প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এসব নিয়ে কি কেউ চিন্তা করেছে কোনোদিন?

অলিউল্লাহ নোমান : ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর এক পর্যায়ে কেবিনেট সচিব হিসাবে নিয়োগ পেলেন ড. সা’দত হোসেইন। তাঁর চাকুরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবার একই পদে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ১/১১-এর জরুরী আইনের সময় তিনি মঈন ইউ আহমদের সঙ্গী ছিলেন। মঈন ইউ আহমদ তাঁকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করেন।মেজর জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাঁর নিয়োগ হয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। বিদেশে পোস্টিং ছিল তাঁর। ২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাহরাইন থেকে ফিরিয়ে নিয়ে তাঁকে সেনা প্রধান করা হল। শুধু তাই নয়, ২০০৬ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা করা হল তাঁকে। কিন্তু সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তিনিই সবচেয়ে বেশি বেঈমানী করলেন। মঈন ইউ তাঁকে পুরস্কৃত করলেন মন্ত্রির পদ মর্যাদায় দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান করে।

ফখরুদ্দিন আহমদ। চাকুরি করতেন বিশ্বব্যাংকে। সেখান থেকে ডেকে নিয়ে করা হল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর। চাকুরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবসরে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাঁকে করা হল পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। মঈন উদ্দিন ক্ষমতা দখলের পর প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহন করলেন তিনি।
এরকম উদাহরণ লিখে শেষ করা যাবে না।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তারা এরকম করলেন! যার সাথে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তাঁকে এভাবে অবহেলা করেন কোন দু:খে? নিশ্চয়ই কোন একটা ‘কিন্তু’ রয়েছে। নতুবা দীর্ঘদিন এক সাথে কাজ করার পর তাদেরই বা এতটা বিরাগ হবেন কেন?!
এই দূরত্ব তৈরি হওয়ার ফাঁক ফোকরটা কোথায়!? এসব নিয়ে কি কেউ চিন্তা করেছেন কোনদিন? বা তাদের নিয়োগের আগে কি কোন ট্র্যাক রেকর্ড পরীক্ষা করা হয়েছিল? তারা আসলে কোন দলের সাপোর্টার। তাদের রাজনৈতিক চিন্তার শেকড় কোন দিকে? তাদের টার্গেট কি? রাষ্ট্রীয় ক্রাইসিসে কর্মজীবনে তাদের ভুমিকা কি ছিল??

ট্র্যাক রেকর্ড স্ক্যান করে নিয়োগ বা পদায়ন হলে এই পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়।
যেমন উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনা অভ্্ূযত্থান হয়েছিল। এই অভ্যুত্থানের সময় মঈন ইউ জুনিয়র অফিসার ছিলেন। তিনি খালেদ মোশাররফের সাথে অভ্যুত্থানে যোগ দেন। বঙ্গভবন অভিযানে অংশ নেন । রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদকে বন্দি করার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এসব লিখেছেন তিনি নিজেই।
জরুরী আইন জারির পর প্রথম দফায়-ই তিনি ৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি বাতিল করে দিলেন। কারণ, খালেদ মোশারফ চক্রকে প্রতিহত করতেই ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। তাই হয়ত: মনে মনে ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন সুযোগ পেলে প্রতিশোধ নেবেন। ১/১১-এর অসাংবিধানিক অভিযানে মঈন ইউ আহমদ ক্ষমতা নিয়েই পাল্টা প্রতিশোধটা নিলেন। ৭ নভেম্বর সরকারি ছুটি বাতিল করলেন। ৭ নভেম্বরের বিপ্লবের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই সেই দিনটিকে সরকারি ছুটি হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। মঈন সেটা সহ্য করতে পারার কথা নয়। তিনি ছিলেন ৩ নভেম্বর ব্যর্থ অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী অফিসার। সুতরাং ৭ নভেম্বর সিপাহী জনতার সম্মিলিত জাতীয় বিপ্লবের প্রতি তাঁর ক্ষোভ থাকারই কথা।

