শিরোনাম
◈ মুস্তাফিজের ইনজু‌রি স‌ত্বেও ইংল‌্যা‌ন্ডে উড়ি‌য়ে নি‌চ্ছে বার্মিংহাম ফিনিক্স  ◈ চল‌তি বিশ্বকাপে খেলা দ‌ক্ষিণ আ‌ফ্রিকার ফুটবলারের মৃত্যু  ◈ ঢাকায় টানা বর্ষণ, ২৪ ঘণ্টায় ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ড ◈ মারা গেছেন সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন ◈ বেলিংহামের জোড়া গোলে নরওয়েকে হারিয়ে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ◈ হরমুজ সংকট কাটাতে ওমানের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ ◈ চাপ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস ◈ পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলমান: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ◈ চট্টগ্রামে বন্যা ও পাহাড়ধসে ৪৩ জনের মৃত্যু, ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ ◈ বাদশা সালমানের রাজকীয় ফরমান, সৌদির শীর্ষ সরকারি পদে বড় পরিবর্তন

প্রকাশিত : ১২ জুলাই, ২০২৬, ০৯:০৭ সকাল
আপডেট : ১২ জুলাই, ২০২৬, ১০:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চ্যাটজিপিটির মতো এআইকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন বাংলাদেশের হাজারো ফ্রিল্যান্সার

চ্যাটজিপিটি সাধারণ মানুষের কাছে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর প্রায় চার বছর পার হতে চলেছে। বর্তমানে এই প্রযুক্তি ইমেইল লেখা, কোডিং করা কিংবা ভিডিও নির্মাণের মতো ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার নানা জটিল কাজ অবলীলায় করে দিচ্ছে। তবে এআই-এর প্রতিটি নির্ভুল উত্তরের নেপথ্যে কাজ করেন একজন রক্ত-মাংসের মানুষ। এই 'ডেটা অ্যানোটেটর' বা 'এআই ট্রেইনার'রাই মূলত এআই মডেলগুলোকে যাচাই করেন, উত্তরগুলো ক্রমানুসারে সাজান এবং ভুল সংশোধন করে দেন। এই ক্রমবর্ধমান শিল্পে এখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করছেন।

ডেটা অ্যানোটেটরের কাজ আসলে কী?

২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেটায় (ফেসবুকের মাতৃপ্রতিষ্ঠান) ডেটা অ্যানোটেটর হিসেবে কাজ করেছেন তাওসিফ নিলয়। নিজের কাজের ধরন সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমি মূলত নির্দিষ্ট কিছু প্রম্পট বা নির্দেশনার সীমাবদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে ডেটা লেবেলিং করতাম। এআই মডেলগুলো যাতে কোনো ক্ষতিকর বা নীতিবিরুদ্ধ উত্তর না দেয়, সেজন্য বিভিন্নভাবে সেগুলোকে পরীক্ষা করা হতো। এর মধ্যে কোড ইনজেকশন কিংবা ভুল তথ্যের মাধ্যমে এআই-কে বিভ্রান্ত করার মতো পদ্ধতিও ছিল।'

তাওসিফের কাজ ছিল মূলত মডেল টেস্টিং এবং 'রেড-টিমিং' করা। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে এআই-এর সক্ষমতা ও সহনশীলতা যাচাইয়ের জন্য এর বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়।

এই খাতের অন্যান্য সাধারণ কাজের মধ্যে রয়েছে ছবি ও অডিও ট্যাগিং। এর মাধ্যমেই একটি এআই মডেল চিনতে শেখে সে আসলে কী দেখছে বা শুনছে। এছাড়া চ্যাটবটের উত্তরগুলো লিখে রাখা এবং সেগুলোর মান নির্ধারণ করাও এই পেশার নিয়মিত কাজের অংশ।

