শিরোনাম
◈ গ্যাস সংকট, অর্ডার কমে যাওয়া ও লোকসানে শিল্পনগরী গাজীপুরে একের পর এক কারখানা বন্ধ, অনিশ্চয়তায় শ্রমিকদের জীবন ◈ বিশ্বকা‌পে আন‌ন্দের মা‌ঝে বেদনার সুর, শাস্তির মু‌খে মেক্সিকো  ◈ চীনের অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হতে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ কোথায় ◈ হরমুজ প্রণালী বি‌দে‌শি‌দের খেলার মাঠ নয়,যুক্তরা‌স্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি ইরান সামরিক সদরদপ্তরের ◈ ডেঙ্গুর থাবায় চট্টগ্রাম, চার গুণ বেড়েছে রোগী ◈ সবুজ জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ টানতে নতুন কৌশল নিচ্ছে সরকার ◈ খামেনির শেষ বিদায়: তেহরানে জড়ো হচ্ছেন লাখো মানুষ, কফিন পৌঁছাল হত্যাস্থলে ◈ বাংলাদেশের আগে ভারত টেস্ট সি‌রিজ খেল‌তে শ্রীলঙ্কায় যা‌বে ◈ পদ-পদবী নেই, তবুও মদন হা‌জির ক্রিকেট দল নির্বাচনী বৈঠকে  ◈ বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ২.২ লাখ টন গম কিনছে সরকার

প্রকাশিত : ০৩ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫৮ দুপুর
আপডেট : ০৩ জুলাই, ২০২৬, ১২:০৬ দুপুর

প্রতিবেদক : এল আর বাদল

চীনের অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হতে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ কোথায়

এল আর বাদল: এবার চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব সামনে এনেছে বেইজিং। কিন্তু এই প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীন, দুই দেশের জন্যই মিয়ানমার কেন্দ্রিক ও ভূ-রাজনীতির অনেক চ্যালেঞ্জ দেখছেন কূটনীতি বিশ্লেষকদের অনেকে।

প্রস্তাবটি এসেছে চীনের শীর্ষ নেতার কাছ থেকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২২শে জুন থেকে যখন তিন দিনের সফরে চীনে ছিলেন, তখন তার সঙ্গে বৈঠকে অর্থনৈতিক করিডোরের ওই প্রস্তাব দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। যদিও বাংলাদেশ করিডোরের প্রস্তাবের ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। কিন্তু বাংলাদেশও চীনের সঙ্গে অর্থনীতির ব্যাপ্তি ও যোগাযোগ বাড়াতে চায়। -------- বি‌বি‌সি বাংলা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, সরকার প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে দেখছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন আরেকটি সূত্র বিবিসিকে বলেছে, বাংলাদেশ সরকার চীনের প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

তবে আলোচনায় আসছে ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জের প্রশ্ন। কূটনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, ভারতের অবস্থান সেখানে একটি বড় বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে, সেটাও বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশকে এগোতে হবে। বাংলাদেশে তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর ব্যবস্থাপনা প্রকল্পেও সহায়তা করতে চেয়েছে চীন।

দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিখাতের স্বার্থে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও যেকোনো মূল্যে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। এ ক্ষেত্রেও রয়েছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জ।

চীনের প্রস্তাবগুলোকে অবশ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে দেশের কূটনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দুই দেশের পক্ষ থেকেই 'দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত' সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দেশ দুটির মধ্যে রাজনৈতিক শীর্ষ পর্যায়ে একটা বোঝাপড়া হয়েছে এবং এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলছেন, এখন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ সামলানোর বিষয়টি নির্ভর করবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও দূরদর্শিতার ওপর।

অর্থনৈতিক করিডোরের সম্ভাব্য রুট কী

চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হবে এই করিডোর। সেটি যাবে মিয়ানমারের মান্দালয়ে। সেখান থেকে করিডোরের একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গন এবং অন্য অংশ বিস্তৃত হবে রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে সংযোগটি সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হবে।

চীনের পক্ষ থেকে এমন সম্ভাব্য রুটের প্রস্তাব রয়েছে বলে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট সরকারি একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের রুট হিসেবে চীনের করিডোর তৈরির প্রস্তাব এর আগেও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে।

'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ', চীনের এই প্রকল্প বিসিআইএম নামে পরিচিত। বাংলাদেশ-চীন-ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব একযুগেরও বেশি সময় আগে ২০১৩ সালে সামনে এনেছিল বেইজিং।

