শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই ধুঁকছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা দাবিতে শ্রমিক আন্দোলন। সব মিলিয়ে বহু কারখানার মালিক শেষ পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধের পথ বেছে নিয়েছেন। সবশেষে মহানগরের জরুণ এলাকায় অবস্থিত ইসলাম গার্মেন্টস লিমিটেডে (ইউনিট-২) এক শ্রমিকের মৃত্যু ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। রুবিনা বেগম নামে ওই শ্রমিক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান। এরপর শ্রমিক আন্দোলনের মুখে কারখানায় ভাঙচুরের শঙ্কা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী ১ জুলাই থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করে। এক সিদ্ধান্তেই প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক কাজ হারান। সূত্র: সমকাল প্রতিবেদন
রাজধানীলাগোয়া গাজীপুরকে বলা হয় শিল্পনগরী। ভোর হলেই যেখানে লাখ লাখ শ্রমিকের পদভারে মুখর হয়ে ওঠে সড়ক; সেই গাজীপুরের অনেক কারখানার ফটকে এখন ঝুলছে বন্ধের নোটিশ। কোথাও কারখানার চাকা থেমে গেছে আর্থিক সংকটে, কোথাও শ্রমিক অসন্তোষের জেরে মালিকপক্ষ ঝুলিয়েছে তালা। গত এক সপ্তাহে গাজীপুরে ১৩ পোশাক কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। প্রতিটি বন্ধ কারখানার সঙ্গে নিভে যাচ্ছে হাজারো পরিবারের জীবিকার প্রদীপ; বাড়ছে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা।
এরও আগে গাজীপুর সদরের বাঘের বাজার এলাকায় লিথী গ্রুপের পাঁচটি শিল্প ইউনিট একযোগে বন্ধ করা হয়। গত বুধবার রাতে জারি করা নোটিশে গ্যাস-সংযোগ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ভবিষ্যৎ অর্ডারের অনিশ্চয়তা, কয়েক বছরের শ্রমিক অসন্তোষ, পণ্যের বিক্রিমূল্য কমে যাওয়া এবং সময়মতো ব্যাংকিং সহায়তা না পাওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো–অ্যাপারেল-২১ লিমিটেড, ফমকম ফ্যাশন লিমিটেড, ফমকম ডাইং লিমিটেড, ফমকম প্রিন্টিং লিমিটেড এবং ফমকম নিটিং লিমিটেড।
বোর্ডবাজার এলাকার ইউনিক ডিজাইনার্স ও ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় আসে। এক সিদ্ধান্তে একসঙ্গে ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। পরিবার চালানো, সন্তানের পড়াশোনা এবং বকেয়া পাওনা আদায়–সবকিছু নিয়েই এখন অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা। শিল্প পুলিশ, শ্রম অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধির ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও হারিয়ে যাওয়া কর্মসংস্থান ফিরবে কিনা–এর উত্তর নেই। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন জানান, আর্থিক সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে কর্তৃপক্ষ কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। কারখানা বন্ধের ফলে শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিট, বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের বিষয়ে উভয়পক্ষের সম্মতিতে ১১টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রায় এক দিনেই তালা পড়ে চার কারখানায়। সেগুলো হলো–এপেক্স স্পিনিং অ্যান্ড নিটিং মিলস লিমিটেড, এপেক্স টেক্সটাইল প্রিন্টিং মিলস লিমিটেড, এপেক্স লন্ড্রি মিলস লিমিটেড ও এপেক্স ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড। শ্রমিকের সার্ভিস বেনিফিট-সংক্রান্ত দাবি ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে অনির্দিষ্টকালের বন্ধের নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশে বলা হয়, ২২ জুন থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারখানাগুলোর সব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। বলা হয়, শ্রমিকের একটি অংশ আইনবহির্ভূত দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে কারখানায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩(১) ধারা অনুযায়ী, চারটি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হলো।
গাজীপুর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে আরও ২টি কারখানা বন্ধের তালিকায় যুক্ত হয়েছে। এগুলো হলো মহানগরের কড্ডা-নাওজোড় এলাকার ফ্যাশন লিংকার্স লিমিটেড ও কাশিমপুর এলাকার কোরটেক্স অ্যাপারেলস লিমিটেড।
গাজীপুর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক প্রকৌশলী এম. এম. মামুন-অর-রশিদ বলেন, বন্ধ কারখানাগুলো আবার উৎপাদনে যাবে–এমনটাই আমরা আশা করছি।