এভাবেই একটি মডেল শিখতে পারে মানুষ কোন ধরনের উত্তর পছন্দ করে। ক্ষতিকর তথ্যগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে এটি শেখে কোন কথাগুলো বলা যাবে না। হাজার হাজার এমন সংশোধনের মাধ্যমেই এআই আজ মানুষের মতো সাবলীল ভাষায় কথা বলতে পারছে।

বিশাল এক বাজার

এই কাজের বাজার দ্রুত বাড়ছে। 'স্ট্রেটস রিসার্চ'-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ডেটা অ্যানোটেশন টুলের বৈশ্বিক বাজার ছিল প্রায় ২.৩৭ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সাল নাগাদ এটি ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ১৫ কোটি থেকে ৪৩ কোটি মানুষ ছবি লেবেলিং বা কনটেন্ট রিভিউয়ের মতো এআই প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত নানা অনলাইন কাজে যুক্ত।

চাহিদা থাকলেও অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির কারণে এই খাতের কিছু সাধারণ কাজ দিন দিন কমে আসছে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে: অটোমেশনের যুগে বাংলাদেশের এই ফ্রিল্যান্সিং বাজার কি টিকে থাকবে?

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের শক্ত অবস্থানের মূলে রয়েছে এর বিশাল এক ইংরেজি জানা জনগোষ্ঠী, যারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিদেশি ক্লায়েন্টদের কাজ করে দিচ্ছেন। ২০২১ সালে বৈশ্বিক অনলাইন শ্রম বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের দখলে। সরকারের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন, যারা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছেন।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং কম্পিউটার ভিশন ও ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং বিশেষজ্ঞ নাবিল মোহাম্মদ বাংলাদেশের এই এআই প্রশিক্ষণ শিল্পকে বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং) খাতের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তার মতে, 'এআই ডেটার কাজ অনেকটা আগের বিপিও খাতের মতোই—যেখানে কম খরচে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো করা হয়। তবে এআই ডেটা নিয়ে কাজ করতে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন বেশি। যদি আমরা এই অভিজ্ঞতাকে উচ্চমানের আউটপুট তৈরির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারি, তবে এটি স্রেফ আউটসোর্সিংয়ের আরেকটি জোয়ার হয়েই থেকে যাবে।'

তিনি আরও বলেন, 'দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় ও বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে পারলে এই কাজগুলো এআই সাপ্লাই চেইনে প্রবেশের ভালো সুযোগ হতে পারে।'

আয় বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি

সুযোগ থাকলেও মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। ২০২৫ সালে 'টাইম ম্যাগাজিন'-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আমেরিকান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই অ্যানোটেশনের জন্য আউটসোর্সিং ফার্মগুলোকে ঘণ্টায় ১২.৫০ ডলার পর্যন্ত দেয়। কিন্তু কেনিয়ার কর্মীরা পান মাত্র ২ ডলার। এই মজুরি বৈষম্যের শিকার বাংলাদেশের কর্মীরাও। লিংকডইনের চাকরির সার্কুলারগুলোতেও প্রায়ই এমন নিম্ন হারের মজুরি দেখা যায়।

এছাড়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কেনিয়ার একটি আদালত রায় দেয় যে, সে দেশের ১৮৪ জন আউটসোর্সড কনটেন্ট মডারেটরের জন্য মেটা আইনিভাবে দায়ী। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি ১.৬ বিলিয়ন ডলারের মামলার মুখে পড়ে। কোম্পানিগুলো মূলত খরচ কমাতেই এমন নিম্ন মজুরির অঞ্চলগুলো বেছে নেয়।

ডেটা অ্যানোটেশন শিল্পে প্রবেশ করা সহজ হলেও এখানে টিকে থাকার জন্য উচ্চতর দক্ষতার প্রয়োজন। সাধারণ লেবেলিং বা রেটিংয়ের কাজ সহজেই শেখা যায় বলে বাংলাদেশ বড় আকারে এই বাজারে প্রবেশ করতে পেরেছে। তবে এই কর্মীরা সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য হওয়ায় তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা কম, যা মজুরিকেও নিম্নমুখী রাখে।

