ম্যাচ শুরুর আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল—বিশ্বকাপের মঞ্চে বিদায়টা কার হবে? ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো নাকি লুকা মদরিচ? ফুটবলের দুই কিংবদন্তির একজনের বিশ্বকাপ অধ্যায়ের ইতি টানার সম্ভাবনা ছিল টরন্টোর শেষ ষোলোর এই ম্যাচেই।
৯০ মিনিটের বেশি সময় ধরে সেই প্রশ্নের উত্তর বারবার বদলেছে। কখনো মনে হয়েছে রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ শেষ হতে যাচ্ছে, আবার কখনো মনে হয়েছে মদরিচের স্বপ্নই থেমে যাবে। শেষ পর্যন্ত হাসিটা হেসেছেন রোনালদো। আর বিদায়ের বেদনা সঙ্গী হয়েছে মদরিচের। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে গনসালো রামোসের দুর্দান্ত এক হেডে ক্রোয়েশিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিয়েছে পর্তুগাল।
শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল পর্তুগালের হাতে। প্রথমার্ধে ৫৯ শতাংশ বলের দখল রেখে একের পর এক আক্রমণ চালায় রবার্তো মার্তিনেসের দল। রোনালদো, ব্রুনো ফার্নান্দেস, রাফায়েল লেয়াও ও জোয়াও কানসেলো বারবার ক্রোয়েশিয়ার রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করলেও ডমিনিক লিভাকোভিচকে পরাস্ত করতে পারেননি। লুকা মদরিচের দল অপেক্ষা করেছে পাল্টা আক্রমণের সুযোগে।
বিরতির পরই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৫৩ মিনিটে জোসিপ স্তানিসিচের তৈরি করা আক্রমণ থেকে ইভান পেরিসিচ জোরালো শটে গোল করে ক্রোয়েশিয়াকে এগিয়ে দেন। মুহূর্তেই চাপে পড়ে যায় পর্তুগাল।
তবে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। ৫৮ মিনিটে রাফায়েল লেয়াওয়ের দুর্দান্ত শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। তিন মিনিট পর রোনালদো বল জালে পাঠালেও খুব সামান্য ব্যবধানে অফসাইড হওয়ায় গোলটি বাতিল হয়।
শেষ পর্যন্ত ৬৪ মিনিটে কর্নার থেকে রেনাতো ভেইগাকে নিকোলা ভ্লাসিচ জড়িয়ে ধরলে ভিএআরের সহায়তায় পেনাল্টি দেন রেফারি। ৬৮ মিনিটে স্পট কিক থেকে ঠান্ডা মাথায় গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান রোনালদো। নকআউটে বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটিই তাঁর প্রথম গোল।
এরপর দুই দলই জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। পেতার সুচিচ একবার বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। ৮১ মিনিটে রোনালদোকে তুলে রুবেন নেভেসকে নামান মার্তিনেস। মাঠ ছাড়ার সময় অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এটাই কি বিশ্বকাপে রোনালদোর শেষ স্পর্শ?
কিন্তু পর্তুগালের গল্পে তখনো শেষ অধ্যায় লেখা বাকি। দ্বিতীয়ার্ধে ১০ মিনিট অতিরিক্ত সময় যোগ করেন রেফারি। যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে রাফায়েল লেয়াও বক্সে ভাসিয়ে দেন অসাধারণ এক ক্রস। ইয়োস্কো ভার্দিওল ও পংরাচিচকে টপকে লাফিয়ে ওঠেন গনসালো রামোস। তাঁর হেড পোস্ট ঘেঁষে জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পর্তুগিজ ডাগআউট। বেঞ্চে থাকা রোনালদোও ছুটে এসে সতীর্থদের সঙ্গে উদ্যাপনে যোগ দেন।
তবে সেখানেই নাটকের শেষ হয়নি। রামোসের গোল, উদ্যাপন ও বদলির কারণে যোগ করা সময় আরও বাড়তে থাকে। শেষ দিকে ইয়োস্কো ভার্দিওল গোল করলেও পাশালিচ অফসাইডে থাকার কারণে রেফারিকে বাতিল করতে হয় সেই গোল। তাই ১০ মিনিট গড়ায় প্রায় ১৯ মিনিট পর্যন্ত। ৪০ বছর বয়সী মদরিচ শেষ পর্যন্ত মাঠে থেকে দলকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু পর্তুগালের রক্ষণ আর ভাঙতে পারেননি তিনি।
শেষ বাঁশি বাজার পর ফুটবলের দুই তারকার এক আবেগঘন মুহূর্ত ধরা পড়ে। রোনালদো এগিয়ে গিয়ে আলিঙ্গন করেন সাবেক সতীর্থ ও বন্ধু মদরিচকে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই কিংবদন্তির মিলিত অভিজ্ঞতা অর্ধশতাব্দীরও বেশি।
এরপরই শুরু হয় পর্তুগালের উৎসব। তবে তা ক্ষণিকের জন্য; শেষ ষোলোয় তাদের প্রতিপক্ষ যে দারুণ ফর্মে থাকা স্পেন।