ফক্স নিউজ: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইসরাইলকে বছরে ৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সমঝোতা হয়েছে। চলতি বছরের শেষেই এই অর্থ দেওয়া বন্ধ করবে ওয়াশিংটন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত থাকবে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে দেশটির ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। তবে কোন তহবিল বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি। বছরের শেষে অর্থায়ন বন্ধের প্রক্রিয়াও স্পষ্ট করেননি ট্রাম্প। কারণ, ইসরাইলকে প্রতিবছর ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রয়েছে।
ওই সময়সীমার পর ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কীভাবে চলবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা চলছে।
ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ইসরাইলের আর এই অর্থের প্রয়োজন নেই। তার মতে, কিছু ডেমোক্র্যাট ও বামপন্থি রাজনীতিক ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তার বিষয়টি ব্যবহার করে তার রিপাবলিকান সহকর্মীদের সমালোচনা করছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘এখন ইসরাইলকে অর্থ দেওয়ার বিষয়ে বলি, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও আমি একটি চুক্তি করেছি যে আমরা ইসরাইলকে বছরে ৪ বিলিয়ন ডলার দিই, এবং কয়েক মাস আগে আমরা চুক্তি করেছি যে এটি বন্ধ করছি। আমরা ইতোমধ্যে একমত হয়েছি, এ বছরের শেষ নাগাদ আমরা ইসরাইলকে অর্থ দেওয়া বন্ধ করব। তবে ইসরাইলের প্রয়োজন হলে আমরা তাদের সহায়তা করব।’
কয়েক মাস আগে চুক্তি হয়েছে বলে দাবি করলেও মঙ্গলবার কেন ট্রাম্প বিষয়টি ঘোষণা করলেন, তা স্পষ্ট নয়।
গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর ইসরাইলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকানদের ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহু সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও বিরোধীদের তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুস্পষ্ট পথ তৈরি করতে দেননি। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে হোয়াইট হাউস ও নেতানিয়াহুর কার্যালয় কোনো সাড়া দেয়নি।
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জনসমর্থন কমেছে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে। জুনে কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, ৪৮ শতাংশ মার্কিন ভোটার এবং ৬৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে অতিরিক্ত সহায়তা দিচ্ছে। ২০১৭ সালে প্রথমবার এ প্রশ্ন করা হলে এ হার ছিল যথাক্রমে ১৬ ও ২০ শতাংশ।
জরিপ ও নির্দলীয় বিশ্লেষকদের ধারণা, মঙ্গলবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির কাছ থেকে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
ইসরাইলের সমালোচনা বাড়ছে
ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ইসরাইলের সমালোচক প্রার্থীরা ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে জয় পাচ্ছেন। এমনকি মধ্যপন্থি আইনপ্রণেতারাও ইসরাইলকে কয়েক দশক ধরে দেওয়া মার্কিন সমর্থন নিয়ে ক্রমেই বেশি প্রশ্ন তুলছেন।
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ মিশিগান থেকে সিনেটে নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। নির্বাচিত হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর। তিনি ইসরাইলকে শর্তহীন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করে বলেছেন, মার্কিন অর্থায়নে আগে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
ট্রাম্প বলেন, বামপন্থিরা যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থায়নকে ‘অন্যায্যতার সংকেত’ হিসেবে ব্যবহার করছে, যা তিনি হতে দিতে পারেন না। তার বক্তব্যের রাজনৈতিক দিক তুলে ধরে ওয়াশিংটন অর্থ দেওয়া বন্ধ করছে—এ ব্যাখ্যায় ট্রাম্প বিশেষভাবে এল-সায়েদের নাম উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘কারণ তাদের (ইসরাইলের) এটির প্রয়োজন নেই, আর যখন তাদের প্রয়োজন নেই, তখন কেন আমাদের এল-সায়েদের মতো উন্মাদদের আক্রমণের শিকার হতে হবে? এটি একটি খারাপ, খুব খারাপ রাজনৈতিক বক্তব্য।’
ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের কিছু সদস্যের মধ্যেও ইসরাইলের প্রতি সমালোচনা বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, ইসরাইল প্রেসিডেন্টকে বিভ্রান্ত করেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ট্রাম্পকে ইসরাইল বিশ্বাস করিয়েছিল, ইরানকে সহজেই যুদ্ধে পরাজিত করা সম্ভব।
২০২০ সালে কংগ্রেস ইসরাইলের জন্য অর্থায়নের অনুমোদন দিয়ে আইন পাস করে। তবে অর্থ ছাড় ও বিতরণের জন্য সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদকে প্রতিবছর বরাদ্দ বিল পাস করতে হয়।
অক্টোবরে ইসরাইলের একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আপনারা যদি মনে করেন, আমি দুইবার যে সহায়তা নিশ্চিত করেছি—যা প্রতিরক্ষা বাজেটের জন্য আমেরিকার কাছ থেকে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের সহায়তা—তা আমরা পেতে থাকব, তাহলে প্রস্তুত হন এবং এই বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে যান যে এটি আর ঘটবে না, কারণ আমেরিকা বদলে গেছে।’