অন্যদিকে, রেড-টিমিং বা পলিসি মেকিংয়ের মতো উচ্চস্তরের কাজগুলোতে আয় অনেক বেশি এবং এগুলো অটোমেশনের ঝুঁকিমুক্ত। সমস্যা হলো, বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ প্রচেষ্টাগুলোর বড় অংশই এখনও সাধারণ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

নাবিল মোহাম্মদ এই পদ্ধতির মানবিক ও পেশাগত ঝুঁকির বিষয়ে বলেন, 'আমাদের অনেক মেধাবী তরুণ সাধারণ কাজে আটকে আছেন, যা তাদের ক্যারিয়ারের দীর্ঘমেয়াদী উন্নতিতে কাজে আসছে না। সঠিক পরিবেশ পেলে তারা আরও উন্নত মানের কাজ করতে পারত। এআই প্রশিক্ষণ কাজে দিলেও আসল মূল্য আসে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। সব ট্রেনিং প্রোগ্রাম সেই অভিজ্ঞতা দিতে পারে না, ফলে দক্ষতার একটি মিথ্যে ধারণা তৈরি হয়।'

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এআই-এর দ্রুত উন্নতি। এখন যেসব কাজ মানুষ করছে, কয়েক মাস পর এআই নিজেই তা করতে সক্ষম হতে পারে। নাবিল মোহাম্মদের সতর্ক করে বলেন, 'আজ যেসব দক্ষতার চাহিদা আছে, কয়েক মাস পরই তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে যেতে পারে। আমাদের লক্ষ্য যদি আরও উঁচুতে না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের একটি বড় জনগোষ্ঠী বেকার হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।'

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনা

সামষ্টিক অর্থনীতির বাইরে একজন ব্যক্তির জন্য এই কাজ কতটা ফলপ্রসূ? এটি কি দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার হতে পারে, নাকি সাময়িক সমাধান?

তাওসিফ নিলয় মনে করেন, ডেটা অ্যানোটেশন থেকে বড় কোম্পানিতে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ আছে। তিনি বলেন, 'এখান থেকে প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর বা সবচেয়ে লাভজনক পলিসি মেকিং টিমে যাওয়ার সুযোগ থাকে।'

অন্যদিকে ফারদিন জারিফ নামে একজন সাবেক এআই অ্যানোটটর ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, 'আমার কোম্পানি পদোন্নতির প্রতিশ্রুতি দিলেও এক বছরের মধ্যেই তারা কর্মী ছাঁটাই শুরু করে। ফলে উন্নতির কোনো ফল আমরা পাইনি।'

এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এই শিল্প কি সম্ভাবনাময়? বাংলাদেশের একজন ফ্রিল্যান্সারের জন্য স্থানীয় অন্যান্য কাজের তুলনায় এখানে আয় কিছুটা বেশি। যারা নিজেদের দক্ষতাকে উন্নত করতে পারবেন, তাদের জন্য সুযোগ অবশ্যই আছে।

তবে সামগ্রিকভাবে একটি জাতি হিসেবে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে, তা নির্ভর করছে এই ভিত্তির ওপর আমরা কী নির্মাণ করছি তার ওপর। নাবিল মোহাম্মদের মতে, 'এআই যত শক্তিশালী হচ্ছে, মানুষের ইনপুটের প্রয়োজনীয়তা তত বাড়ছে, তবে তা হতে হবে উচ্চমানের। আমরা যদি আমাদের নিজস্ব পণ্য ও সেবার দিকে মনোযোগ দেই, তবেই এই শিল্প টেকসই হবে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা, বিনিয়োগ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যবস্থা।'

তিনি পরামর্শ দেন, আমাদের কেবল এআই 'ভোক্তা' হওয়ার প্রশিক্ষণ নিলে চলবে না, বরং এআই 'সরবরাহকারী' হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর উপযোগী এআই তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব ও গবেষকদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়