শিরোনাম
◈ নতুন পাঁচজনকে নিয়ে মন্ত্রিসভায় রদবদল, কে কোন দায়িত্ব পাচ্ছেন? ◈ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: রয়টার্সকে প্রেস সচিব ◈ ইতালির তৃতীয় বিভাগ ক্লাব রাভেনা এফসির অংশীদার হলেন রোনালদিনহো ◈ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ◈ ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের শপথ আজ: বঙ্গভবনে অতিথিদের ভিড়, জোরদার নিরাপত্তা ◈ ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন কঠিন, ঝুঁকিতে বাংলাদেশি তরুণদের স্বপ্ন ◈ বিমান থেকে সরানো হচ্ছে আফরোজাকে, পাচ্ছেন যে মন্ত্রণালয় ◈ সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে যা বলছে ভারত ◈ রাজস্থানে ককরোচ পার্টির ওপর হামলা, বিজেপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ◈ তারেক রহমানের সফরের প্রস্তুতির খবর দিয়ে আবার প্রত্যাহার করল ভারত

প্রকাশিত : ০২ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫০ দুপুর
আপডেট : ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

দু'মুঠো ভাতের জন্য যেখানে ভোরে মানুষের হাটে মানুষ বিক্রি!

শাহীন খন্দকার: শ্রমিকের হাট বা শ্রমের হাটে মানুষ বেঁচাকেনা এখন নিত্যদিনের অপেক্ষা। প্রাচীন আমলের দাস প্রথা নয়। বেচেঁ থাকতে চাই খাদ্য দিন শেষে মাথাগুজারঠাই। তাই নিম্ন আয়ের মানুষেরা প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের বা মার্কেটের সামনে জড়ো হয়ে থাকেন কাজের সন্ধানে দলগতভাবে। যেখানে নিয়োগকর্তা এসে দামদর পুরিয়ে দৈনিক মজুরী ভিত্তিতে মৌখিক চুক্তিমুল্যে নিয়ে যান এসে। তাইতো বলা হয়ে থাকে শ্রমের হাট বা মানুষ বিক্রির হাট!

এই হাটগুলো বর্তমানে সারাদেশেই বড় বড় বিভাগীয় শহরে চলমান থাকলেও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্পটে চোখে পড়ার মতো। মোহম্মদপুর জাপান সিটি গার্ডেনের সামনে, মীরপুর, রামপুরা বাজারসহ টিভিগেট, বনশ্রী, বসুন্ধরা, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলারমোড় উত্তরা রাজলক্ষী, মেট্টোরেল স্টেশনসহ রাজধানীর সর্বত্রই ভোরবেলায় দেখা যায় এই কামলা বা শ্রমের হাটগুলো। তবে শ্রমিক বা শ্রমের হাট নামেই পরিচিত।

ভোরবেলায় চন্দ্রিমা উদ্যানে হাটতে গিয়ে মোহম্মদপুর জাপান সিটিগার্ডেন ও সিয়া মসজিদ’র সামনে দেখা হয় কাজের সন্ধানে শ্রমজীবি নারী ও পুরুষদের কেউ কলা-রুটি খাচ্ছে কেউবা পান খাচ্ছেন কেউবা ধুমপান করছেন, একজন আরেকজনের কাছে থেকে। পশেই পড়ে আছে দাও-কোদাল হাইশা, টুকরি বা পাইচা। 

মানুষের জটলা দেখে কৌতুল হলো, কাছে গিয়ে কথা বললে  কাজের সন্ধানে অপেক্ষামান মানুষেরা প্রতিদিন ভিড় জমান  এখানে এবং তারা জানালেন, ‘মানুষ বেচাঁকেনার হাট’ এখানে কাজের সন্ধানে শ্রমজীবিদের সাথে কথা বললে তারা জানালেন, দু:খ বেদনার পথচলাতে এই পথের বাঁকে দাড়িঁয়েছেন তারা দু’মুঠো ভাত আর মাথাগুজার নিশ্চয়তাই।

কথা বলে জানাগেছে, শ্রমজীবিদের মধ্যেও রয়েছে সরর্দার আব্দুল মাখন পেশায় একজন নির্মাণ শ্রমিক, তিনি জানালেন, জাপান সিটি গার্ডেন ও সিয়ামসজিদের সামনে প্রতিদিন প্রায় ২০০ নারী-পুরুষ শ্রমিক ভোরের আলো ফুটতেই আমরা চলে আসি কাজের সন্ধানে। যখন মাখন সরর্দারের সঙ্গে কথা বলছিলাম পিছন থেকে (৪০) অর্ধবয়সী এক নারী  আয়শা বেগম বললেন, ঘর ছিলো বাড়ী ছিলো সোমেশ্বরী নদী কেড়ে নিয়েছে, এখন নি:শ্ব রাস্তায় কাজের সন্ধ্যানে দু’মুঠো ভাত আর মাসের শেষে বস্তিঘরের ভাড়া ৬০০০ টাকা জুটাতে প্রতিদিন চিড়ামুড়ি খেয়ে চলে যায়! বললাম কি কাম করেন আপনি? এর মধ্যেই পিছন থেকে এক ভদ্রলোক বলছেন, কামে যাইবা? মুখ ঘুরিয়ে তিনি বললেন, কি কাম? উত্তর এলো, বিল্ডিংয়ের কাজ। পাল্টা প্রশ্ন কয়তলায় কাম করতে অইবো? ভদ্রলোক বললেন ৫তলা ভবণে। তিনি আরও বললেন, নির্মাণাধীন ভবণের বাইরের অংশে বাশঁদিয়ে বানানো মাচার ওপর দাড়িঁয়ে রংয়ের কাজ করতে হবে।

ভদ্রমহিলা বললেন, ছেলে মেয়ের খাদ্যের জন্য বাহির হইয়ছি বাশেঁর মাচা ভাইঙ্গা গেলেই ওপারে! তিনি জানিয়ে দিলেন, এই বয়সে ঐ কাজ পারুম না। ঠিকাদার রাশেদ শহীদ বলেন, নির্মাণ শ্রমিক বলতে এক কথায় যিনি নির্মিত ভবণের অবকাঠামো পরিবেশ নির্মাণকাজ সর্ম্পকে যার রয়েছে জ্ঞান অভিজ্ঞতা তিনিই হচ্ছেন নির্মাণ শ্রমিক, নির্মান কাজে নিযুক্ত থাকেন। যদিও সাধারণত নির্মাণকাজের শারীরিক শ্রমে জড়িত ব্যক্তিদেরই বলা হয় নির্মাণ শ্রমিক।

তিনি আরও বলেন, নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপদ কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে যেমন পাওয়ার টুল (যেমন ড্রিল) ব্যবহার করার সময় যাতে অতিরিক্ত ধুলো বা শব্ধ না হয়। উদাহারুণ স্বরূপ বললেন, পার্শ^বর্তী দেশ ভারতে বিল্ডিং এবং অন্যান্য নির্মাণ শ্রমিক আইন ১৯৯৬ বিল্ডিং এবং অন্যান্য নির্মাণ শ্রমিকদের নিয়োগ এবং চাকুরীর শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণ করে এবং সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসহ কল্যাণমুলক ব্যবস্থার বিধান রয়েছে। ধানমন্ডি সোবহানবাগ বাড়ীর মালিক ফিরোজ তালুকদার বলেন, নির্মাণ শ্রমিকদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই গড়ে উঠে আমাদেও নিরাপদ আশ্রয়। প্রখর রোদ, ঝড়বৃষ্টি, কোনো কিছুই থামাতে পারেনা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই গড়ে উঠে আমাদের নিরাপদ আশ্রয়।তাই তাঁেদর নিরাপত্ত্বা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রসহ আমাদেও সবার দায়িত্ব বলে জানালেন।

নির্মাণ শ্রমিক শওকত আলী বাড়ী শেরপুর নালিতাবাড়ী তিনি বর্তমান সরকারের নিকট উদারত্ব আহব¦ান জানিয়ে বলেছেন, পথেপ্রান্তে কাজের সন্ধানে বসে থাকা নির্মান শ্রমিকদের জন্য মুজুরী নির্ধারণ করে দেওয়ার জন্য। কারন সর্ম্পকে তিনি বলেন, হয় খাদ্যদ্রব্যের দাম কমিয়ে দিন দ্বিতীয়তো সরকারীভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করে দিন।

তিনি আরও বলেন, রাজধানীসহ দেশজুড়ে গড়ে উঠছে বিপুলসংখ্যক ভবণ।এসব ভবণ নির্মাণে শ্রমিকদের দূর্ঘটনা এড়াতে মালিকপক্ষসহ সরকারী প্রতিষ্ঠানের কতৃপক্ষের পক্ষথেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি শ্রমিকদের জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়না। শ্রমিকরা আরো বলছেন, এই যে সেপটিক ট্যাংকে কাজ করার সময়ে তার নিরাপত্ত্বার জন্য যা করনীয় মালিক পক্ষ না করার কারনে প্রায়ই কাজ করতে গিয়ে শ্রমিক মারা যাচ্ছে! সরকারী পর্যায়ে তদন্ত হলে দূর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বন্ধ হবে।জীবনের ঝুঁকি নিয়ে  কাজ করা নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্ত্বা উপক্ষেতি হয় বলেই বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা।

বাংলাদেশ ইনষ্টিটিউট অব লেবার স্টাাডিজের (বিলস’র) পরিসংখ্যানে পাওয়া এক তথ্যে জানাগেছে নিরাপত্ত্বার অভাবে গত কয়েক বছরে এই খাতে শ্রমিক নিহত হয়েছেন প্রায় ২হাজার ১০২জন শ্রমিক, এছাড়া পরিবহন, নির্মাণ, কৃর্ষি এই তিনখাতে নিহত হয়েছেন, একহাজার ৫৩জন ।

গত পাঁচ বছরে নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যুর হিসাব বলছে, ২০২২ সালে ১১৮ জন শ্রমিক নিহত হয়, ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৫৪, এর আগের বছর ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে এ সেক্টরে নিহতের সংখ্যা ৮৪ জন। ২০১৯ সালে মারা যান ১৩৪ এবং ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ১৬১ জন। এদিকে ২০১৪ সালের ‘ জাতীয় ভবণ নির্মাণ বিধিমালা’ অনুযায়ী কাজের সময় শ্রমিকের মাথায় হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়।

যেসব কংক্রিট কাজে যুক্ত থাকবেন তাদের কাজের সময় গ্লাভস ও চোখে চশমা পড়তে হবে। ওয়েল্ডার ও গ্যাসকাটার সময়ে গ্লাভস, নিরাপত্ত্বাবুট, অ্যাপ্রন ব্যবহার করতে হবে, সেই সঙ্গে ভবণের ওপরে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্ত্বায় বেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামুলক করা হলেও বাস্তবে কোনটিই দেখা যায়না!

এক কথায় নির্মাণ শ্রমিকদের জীবন অত্যন্ত কায়িক পরিশ্রমের, অনিশ্চয়তা এবং জীবনের নিরপত্ত্বা উ”্চ ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-রেজিষ্টার চিকিৎসক ডা. মীর্জা নাহিদা হোসেন বলেন, শ্রমবাজারে পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকরা সর্বাধীক শ্রম দিয়েও পুরুষের সমপরিমান পারিশ্রমিক পাচ্ছেননা! তিনি বলেন বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যয় বাংলাদেশের নারীরা পুরুয়ের পাশাপাশি সমান তালে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃর্ষি, অর্থনীতি, রাজনীতি সর্বত্র নারীর পদচারণ রয়েছে।

কিন্তু দু:খজনক হলেও নারীর সম-অধিকার আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইটভাটা, পোশাক শিল্প, কৃষিকাজ, গৃহশ্রম, নির্মাণ কাজ, চাতালে ও স’মিলে কাজসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো কাজেই নারীরা পুরুষের সমান মজুরি পান না।নারী রোদে পুড়ে-বৃষ্টিতে সকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেও বেতন-মুজুরী বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে শত চেষ্টার পরেও নারীরা বের হতে পারেন নাই!

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়