শিরোনাম
◈ গ্যাস সংকট, অর্ডার কমে যাওয়া ও লোকসানে শিল্পনগরী গাজীপুরে একের পর এক কারখানা বন্ধ, অনিশ্চয়তায় শ্রমিকদের জীবন ◈ বিশ্বকা‌পে আন‌ন্দের মা‌ঝে বেদনার সুর, শাস্তির মু‌খে মেক্সিকো  ◈ চীনের অর্থনৈতিক করিডোরে যুক্ত হতে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ কোথায় ◈ হরমুজ প্রণালী বি‌দে‌শি‌দের খেলার মাঠ নয়,যুক্তরা‌স্ট্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি ইরান সামরিক সদরদপ্তরের ◈ ডেঙ্গুর থাবায় চট্টগ্রাম, চার গুণ বেড়েছে রোগী ◈ সবুজ জ্বালানিতে বড় বিনিয়োগ টানতে নতুন কৌশল নিচ্ছে সরকার ◈ খামেনির শেষ বিদায়: তেহরানে জড়ো হচ্ছেন লাখো মানুষ, কফিন পৌঁছাল হত্যাস্থলে ◈ বাংলাদেশের আগে ভারত টেস্ট সি‌রিজ খেল‌তে শ্রীলঙ্কায় যা‌বে ◈ পদ-পদবী নেই, তবুও মদন হা‌জির ক্রিকেট দল নির্বাচনী বৈঠকে  ◈ বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ২.২ লাখ টন গম কিনছে সরকার

প্রকাশিত : ০৩ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৭ দুপুর
আপডেট : ০৩ জুলাই, ২০২৬, ১২:০৬ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ডেঙ্গুর থাবায় চট্টগ্রাম, চার গুণ বেড়েছে রোগী

চট্টগ্রামে শিশুদের হামের প্রকোপের মধ্যেই বর্ষা মৌসুমে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু। স্বাস্থ্য অধিদফতরের জরিপ অনুযায়ী, নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর হটস্পট (উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলায় এখন পর্যন্ত ৩১৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ অবস্থায় সিটি করপোরেশন ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে কী করছে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষা শুরু হতেই ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে পড়েছে বন্দরনগরী। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ১৭৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও গত জুন মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১২২ জন। চলতি মাসের প্রথম দুই দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ১৯ জন।

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। নগরীর প্রতি চারটি বাড়ির মধ্যে প্রায় একটিতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে নগরের আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ডেঙ্গুর অশনিসংকেত 

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গত দুই মাসে আক্রান্তদের চিত্র দেখলে বোঝা যায়, ডেঙ্গু অশনিসংকেত দিচ্ছে। সিটি করপোরেশনকে এখন থেকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যথায় বর্ষার মাঝামাঝি সময়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। তখন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। 

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের গত দুই দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৯ জন। আর চলতি বছরের ২ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে ৩১৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২ জন আক্রান্তসহ একজনের মৃত্যু হয়েছে। মার্চে ২০ জন, এপ্রিলে ২৯ জন, মে মাসে ৩৭ জন, জুনে ১২২ জন এবং চলতি মাসের দুই দিনে ১৯ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হিসাবে চলতি বছরের বিগত মাসগুলোর তুলনায় জুনে চার গুণ রোগী বেড়ে গেছে। আক্রান্তরা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

অতীতের রেকর্ড কী বলছে

এ ছাড়াও ডেঙ্গুতে ২০২১ সালে ২৭১ জন আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মারা গেছেন পাঁচ জন। ২০২২ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন পাঁচ হাজার ৪৪৫ জন; ওই বছর মারা যান ৪১ জন। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। ওই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১৪ হাজার ৮৭ জন; প্রাণ হারান ১০৭ জন। এটি ছিল চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বছরগুলোর একটি। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে চার হাজার ৩২৩ জনে নেমে এলেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৫। ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন চার হাজার ৮৬৪ জন, ওই বছর ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

বেড়েছে এডিসের লার্ভা

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে, অর্থাৎ ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। জরিপ চলাকালে ১১৪টি পজিটিভ কনটেইনারও শনাক্ত করা হয়, যেখানে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিচ্ছিল।

জরিপে আরও বলা হয়, নগরীর প্রতিটি জরিপকৃত ওয়ার্ডেই এডিস মশার উপস্থিতি রয়েছে। তবে উত্তর কাট্টলী (ওয়ার্ড-১০), পাহাড়তলী (ওয়ার্ড-৩), আলকরণ (ওয়ার্ড-২), পশ্চিম বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৭), দক্ষিণ বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৯), দক্ষিণ বালুচরা (ওয়ার্ড-৩৯), পাথরঘাটা (ওয়ার্ড-৩৪) এবং আন্দরকিল্লা (ওয়ার্ড-৩২)-এই আটটি ওয়ার্ডকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শনাক্ত হওয়া এডিস মশার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপটাই প্রজাতির, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এডিস এলবোপিকটাস, যা ডেঙ্গুর দ্বিতীয় প্রধান বাহক হিসেবে পরিচিত।

কতটা প্রস্তুত স্বাস্থ্য বিভাগ

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘গত জুন মাসে নগরে মশা নিয়ে করা জরিপের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জরিপের ফলাফল সিটি করপোরেশনের কাছে পাঠানো হয়েছে। কারণ ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে মশা নিধন করতে হবে। মশা নিধনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।’

তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু চিকিৎসার জন্য হাসপাতালগুলোকে আগাম প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত পর্যাপ্ত স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করার জন্য বলা হয়েছে।’

সবাইকে সতর্ক হতে বললেন বিআইটিআইডির অধ্যাপক

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজের (বিআইটিআইডি) অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীও বাড়ছে। তবে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া থেকে বাঁচতে আগেই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। মশার কামড় থেকে দূরে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবই করতে হবে। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার করতে হবে। নগরে যেখানে গাড়ি পরিষ্কার করে সেখানে পরিষ্কার রাখতে হবে। যাতে ওই স্থানে পানি না জমে। জ্বর, ব্যথা কিংবা শরীরে কোনও ধরনের রেশ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।’

কী করছে সিটি করপোরেশন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ সময়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমে এসেছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা প্রচলিত বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে গত ছয় মাস ধরে পরিবেশবান্ধব আমেরিকান প্রযুক্তির বিটিআই ব্যবহার করছি। এর ফলে মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য এসেছে। মশক নিধন কাজের মান বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে সাত জন পরিদর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ব্যাপকভাবে সকাল বেলায় মশা নিধনকারী লার্ভিসাইড এবং বিকালে এডাল্টিসাইড প্রয়োগ করা হচ্ছে।’

মেয়র আরও বলেন, ‘চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা কর্নার চালু করা হয়েছে। চসিকের মেমন হাসপাতাল এবং চমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুটি সিএনজি অটোরিকশার মাধ্যমে শহরজুড়ে মাইকিং, তথ্যবহুল লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম চলছে। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে নগরবাসীকে সচেতন করা হচ্ছে।’

একই তথ্য জানিয়েছেন চসিকের ম্যালেরিয়া ও মশক নিধন কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহি। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মশা নিধনে আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। আমাদের জনবল এবং ওষুধের কোনও স্বল্পতা নেই। আগামী ছয় মাসের ওষুধ গুদামে মজুত আছে। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ২০৫ জন স্প্রে ম্যান নিয়মিত কাজ করছেন। বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য কাজ করছে বিশেষ স্প্রে টিম।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়