এনামুল হক এনা, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার (বাউফল) পটুয়াখালী : একসময় যে নদী ছিল তাদের কাছে খেলার সঙ্গী, সেই কারখানা নদী এখন যেন আতঙ্কের নাম। দিন দিন ভাঙতে ভাঙতে নদী এগিয়ে এসেছে বিদ্যালয়ের আঙিনার দিকে। কোথাও নদী আর স্কুলের দূরত্ব মাত্র ২০-২৫ ফুট, কোথাও ৫০ ফুট। এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বাউফলের কাছিপাড়া ইউনিয়নের তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
ঝুঁকিতে থাকা বিদ্যালয়গুলো হলো—চররঘুনাথদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হিসাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পশ্চিম কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে শত শত শিশু। তাদের চোখের সামনে প্রতিদিনই ছোট হয়ে আসছে বিদ্যালয়ের মাঠ ও আশপাশের জায়গা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বাহেরচর বন্দর এলাকার কারখানা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে চররঘুনাথদ্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয় ভবন থেকে নদীর দূরত্ব এখন মাত্র ২০ থেকে ২৫ ফুট। নদীর স্রোত আর ভাঙনের গতি দেখে আতঙ্কে রয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
অন্যদিকে, নদীর তীর থেকে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট দূরে রয়েছে হিসাজাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গোপালিয়া বাজার এলাকায় পশ্চিম কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রয়েছে নদীর তীর থেকে প্রায় ৫০ ফুট দূরে। গত এক মাসে এই বিদ্যালয়ের কাছাকাছি প্রায় ৫০ ফুট এলাকা নদীতে বিলীন হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
পশ্চিম কাছিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুনিল চন্দ্র দাস বলেন, ‘আমার বিদ্যালয়টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। গত বছর বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন কিছুটা বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক মাস আগে হঠাৎ করে ৫০ ফুট জায়গা ভেঙে নদীতে চলে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি একটি মসজিদ ও বাজারও ভাঙনের কবলে পড়বে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, বিদ্যালয়টি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার মতো আশপাশে জায়গা নেই। তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন, দ্রুত বিদ্যালয়টি রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নোমান বলেন, ‘নদী আমাদের স্কুলের খুব কাছে চলে এসেছে। আমরা ভয় পাই, কখন জানি স্কুলটাও নদীতে চলে যায়। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত আমাদের বিদ্যালয়টি রক্ষা করা হোক।’
স্থানীয় অভিভাবকরা বলেন, বিদ্যালয়গুলো শুধু কয়েকটি ভবন নয়; এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এলাকার শিশুদের ভবিষ্যৎ। নদীভাঙনে বিদ্যালয়গুলো হারিয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীরা। নতুন করে বিদ্যালয় নির্মাণের মতো জায়গাও অনেক ক্ষেত্রে নেই।
বাউফল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যালয়গুলোর ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ইউএনও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যালয় তিনটিতে শত শত শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। নদীভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো সময় বিদ্যালয়গুলো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষা কার্যক্রমের কথা বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শাহানেওয়াজ তালুকদার বলেন, ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙনকবলিত এলাকায় বাজের মাধ্যমে বালুর বস্তা ফেলা হবে। এতে বালুর বস্তাগুলো সঠিকভাবে একটির ওপর আরেকটি বসানো সম্ভব হবে এবং দীর্ঘদিন টিকে থাকবে।
তিনি জানান, বর্তমানে একটি বাজ পায়রা নদীতে রয়েছে। সেখান থেকে বাজ এনে বালুর বস্তা ফেলার ব্যবস্থা করা হবে। ট্রলারের মাধ্যমে বালুর বস্তা ফেলার পরিকল্পনা নেই। কারণ জোয়ার-ভাটার কারণে বস্তাগুলো ঠিক কোথায় পড়ছে, তা সঠিকভাবে বোঝা যায় না।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরও বলেন, চররঘুনাথদ্দী এলাকায় নদীভাঙন রোধে একটি কাজের অনুমোদন হয়েছে। তবে এ ধরনের কাজে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কারখানা নদীর পাড়ে এখন প্রতিদিনই বাড়ছে উৎকণ্ঠা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চোখে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা। তাদের একটাই প্রশ্ন, নদী কি তাদের বিদ্যালয়টুকুও কেড়ে নেবে?স্থানীয়দের দাবি, সেই আশঙ্কা সত্যি হওয়ার আগেই দ্রুত নদীতীর সংরক্ষণ ও ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।