জাতীয়তাবাদী শক্তি ক্ষমতায়। ৭ নভেম্বর এ শক্তির উত্থান ঘটেছিল। অথচ মঈন ইউ আহমদ সেনা প্রধান নিয়োগ পান ৯ জনকে ডিঙ্গিয়ে। নিয়োগের আগে রাষ্ট্রীয় ক্রাইসিসে কর্মজীবনের ভুমিকা স্কেন করলে কোন অবস্থায় তাঁকে সেনা প্রধান নিয়োগের কথা নয়। তাও আবার ৯ জনকে ডিঙ্গিয়ে! নিশ্চয়ই চামচামি এবং ভুল বুঝিয়ে টার্গেট অনুযায়ী পরীক্ষিত সৈনিককে এ পদে বসিয়েছিলেন ষড়যন্ত্রকারীরা।
অন্যদের ক্ষেত্রেও খুজলে এরকম অনেক ঘটনা পাওয়া যাবে। এতে বিচিত্র কিছু নয়।
আরেকটি ছোট ঘটনা দিয়ে আজকের মত শেষ করব। এতে কিছুটা হলেও অনুমান করা যাবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ গুলোতে কিভাবে নিয়োগ ও পদায়ন হত তখন।
২০০৩ সালে কেবিনেট সচিব পদে নিয়োগ পেলেন আবু সোলায়মান চৌধুরী। তাঁর এ পদে বসার পেছনে মূল তদবীরকারক ছিলেন একজন তহশিলদার।
কেবিনেট সচিব পদটি খালি হওয়ার আগে তহশিলদার সাহেবকে অনুরোধ করলেন একটু তদবীরের জন্য। আবু সোলায়মান চৌধুরী জানতেন প্রধানমন্ত্রীর একজন রাজনৈতিক সচিবের স্ত্রীর সাথে তহশিলদারের খাতির রয়েছে। এক সময় ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ছিলেন আবু সোলায়মান চৌধুরী। তহশিলদার সাহেব ছিলেন গাজিপুরের টঙ্গি এলাকার তহশিলের দায়িত্বে। ওই এলাকায় আবু সোলায়মান চৌধুরী সাহেব নিজের শাশুড়ির নামে একটি খাস জমি বরাদ্দ নিয়েছেন। এই জমি নিতে গিয়ে তহশিলদার সাহেবের সাথে দহরম মহরম হয়।
যদিও জমিটি শাশুড়ির নামে বরাদ্দ চুড়ান্ত হয়ে নাম জারির পরের দিনই তাঁর বউয়ের নামে ট্রান্সফার করা হয়।

তহশিলদার সাহেব তদবীর নিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক উপদেষ্টার স্ত্রীর কাছে। ওই রাজনৈতিক উপদেষ্টারও টঙ্গি এলকায় সহায় সম্পত্তি রয়েছে। তাই জমির দেখা শোনা করতে গিয়ে তহশিলদার সাহেব খায় খাতির জমান ওই নেতার স্ত্রীর সাথে। তদবীর কাজে লেগে যায় এন্টিবায়োটিক ওষুধের মত। তহশিলদার সাহেবের অনুরোধের কথা স্ত্রী একদিন স্বামীকে জানান। স্ত্রী’র সুপারিশ। এটা কি আর ব্যর্থ যায়। আবু সোলায়মান চৌধুরী সাহেব কেবিনেট সচিব হয়ে গেলেন।
বলেন দেখি, তহশিলদারের তদবীরে যদি কেবিনেট সচিব হয়, মঈন ইউ আহমদরা হয়েছিলেন কার

তদবীরে!!! তদবীরে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেলে যা হওয়ার তাই ঘটেছে পরবর্তীতে।
একটা কথা সত্য। দেশপ্রেমিক জনগন যখনই সুযোগ পেয়েছে জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছে। আস্থা রেখেছে জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের ইলেকশনের পর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিল নীরব ভোট বিপ্লব। নীরব ভোট বিপ্লবে মানুষের আস্থা ছিল জাতীয়তাবাদে। এখন তো প্রশ্ন উঠতেই পারে, দুর্ভাগ্যটা কার? দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার, নাকি দেশপ্রেমিক জনতার? আর এসব নিয়ে কি সত্যিই কেউ চিন্তা করেছে কোনদিন?

লেখক : দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত
সম্পাদনা : মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত