল ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি ◈ মিরপুর বেড়িবাঁধে বাস-অটোরিকশার মু‌খোমু‌খি সংঘর্ষ, ৪ জ‌নের মৃত‌্যু ◈ স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইস‌্যু‌তে ম‌তের অ‌মিল, জোটে থেকেই জামায়াতকে চাপে রাখতে চায় এনসিপি ◈ এশিয়া কাপের জন্য প্রাথমিক দল ঘোষণা কর‌লো বি‌সি‌বি

প্রকাশিত : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৫ দুপুর
আপডেট : ২২ আগস্ট, ২০২৬, ০২:০০ রাত

প্রতিবেদক : আর রিয়াজ

দখলদারিত্বের অভিযোগে আবারও উত্তপ্ত চীন-ভারত সীমান্ত

অরুণাচল গোপন দখলে চীন, ভারতীয় সেনাকে টহলে বাধা

আল জাজিরা এক্সপ্লেইন: ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় চীনের বিরুদ্ধে জমি দখল এবং ভারতীয় সেনাদের গুরুত্বপূর্ণ টহল পয়েন্টে যেতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক আঞ্চলিক দল পিপলস পার্টি অব অরুণাচল প্রদেশের (পিপিএ) একটি অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে এসব দাবি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিরোধীরা সীমান্তে চীনের কথিত দখলদারির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অভিযোগের ঘটনাটি অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম ও পার্বত্য জেলা আপার সুবানসিরিকে ঘিরে। অঞ্চলটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এবং চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধপূর্ণ এলাকার অংশ।

কী পেয়েছে অনুসন্ধানী দল

Advertisement

প্রাথমিকভাবে চীনা বাহিনীর কথিত অনুপ্রবেশের খবর পাওয়ার পর পিপিএ চার সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দল সেখানে পাঠায়। দলটির নেতৃত্ব ও প্রতিবেদন সম্পর্কে পিপিএর ভাইস প্রেসিডেন্ট কালিং জেরাং আল-জাজিরাকে তথ্য দেন।

পিপিএ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিজেপি নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক জোট নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের অংশ। অরুণাচল প্রদেশেও বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে।

অনুসন্ধানী দল জানায়, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তাসিং এলাকায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী নিয়মিত টহল দিতে পারে না। এ সময় ওই এলাকায় আকস্মিক বন্যা, প্রাক-মৌসুমি ও মৌসুমি ভারি বৃষ্টিপাত এবং ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।

অন্যদিকে, প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই সময়েও চীনা বাহিনী সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় থাকে। এতে সীমান্ত রক্ষায় ভারতের অবকাঠামো ও সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেরাংয়ের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী শেরা-৫ নামের একটি সীমান্ত টহল পয়েন্ট ছেড়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের পূর্বপুরুষদের ব্যবহৃত শিকারের এলাকাগুলো হারানো নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেরাংয়ের দাবি, চীনের কথিত এই দখল নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং কয়েক বছর ধরে ধীরে ধীরে এর বিস্তার ঘটেছে। তাঁর অভিযোগ, দিল্লি ও অরুণাচল—উভয় জায়গার বিজেপি সরকারই সীমান্তবর্তী মানুষের অভিযোগ উপেক্ষা করেছে।

এর আগে গত মাসে স্থানীয় একটি আদিবাসী সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিয়ে অভিযোগ করে, চীনের কথিত দখলদারি ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং যতটা সম্ভব জমি দখলের উদ্দেশ্যেই তা করা হচ্ছে।

ভারতের সেনাবাহিনীর অস্বীকার

তবে চীনা বাহিনীর কথিত দখলদারির অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী। এক বিবৃতিতে সেনাবাহিনী জানায়, এ ধরনের সংবাদ ‘ভুল ও ভিত্তিহীন’। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি একইভাবে সরাসরি অস্বীকার করেনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়কে ভারত সবসময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে। সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর দুই দেশের বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবস্থাও নির্ভর করে।

চীনের প্রতিক্রিয়া

ভারতের মতো চীনও নতুন করে সীমান্ত উত্তেজনার অভিযোগ নিশ্চিত বা সরাসরি অস্বীকার করেনি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন বলেন, বর্তমানে চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি ‘সাধারণভাবে স্থিতিশীল’।

তিনি জানান, গত সপ্তাহে দুই দেশ সীমান্তবিষয়ক ৩৬তম বৈঠক করেছে। বৈঠকে কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা যৌথভাবে বজায় রাখার বিষয়ে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে।

দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ

চীন ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ভারতের জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের পাশ দিয়ে এই সীমান্ত বিস্তৃত। সীমান্তের বড় একটি অংশ নিয়ে দুই দেশের বিরোধ রয়েছে।

এমনকি দুই দেশ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি কোথায়—তা নিয়েও একমত নয়। এই রেখাটি দুই দেশের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডকে কার্যত আলাদা করে বলে বিবেচনা করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় এর অবস্থান নিয়ে দুই দেশের দাবিতে পার্থক্য রয়েছে।

চীন অরুণাচল প্রদেশের পুরো অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। তারা অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ নামে অভিহিত করে।

অন্যদিকে, ভারত ১৯১৪ সালের সিমলা কনভেনশনের ভিত্তিতে ম্যাকমোহন লাইনকে চীনের সঙ্গে সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করে। চীন এই সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে।

অতীতেও সংঘর্ষ

চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ বহু পুরোনো। ১৯৬২ সালে দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়েছিল। এরপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখাকে দুই দেশের নিয়ন্ত্রিত এলাকার কার্যত সীমারেখা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সীমান্তের বিভিন্ন অংশ নিয়ে বিরোধ রয়ে গেছে।

লাদাখের পশ্চিমাঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিকবার দুই দেশের সেনাদের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে। ২০২০ সালের জুনে গালওয়ানে ভারত ও চীনের সেনাদের সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় এবং চার চীনা সেনা নিহত হন।

পূর্বাঞ্চলেও উত্তেজনা রয়েছে। সিকিমের নাকু লা এলাকায় ২০২০ সালের মে মাসে এবং ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

মধ্যাঞ্চলে উত্তরাখণ্ডের বারাহোতি ও হিমাচল প্রদেশের শিপকি লা নিয়েও দুই দেশের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে।

এ ছাড়া চীন, ভারত ও ভুটানের ত্রিদেশীয় সীমান্তের ডোকলাম মালভূমিতে ২০১৭ সালে সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে ৭৩ দিনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক বি আর দীপকের মতে, এসব সীমান্ত বিরোধ একটির পর একটি বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। অতীতে গালওয়ানের মতো ছোট একটি ঘটনা কীভাবে বড় সংঘাতে পরিণত হয়েছে, সেটিই তার উদাহরণ।

এদিকে, অরুণাচলে চীনের কথিত নতুন দখলদারির অভিযোগ এমন সময়ে সামনে এলো, যখন দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যেই আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নতুন এই অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেও নজর থাকবে।

  • সর্বশেষ