শুল্ক ফাঁকি দিতে তাঁতের পুরোনো যন্ত্রপাতি আমদানির নামে অটোরিকশা ও অন্যান্য অটোমোবাইলের খুচরা যন্ত্রাংশ দেশে আসছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
টেক্সটাইল যন্ত্রপাতির ওপর কম শুল্কের সুযোগ নিয়ে আমদানিকারকরা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এসব যন্ত্রাংশ আমদানি করছেন বলে জানান কাস্টমস কর্মকর্তারা।
ঘোষণা বহির্ভূতভাবে আমদানি করা এসব পণ্যের মধ্যে আছে উড স্ক্রু, নাট-বল্টু, শক কানেক্টর, শক অ্যাবজরবার পাইপ, গিয়ার, মাডগার্ড এবং অন্যান্য অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ।
দেশের সড়কে চলাচলকারী সাধারণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং স্থানীয়ভাবে পরিচয় নসিমনে এসব যন্ত্রাংশ ব্যবহৃত হয়।
কর্মকর্তারা জানান, আমদানিকারকদের একটি অংশ শুল্ক ফাঁকি দিতে মিথ্যা ঘোষণায় এসব পণ্য আনছেন। অথচ এগুলোর ওপর তুলনামূলক উচ্চহারে শুল্ক আরোপ আছে।
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে অন্তত ৩০ কনটেইনারে এ ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ পেয়েছেন কর্মকর্তারা। এতে প্রায় ৬ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করছেন তারা। ইতোমধ্যে আমদানিকারকদের জরিমানাও করা হয়েছে।
রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আরও সাড়ে ৫ কোটি টাকা আদায় করা এখনো বাকি। কিছু ক্ষেত্রে আমদানিকারকরা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ায় অর্থ আদায়ে বিলম্ব হচ্ছে।
বন্দরে আরও প্রায় ৮০টি কনটেইনার পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছে।
মিথ্যা ঘোষণায় আনা এসব যন্ত্রাংশের প্রকৃত বাণিজ্যিক মূল্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন করা হচ্ছে এবং কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
কাস্টমসের তদন্ত
নথিপত্র অনুযায়ী, এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত আমদানিকারকদের মধ্যে রয়েছে রিমি সরকার দোয়া টেক্সটাইল, এসএন টেক্সটাইল এবং আরও ৮টি প্রতিষ্ঠান।
অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার মামলার রেকর্ড থেকে জানা যায়, রিমি সরকার দোয়া টেক্সটাইল তাদের আমদানি করা পণ্যকে ৯১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা মূল্যের ১৩৩ টন পুরোনো পাওয়ার লুমের (তাঁতযন্ত্র) ঘোষণা দিয়েছিল।
কিন্তু বাস্তব পরীক্ষায় মাত্র ১০৭ টন তাঁত যন্ত্রপাতি পাওয়া যায় এবং তার সঙ্গে পাওয়া যায় ঘোষণা বহির্ভূত ৩৫ দশমিক ৩১ টন উড স্ক্রু।
আরেকটি চালানে, এসএন টেক্সটাইল ৭৯ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যের ১৩২ টন ব্যবহৃত পাওয়ার লুমের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তারা সেখানে নাট-বল্টু, শক কানেক্টর, শক অ্যাবজরবার পাইপ, গিয়ার, মাডগার্ড এবং অন্যান্য অটোমোবাইল যন্ত্রাংশসহ ৩৯ টন অঘোষিত পণ্য পান।
এই দুটি চালানের সম্মিলিত ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় ২ কোটি টাকা এবং সেই হিসেবে শুল্ক ও কর প্রযোজ্য ছিল প্রায় ৮ লাখ টাকা।
কিন্তু কাস্টমস কর্মকর্তাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই চালান দুটি থেকে আনুমানিক ১ কোটি ৭২ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র শরীফ মোহাম্মদ আল আমীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমদানি করা যন্ত্রপাতির কিছু অংশ কারখানা ব্যবহারের উপযোগী নাও হতে পারে এবং সেগুলো স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির জন্য আনা হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বলেন, 'প্রাথমিক তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, স্ক্রু, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং থ্রি-হুইলারের উপকরণের মতো উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্যগুলো ছাড়িয়ে নিতে সুবিধার্থে আমদানিকারকেরা কনটেইনারের সামনের অংশে কম শুল্কের ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি রেখেছিলেন।'
গত আগস্টে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. হেলাল আমিন এসএন টেক্সটাইল ও রিমি সরকার দোয়া টেক্সটাইলের পক্ষে পৃথক রিট পিটিশন দায়ের করেন।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তিনি শত শত রিট আবেদন পরিচালনা করেন এবং এই মুহূর্তেই মামলা দুটির বিস্তারিত বিষয় মনে করতে পারছেন না।
বিষয়টি দেখে পরে জানাবেন বলে জানান তিনি। ৩১ অক্টোবর আবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো নতুন তথ্য দিতে পারেননি।
এই দুটি প্রতিষ্ঠানের ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে আনাতুল হাসান সিঅ্যান্ডএফ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল হক ডেইলি স্টারকে জানান, কাস্টমস কর্মকর্তারা অনিয়ম শনাক্ত করার পরই তারা আমদানিকারকদের জানিয়েছেন।
'অনিয়ম চিহ্নিতের পর আমরা আমদানিকারকদের জানিয়েছি। তারা কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা আমার জানা নেই,' বলেন তিনি।
আটক চালানগুলো খালাস করে আমদানিকারকরা নেবেন কি না বা কবে নেবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।
সূত্র : দ্য ডেইলি স্টার