স্পোর্টস ডেস্ক: কেনো এমন হলো। যে বাংলাদেশ ডারউইনে দুর্দান্ত এক টেস্ট জয়ের পর আকাশে উড়েছিলো তারা কেনো ম্যাকাই টেস্টে বিধস্ত হলো। ৫ দিনের খেলায় ২দিনও টিকলো না লাল সবুজের দল। তবে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনা স্টেডিয়ামের টেস্ট অভিষেক যাত্রায় বাংলাদেশের নামটা লেখা থাকলো অন্যভাবে।
প্রথম ইনিংসে ৬৪ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৫ রানে অলআউট হয়ে টাইগাররা ম্যাচ হারলো ইনিংস ও ৫১ রানে। দুইদিনে ম্যাচ হেরে বিব্রতকর রেকর্ডেও নাম লেখালো টাইগাররা। এই প্রথম কোন ইনিংসে ১০০ করতে না পারার লজ্জা সঙ্গী হল বাংলাদেশের।
মাত্র ২১০ রান করেই ইনিংস ব্যবধানে জয়—টেস্ট ক্রিকেটে এমন ঘটনা বিরল। অস্ট্রেলিয়ার এই জয়টি সেই বিরল তালিকায় তৃতীয়। নিজেদের মাটিতে এর চেয়ে কম রান করে ইনিংস জয়ের ঘটনা আছে মাত্র একটি। ম্যাচের স্থায়িত্বের হিসাবেও এটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দ্বিতীয় সংক্ষিপ্ততম এবং সব মিলিয়ে চতুর্থ সংক্ষিপ্ততম টেস্ট। -- ডেইলি ক্রিকেট
এই জয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় নাম মিচেল স্টার্ক। বাংলাদেশের দুই ইনিংস মিলিয়ে ১০ উইকেট নিয়ে ম্যাচটাকে কার্যত একাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন বাঁহাতি পেসার। প্রথম ইনিংসে ১২ রানে ৬ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসেও তার দাপট অব্যাহত ছিল। এবার ৩৯ রান খরচ করে নেন আরও ৪ উইকেট।
স্টার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের শেষ ইনিংসটি দ্রুত গুটিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্যাট কামিন্স ও ন্যাথান লায়ন। দুজনেই পান ৩টি করে উইকেট।
বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ব্যক্তিগতভাবে লড়াইয়ের চেষ্টা ছিল শান্ত ও মুশফিকের ব্যাটে। ৪৬ বলে ৩১ রান করে দলের সর্বোচ্চ স্কোরার অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। অন্য প্রান্তে ২৯ রানে অপরাজিত থাকেন মুশফিকুর রহিম। কিন্তু নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোয় তার প্রতিরোধও দলকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসও অবশ্য খুব বড় হয়নি। আগের দিনের ৮ উইকেটে ১৬৫ রান থেকে স্কোরটা শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় ২১০-এ। সেই ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটারদের চাপে রাখার পুরো কৃতিত্ব শরিফুল ইসলামের। ৪৮ রানে ৭ উইকেট নিয়ে দুর্দান্ত এক স্পেল উপহার দেন বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার। কিন্তু শরিফুলের সেই বোলিংয়ের পরও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি বাংলাদেশ।
১৪৬ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে নামার পর শুরু থেকেই স্টার্কের সামনে দিশেহারা হয়ে পড়ে বাংলাদেশের টপ অর্ডার। তৃতীয় ওভারেই সাদমান ইসলামকে ফিরিয়ে শুরু করেন তিনি। প্রথম ইনিংনের মতো এবারও ফ্লিক করতে গিয়ে টপ এজে ক্যাচ দিয়ে স্টার্কের শিকার হন বাঁহাতি ওপেনার।
