শিরোনাম
◈ বিত‌র্কিত ট‌্যাক‌লে আমার পা ভেঙে গেলেও মেসি কার্ড পেতো না’ : আলজেরিয়া ডিফেন্ডার ◈ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ইস্যুতে কূটনৈতিক সমাধানের তাগিদ জাতিসংঘের ◈ ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয়ঙ্কর ফাঁদে মুসলিম নারী, প্রচারণার জন্য যৌনতাপূর্ণ ছবি তৈরি এবং অপব্যবহার করে ◈ ঘণ্টায় ১০ লাখ ডলার খরচ করলেও ১১৪ বছরে শেষ হবে না মাস্কের সম্পদ ◈ দক্ষিণ এশিয়ার চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ, পেছনে ভারত-পাকিস্তান ◈ গণভবনের সামনে যুবলীগের ঝটিকা মিছিল, দায় নিতে চায় না দুই থানা ◈ নিরাপত্তার ঘেরাটোপে সরকারপ্রধানকে জনগণ থেকে দূরে ঠেলে না দেয়ার আহ্বান ◈ কাঁঠাল দিয়ে হচ্ছে সিঙ্গারা-সমুচা-কাবাব, পুষ্টিগুণও অনেক বেশি, রপ্তানির আশা মন্ত্রীর ◈ মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরে কী হতে যাচ্ছে ◈ যে কারণে ভারত-পাকিস্তান কখনও একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় না!

প্রকাশিত : ১৮ জুন, ২০২৬, ০৬:৪৪ বিকাল
আপডেট : ১৮ জুন, ২০২৬, ০৭:০৩ বিকাল

প্রতিবেদক : আর রিয়াজ

ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয়ঙ্কর ফাঁদে মুসলিম নারী, প্রচারণার জন্য যৌনতাপূর্ণ ছবি তৈরি এবং অপব্যবহার করে

আল জাজিরা অনুসন্ধান: ভারতের মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে যৌনতাপূর্ণ ছবি ও প্রচারণা তৈরি করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামরিন আইয়ুব যখন প্রথম ভিডিওটি দেখেন, তিনি হতবাক হয়ে যান। ভারত-শাসিত কাশ্মীরের এই ফ্রিল্যান্স মডেল গত বছর তার ফোনে স্ক্রল করছিলেন, তখন তার এক বন্ধু তাকে ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি ক্লিপ পাঠায়। ২৪ বছর বয়সী আইয়ুব বলেন, “এটা ছিল রীতিমতো পিছু ধাওয়া করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার প্রথম সেমিস্টার থেকে শেষ সেমিস্টার পর্যন্ত তারা আমার জীবন অনুসরণ করেছিল।”

ভিডিওটিতে দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আইয়ুবের ছাত্রজীবনের বিভিন্ন ছবি জুড়ে দেওয়া হয়েছিল – ছবিগুলো ছিল ক্যাম্পাস জীবনের দৈনন্দিন মুহূর্ত থেকে নেওয়া, যার মধ্যে ছিল গ্রুপ প্রজেক্ট, বিদায় অনুষ্ঠান এবং সহপাঠীদের সাথে তোলা সেলফি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা ভয়েসওভারটিতে মিথ্যাভাবে দাবি করা হয়েছিল যে তিনি একজন মুসলিম নারী, যিনি হিন্দু পুরুষদের কাছে “নিজের শরীর বিক্রি করছেন”।

এতে ছবিগুলোতে থাকা ব্যক্তিদের ভুলভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং তার নিজের ভাইকে তার “দালাল” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। আইয়ুব বলেন, “ভিডিওটি এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে, আমার বাবা-মা সহ যে কেউ দেখলেও, তারাও এটিকে আসল বলে মনে করতেন।”

তিনি এমন কয়েকজন মুসলিম নারীর মধ্যে একজন, যারা এমন একটি ঘটনার শিকার হয়েছেন, আল জাজিরা এমন বেশ কয়েকজন মুসলিম নারীর সাথে যোগাযোগ করলে তারা লজ্জা এবং পুনরায় মানসিক আঘাতের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে রেকর্ডভুক্তভাবে কথা বলতে রাজি হননি।

‘যৌন কল্পনাকে ছবিতে রূপদান’

মুসলিম নারীদের ছবি ও ভিডিওকে যৌনতাপূর্ণ করে তোলার এই প্রবণতাটি এমন এক সময়ে উন্মোচিত হচ্ছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাসনব্যবস্থা নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনায় ভারতের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে এই বছরের শুরুতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চ-পর্যায়ের ‘এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’, যেখানে উদ্ভাবন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর উপর আলোকপাত করা হয়েছিল।

ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট -এর এক গবেষণা বলছে, এক্স, ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের ২৯৭টি পাবলিক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত ১,৩২৬টি এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে মুসলিম নারীদের যৌন আবেদনময়ী চিত্রায়ণ সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছে যা প্ল্যাটফর্মগুলো জুড়ে ৬৭ লাখেরও বেশি ছিল। ডিজিটাল গবেষণা বিশ্লেষক জেনিথ খান বলেন,  জেনারেটিভ এআই যৌন কল্পনাকে দ্রুত এবং বিনা খরচে চিত্রে রূপান্তর করা সম্ভব করেছে।ইমেজ জেনারেটর এবং ডিপফেক ব্যক্তিদের ন্যূনতম প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ বয়ানকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত দৃশ্যমান উপাদানে রূপান্তর করার সুযোগ করে দেয়।

মুম্বাই-ভিত্তিক রাতি ফাউন্ডেশন পরিচালিত অনলাইন নিরাপত্তা হেল্পলাইন ‘মেরি ট্রাস্টলাইন’ বলছে গণমাধ্যমের মনোযোগ সাধারণত তারকা ও রাজনীতিবিদদের দিকে থাকলেও, জনসমক্ষে না থাকা নারীরাও এমন সব ছবির মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন, যা কৃত্রিমভাবে তৈরি হলেও প্রকৃত ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। হেল্পলাইনটির সম্মুখসারির পরামর্শদাতাদের একজন সালমান মুজাওয়ারও বলেন, মেরি ট্রাস্টলাইন ৪৮২টিরও বেশি ঘটনা সামাল দিয়েছে, যার প্রায় ১০ শতাংশই ডিজিটালভাবে বিকৃত করা বিষয়বস্তু সম্পর্কিত। এআই টুলগুলো আরও সহজলভ্য হওয়ায় এই হার বেড়েই চলেছে।

মুজাওয়ার বলেন, “লজ্জা, ভয় এবং মানসিক আঘাতের কারণে এই লঙ্ঘনগুলো চাপা পড়ে যায়। ঘটনাগুলো এমনকি ঘনিষ্ঠ পরিবারের সদস্যদের কাছেও খুব কমই প্রকাশ করা হয়, বৃহত্তর জনপরিসরে আলোচিত হওয়া তো দূরের কথা।”

‘রাজনীতির অশ্লীলীকরণ’

আয়ুবের ভিডিওটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একাধিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই অপমানজনক মন্তব্য, হুমকিভরা ফোন কল এবং তার চরিত্র নিয়ে নানা অভিযোগ আসতে শুরু করে।
তিনি বলেন, “মনে হচ্ছিল যেন ডিজিটাল গণপিটুনি চলছে। একটি নয়, এক ডজনেরও বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে সেই ভিডিওটি সবখানে পোস্ট করা হচ্ছিল এবং আরও শত শত অ্যাকাউন্ট তা পুনরায় শেয়ার করছিল।”

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি মিমে মুসলিম নারীদের ধর্মীয় পোশাকে যৌন উত্তেজক দৃশ্যে চিত্রিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সাংবাদিক ও কর্মীদের লক্ষ্য করে বানানো মনগড়া পর্নোগ্রাফিক চিত্রও রয়েছে। এই ছবিগুলোর মধ্যে গবেষকরা একটি পুনরাবৃত্তিমূলক দৃশ্যগত প্যাটার্ন লক্ষ্য করেছেন: একজন “মুসলিম-রূপী নারী”-র সাথে একজন “হিন্দু-রূপী পুরুষ”-কে জুড়ে দেওয়া। খান বলেন, “এই আখ্যানগুলোতে মুসলিম পুরুষদের প্রায়শই সহিংস বা নৈতিকভাবে ভ্রষ্ট হিসেবে চিত্রিত করা হয়। অন্যদিকে, মুসলিম নারীদের হয় অনুগত অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের পুরুষদের দ্বারা ‘উদ্ধারপ্রাপ্ত’ হিসেবে দেখানো হয়।”

মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া নৃবিজ্ঞানী সাহানা উদুপা এসব ঘটনা নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত এক বৃহত্তর ‘রাজনীতির অশ্লীলকরণ’-এর অংশ বলেছেন। তিনি বলেন, ডানপন্থী ডিজিটাল সংস্কৃতিগুলো নির্যাতনকে স্বাভাবিক করার জন্য হাস্যরস, মিম এবং যৌনতাপূর্ণ চিত্রকল্পকে একত্রিত করে। এই চর্চাগুলো একটি বাস্তুতন্ত্র তৈরি করে। এগুলো গোষ্ঠীগত উদযাপন এবং সম্মিলিত আগ্রাসনের ওপর ভর করে টিকে থাকে।” গবেষক সোমা বসু বলেন, এটা যৌনতারই রাজনৈতিকীকরণ।