কিন্তু ভারতের আপত্তির কারণে তখন তা এগোয়নি। পরে ভারতকে বাদ দিয়েই চীন মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির পরিকল্পনা করে, তাতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়টি আসে। এখন চীন সম্ভাব্য সেই প্রস্তাব বাংলাদেশকে দিয়েছে বলে জানা গেছে।

ভেতরের চ্যালেঞ্জ

ভেতরে-বাইরের ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা বলছেন কূটনীতি বিশ্লেষকরা। ভেতরের চ্যালেঞ্জ বলতে তারা বোঝাচ্ছেন মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকটকে।মিয়ানমারের জান্তা সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত চলছে 'বিদ্রোহী' আরাকান আর্মির। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাখাইনের বড় অংশ রয়েছে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

অন্যদিকে রয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যা। মিয়ানমারে নির্যাতনের কারণে সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এই দুটি সংকটের সমাধান না হলে করিডোরে বাংলাদেশকে যুক্ত করা কতটা কার্যকর ও নিরাপদ হবে, সেই প্রশ্ন উঠছে।

তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, সংকট সামলিয়ে করিডোর কার্যকর করার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ।  মি. কবির বলেন, মিয়ানমারে চলমান সংকট ও রোহিঙ্গা ইস্যু থাকার পরও চীন যদি কার্যকর উদ্যোগ নেয় এবং বাংলাদেশ ইতিবাচক সাড়া দেয়, তাহলে অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়ন সম্ভব।

অর্থনৈতিক করিডোর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য পরিবর্তনের বিরাট সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে পারবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হতে পারবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের জোট আসিয়ানের সঙ্গে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে" বলেন হুমায়ুন কবির।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, এই করিডোর কার্যকর হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় চীনের বিনিয়োগ বেড়ে যাবে। চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে। পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়, দুটোই উল্লেখযোগ্যহারে কমে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলন করে সেই সফরের বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "অর্থনৈতিক করিডোরের উদ্দেশ্য হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্টেশনকে আরও সমৃদ্ধ করা। সেই সফরের আলোচনা নিয়ে যে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে এবং চীনের প্রেসিডেন্টের বক্তব্য যা এসেছে, তাতে অর্থনৈতিক করিডোর এগিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ও চীন, দুই দেশই এ ব্যাপারে আগ্রহী। তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যগুলো সমালিয়ে কিভাবে তা এগিয়ে নেওয়া যাবে, সেই আলোচনা যেমন আছে, একইসঙ্গে আসছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির চ্যালেঞ্জের প্রশ্ন।

ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ কতটা

এক যুগেরও বেশি সময় আগে যখন ভারতসহ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব করেছিল চীন, তখন ভারতের আপত্তির কারণে সেই উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়েছিল।

কারণ এই অঞ্চলে প্রভাব নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের যে দ্বন্দ্ব এবং এর জেরে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে তাদের যে সমীকরণ, তাতে এ ধরনের কোনো করিডোরে ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।

এখন ভারতকে বাদ দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোরে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে চাইছে চীন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ ভারতের আগের অবস্থানের পরিবর্তন হতে পারে, এ নিয়ে বিশ্লেষকদের অনেকের সন্দেহ রয়েছে। তারা বলছেন, ঢাকা যদি চীনের প্রস্তাবিত করিডোরে যুক্ত হয়, এতে দক্ষিণ-পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হবে। এটি ভারতের জন্য চাপ তৈরি করবে এবং তাদের প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।

তবে ভিন্ন পর্যবেক্ষণ রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের। তিনি মনে করেন, ভারত নিজেরাই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে এবং তা অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমানও হচ্ছে।

আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জের বাইরে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বিষয়ও রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি সাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির শর্তগুলো বাংলাদেশকে বিবেচনায় রেখে এগোতে হবে।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির শর্তগুলোর মধ্যে যে বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা বা বিতর্ক হয়েছে, তা হলো, চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তিতে যেতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। বিশ্লেষকদের অনেকের ধারণা, চীন-রাশিয়াকে লক্ষ্য করে ওই শর্ত আনা হয়ে থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, অর্থনৈতিক করিডোরে বাংলাদেশ যুক্ত হলে দেশটির ব্যবসা-বাণিজ্যে চীনের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। এমন তৈরি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের এবং সে ধরনের ধারণা থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

তবে হুমায়ুন কবির মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা পরাশক্তির রাজনৈতিক সমীকরণও সামলানো সম্ভব। সেখানে বাংলাদেশ কিভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবে, তাও নির্ভর করবে কূটনীতি ও দূরদর্শিতার ওপর।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়