এরপর যা হলো, সেটি বাংলাদেশের বিপর্যয়কে আরও তীব্র করে। পরের বলেই মুমিনুল হককে বোল্ড করেন স্টার্ক। ভেতরে ঢুকে আসা বলটি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মুমিনুল। বল ব্যাটের কোনো সংস্পর্শ ছাড়াই গিয়ে আঘাত করে স্টাম্পে। টানা দুই বলে দুই উইকেট।
তানজিদ হাসান তামিম কিছুক্ষণ পর আউট হয়ে বাড়ান অস্বস্তি। প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি করা এই ওপেনার কামিন্সের বাউন্সারে ফাইন লেগে ক্যাচ দেন। ডারউইনে একই ধরনের ভুল শট খেলে জীবন পেয়েও পরে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। এবার আর সেই সৌভাগ্য সঙ্গে ছিল না।
৩ উইকেট হারানোর পর শান্ত কিছুটা প্রতিরোধের আভাস দেন। প্রথম সেশনে কয়েকটি চমৎকার শটে তিনি বোঝান, বাংলাদেশ অন্তত লড়াইটা দীর্ঘ করতে পারে। কিন্তু লাঞ্চের পর পরিস্থিতি দ্রুত কঠিন হয়ে ওঠে। কামিন্স ও লায়নের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে শান্ত-মুশফিকের রান তোলার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
চাপের মধ্যেই ভুল করেন শান্ত। শুরুতে যেভাবে রান তুলছিলেন, পরে সেটি থেমে যাওয়ায় লায়নের বলে ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলেন তিনি। মিড অফের ওপর দিয়ে বল উড়িয়ে দিতে গিয়ে ক্যাচ। ৪৬ বলে ৩১ রানে থামেন অধিনায়ক। তার বিদায়ের সময় বাংলাদেশের স্কোর ৫১ রানে ৪ উইকেট।
এরপর লিটন দাসের কাছ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেটি পূরণ হয়নি। চোট কাটিয়ে দলে ফিরলেও অস্ট্রেলিয়া সফরে এখনও ব্যাট হাতে রান করতে পারেননি তিনি। স্টার্কের বিপক্ষে সিরিজে টানা তৃতীয়বারের মতো আউট হলেন লিটন। ১০ বল খেলে রানের খাতা খোলার আগেই স্লিপে ক্যাচ দেন।
মেহেদী হাসান মিরাজও এবার ব্যাট হাতে প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানিয়ে তাকে ফেরান অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক।
ডারউইনে ব্যাট হাতে কার্যকর ইনিংস খেলা হাসান মাহমুদও এবার দ্রুতই ফিরে যান। কামিন্সের শর্ট বলের ফাঁদে পড়ে তার ইনিংস শেষ হয়। এরপর তাইজুল ইসলামকে বোল্ড করে নিজের ১০ উইকেট পূর্ণ করেন স্টার্ক।
বাংলাদেশ তখন ৮২ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ইনিংস পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। একই সঙ্গে সামনে দাঁড়িয়ে ছিল টেস্টের দুই ইনিংসেই ১০০ রানের নিচে অলআউট হওয়ার বিব্রতকর রেকর্ড। মুশফিক তখনও লড়ে যাচ্ছিলেন। যতক্ষণ সম্ভব ক্রিজে থেকে ম্যাচের শেষটা পিছিয়ে দেওয়াই যেন তার একমাত্র লক্ষ্য।
কিন্তু চা-বিরতির পর আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি অস্ট্রেলিয়াকে। ফিরে এসেই তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলামকে ফিরিয়ে দেন লায়ন। ৯৫ রানে থামে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। ম্যাচ শেষ হয় ইনিংস ও ৫১ রানের ব্যবধানে।
ডারউইনে বাংলাদেশের দারুণ পারফরম্যান্সের পর ম্যাকাইয়ে অস্ট্রেলিয়া দেখাল সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। প্রথম টেস্টের হার থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশকে কোনো সুযোগই দেয়নি স্বাগতিকরা। শেষ পর্যন্ত ১-১ সমতায় শেষ হলো দুই ম্যাচের সিরিজটি।