মুসলিম নারীদের শরীর সাম্প্রদায়িক আধিপত্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই গতিশীলতার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটেছিল “সুল্লি ডিলস” এবং “বুল্লি বাই” বিতর্কে। এগুলি ছিল ভারতে মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা নকল নিলামের প্ল্যাটফর্ম, এবং বসু এই বিষয়টিকে শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক সমর্থন এবং দলটির ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবকদের অনানুষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা উভয়ের সঙ্গেই যুক্ত করেছেন।

জেনিথ খান বলেন, মুসলিম নারীদের ওপর দৃশ্যত আক্রমণ মুসলিমদের নিকৃষ্ট হিসেবে চিত্রিত করার উপায়। হিজাব পরা একজন নারীর ছবিকে সফট পর্ন হিসেবে উপস্থাপন হতে দেখে আমরা আতঙ্কিত। নারী হিসেবে, আপনাকে এমনিতেই প্রতিদিন নারীবিদ্বেষী আচরণের সম্মুখীন হতে হয়। এটি আপনার পরিচয়ের সাথে যুক্ত হওয়া আরেকটি স্তর। বিজেপির রাজনীতিবিদ আতিফ রশীদ বলেন, ডিপফেক এবং যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তুকে “অত্যন্ত হতাশাজনক” এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

গবেষকদের মতে, জেনারেটিভ এআই-এর উত্থান অনলাইনে মুসলিম নারীদের হয়রানির মাত্রা ও গতিকে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন অ্যাপ্লিকেশনগুলো ব্যবহারকারীদের ছবি আপলোড করার এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে যৌন আবেদনময়ী ছবি তৈরি করার সুযোগ দেয়। এই ধরনের সরঞ্জামগুলো অনলাইনে ব্যাপকভাবে সহজলভ্য, প্রায়শই বিনামূল্যে পাওয়া যায় এবং এর জন্য কোনো প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হয় না। সিএসওএইচ-এর গবেষণা ও প্রচার বিভাগের পরিচালক ইভিয়ান লাইডিগ বলেন, “নারীদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নারীদের লক্ষ্যবস্তু করতে এবং হয়রানি করার জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। 

আফরিন ফাতিমা (২৭), একজন গবেষক ও সমাজকর্মী, যিনি ২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইনের বিরুদ্ধে কথা বলার পর থেকে অনলাইন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমে তার উপস্থিতি সীমিত হওয়া সত্ত্বেও, বেনামী অ্যাকাউন্টগুলো, প্রায়শই সাধারণ হিন্দু নাম ব্যবহার করে, তাকে আপত্তিকর বার্তা, ধর্ষণের হুমকি এবং নির্দিষ্টভাবে হয়রানি করে চলেছে, যার কিছু তার কাজের সাথে সম্পর্কিত। ফাতিমা বলেন, অনলাইনে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য জনসমক্ষে তার চলাফেরার ধরনকেও প্রভাবিত করেছে।

‘আমি নিরাপদ বোধ করি না’

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর আইয়ুবের সাথে ব্র্যান্ডগুলো যোগাযোগ করা বন্ধ করে দেয়। চার-পাঁচ মাস ধরে, ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো তার প্রোফাইলকে আপত্তিকর মন্তব্যে ভরিয়ে দেয়, যা সম্ভাব্য গ্রাহকদের নিরুৎসাহিত করে। এই হয়রানি সামাজিক মাধ্যমের সঙ্গে তার সম্পর্ককেও বদলে দিয়েছে। নয়াদিল্লির পুলিশ সাইবার ক্রাইম ইউনিটে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন আইয়ুব।

তিনি বলেন, “কিছুই হয়নি।”আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ভারতের আইনগুলো এআই-সৃষ্ট বিষয়বস্তুর সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। আইনজীবী এবং ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অপার গুপ্ত বলেন, “ছবিটি মনগড়া হলেও ক্ষতিটা বাস্তব। ছবিটি নকল হলেও, এটি নারীদের জন্য একটি স্থায়ী কলঙ্কচিহ্ন তৈরি করে।”

আইয়ুব বলেন, “আমি সবচেয়ে বেশি যা চেয়েছিলাম তা হলো ওই অ্যাকাউন্টগুলোর পেছনের মানুষগুলোকে খুঁজে বের করা,তারা আমাকে না চিনেই আমার সুনাম নষ্ট করেছে।”

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়