স্পোর্টস ডেস্ক : এবার তিন দেশে বসেছে বিশ্বকাপের আসর। এই খেলা নিয়ে এমন এক উন্মাদনা, সেখানে অংশ না নেওয়া দেশও ফুটবলের জাদুতে মেতে উঠে রাত জাগে দিনের পর দিন। এই উপমহাদেশও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু বাংলাদেশে যেন সেই ‘পাগলামি’ এক তুমুল পর্যায়ে পৌঁছায় প্রতিবার।
বিশেষত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মতো দেশের সমর্থকদের মধ্যে ‘মারামারি’তে রক্তপাত যেন একেবারেই চেনা ঘটনা। ভাবতে বসলে সত্যিই অবাক হতে হয়। কত দূরে লাতিন আমেরিকার দুই দেশের প্রতি এহেন সমর্থনের নেপথ্যে কী কারণ থাকতে পারে?
২০ কোটির দেশ বাংলাদেশ। ক্রিকেটে তারা পরিচিত নাম। কিন্তু ফিফার সাম্প্রতিক র্যাঙ্কিং অনুযায়ী তাদের জাতীয় পুরুষ ফুটবল দল বিশ্বের ১৮১তম স্থানে রয়েছে! কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলে ভারত কিংবা উপমহাদেশের অন্য দেশের মতো তাদের উৎসাহও লাগামছাড়া। সম্ভবত উন্মাদনায় বাকিদের থেকেও বেশি। এর নেপথ্যে রয়েছে এক খর্বকায় জাদুকরের রঙিন ছায়া। তাঁর নাম দিয়েগো মারাদোনা। --- সংবাদপ্রতিদিন
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য প্রথম রঙিন বিশ্বকাপ। অবশ্য সাদা-কালো টেলিভিশনেও বোধহয় তা রঙিন বলেই মনে হত। কেননা সেবার একজন খেলোয়াড় প্রায় তাঁর একক নৈপুণ্যেই দেশকে বিশ্বজয়ী করেছিলেন। সেবারের বিশ্বকাপে সেদেশের ফুটবল ভক্তদের একটা বড় অংশ আর্জেন্টিনার ভক্ত হয়ে ওঠেন।
তবে মারাদোনার আগে আরেক মানুষের পায়ের জাদু আচ্ছন্ন করেছিল বাংলাদেশকে। তিনি পেলে। গত শতকের ছয় ও সাতের দশকে (মুক্তিযুদ্ধের আগে পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান নামেই ডাকা হত) ওই ভূখণ্ডের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে গোটা ব্রাজিল দলেরই জাদুকরী ছন্দের খেলা। ছিয়াশির মারাদোনা এসে সেই আসক্তিতে ভাগ বসালেন। দুই লাতিন আমেরিকার দেশ যেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠতে থাকে। এপ্রসঙ্গে বলাই যায় ফকল্যান্ড যুদ্ধের কথা।
১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে লড়াইয়ে নামে দুই দেশ- ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনা। ৭৪ দিনের সংঘাতের পর আর্জেন্টিনার আত্মসমর্পণে লড়াই শেষ হয়। কিন্তু সংগ্রাম অব্যাহত থাকে।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার ম্যাচ হয়ে ওঠে প্রতিশোধের মাইলফলক। আর সেই ম্যাচেই মারাদোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল। গোলের ঠিক ৪ মিনিট পর, মারাদোনা নিজেদের প্রায় ৬০ গজ দূর দৌড়ে ইংল্যান্ডের ৫ জন ডিফেন্ডার এবং গোলরক্ষককে কাটিয়ে গোল করেন।
সেই ম্যাচ যেন ফুটবলের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে আরও দূর পৌঁছে দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাবাসীকে। বহু কিলোমিটার দূর থেকে সেই লড়াই ছুঁয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষকেও। ফুটবলকে ছুঁয়ে ঔপনিবেশিক সাহেবদের পরাভূত করার রোমাঞ্চ তাঁদের আরও বেশি করে বিশ্বকাপের রণাঙ্গনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
সময় বদলেছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়েছে এই আবেগই। আর কে না জানে, অতি আবেগ, যদি তা নিয়ন্ত্রণে না থাকে তাহলে অনর্থ ঘটিয়ে দিতে পারে। ২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ঝরে যায় ২৩টি তাজা প্রাণ! এমন ঘটনা আগের বিশ্বকাপগুলিতেও ঘটেছে। এবারও বিশ্বকাপ শুরু হতে না হতে মারামারির ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে।
ইতিমধ্যেই একজনের প্রাণও গিয়েছে। এমনটা যে একেবারেই কাম্য নয় তা বলাই বাহুল্য। ফুটবলের মাঠ যে লড়াইকে তুলে ধরে সেখানে উত্তেজনা ও নৈপুণ্যের মিশেল আসলে নির্মাণ করে এক ভ্রাতৃত্ববোধ। সেই প্রেরণাকে ছুঁয়ে থেকেই ফুটবল মহোৎসবে মেতে থাকুন বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা, তেমনটাই কাম্য।