মনিরুল ইসলাম: বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ঐতিহাসিক অবদানকে এই সমাজ ও রাষ্ট্র ধারণ করতে পারেনি। গণঅভ্যুত্থানে নারীর ঐতিহাসিক অবদানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিন। নারীর অধিকার ও মর্যাদাবিরোধী অপতৎপরতা আইন করে বন্ধ করুন।
আজ বৃহস্পতিবার শ্রমজীবী নারী মৈত্রীর উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে "২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান: নারীর অধিকার ও মুক্তির গতিপথ" শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে তিনি এসব কথা বলেন।
সংগঠনের সভাপতি বহ্নিশিখা জামালীর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক স্নিগ্ধা সুলতানা ইভার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। এছাড়া বক্তব্য রাখেন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক আফসানা বেগম, বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত, শ্রমজীবী নারী মৈত্রীর সহসভাপতি রাশিদা আক্তার, সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংগঠক শান্তা বেগম, মরিয়াম বেগম প্রমুখ।
সভায় সাইফুল হক বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান নারীশক্তির যে বিপুল জাগরণ ঘঠিয়েছিল এই সমাজ ও রাষ্ট্র তাকে ধারণ করতে পারেনি ; নারী উত্থান ও নারী জাগরণকে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই জুলাই আন্দোলন প্রকৃত গণজাগরণ ও গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। নারীরা যখন আন্দোলনে যুক্ত হলেন, তখনই আন্দোলন সত্যিকার অর্থে গণচরিত্র লাভ করে।বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, শ্রমজীবী নারী, গার্মেন্টস শ্রমিক, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীর অংশগ্রহণ আন্দোলনকে নৈতিক শক্তি দিয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সাইফুল হক বলেন, আন্দোলনের সময় নারীর পোশাক, ধর্মীয় পরিচয় বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না। তখন একটাই সত্য ছিল—মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। তিনি নারী শহীদদের অবদান যথাযথভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের পর আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা নারীরা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পরিসরে প্রত্যাশিত স্থান পাননি। বরং সাম্প্রদায়িক ও জংগীবাদী গোষ্ঠীগুলো পরিকল্পিতভাবে নারীর পোশাক, চলাফেরা ও স্বাধীনতাকে লক্ষ্য করে বিদ্বেষ ছড়াতে শুরু করে। নারীদেরকে তারা পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে না। নারী যে স্বাধীন সত্তা, তার স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও সৃজনশীলতা আছে—এটা তারা মানতে চায় না।
তিনি বলেন, নারী যদি ঘরে, কর্মস্থলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা রাজপথে নিরাপত্তা না পান, তাহলে সেই সমাজকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ বলা যায় না। তিনি নারী নারীর অধিকার ও মর্যাদাবিরোধী নারীবিদ্বেষী যাবতীয় প্রচারণা আইন করে নিষিদ্ধ করার আহবান জানান। \
তিনি বলেন, সমাজ এক চাকার সাইকেল দিয়ে চলতে পারে না। পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমঅধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে বহ্নিশিখা জামালী বলেন, ২০২৪ সালের গণজাগরণ ও গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ কয়েক দশক পর ছাত্র-তরুণদের পাশাপাশি শ্রমজীবী নারী, পেশাজীবী নারী, গৃহিণী ও মায়েরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ, গণতন্ত্র এবং বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকেই নারীরা রাজপথে নেমেছিলেন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর নারীর পোশাক, চলাফেরা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে বিদ্বেষ, সাইবার বুলিং ও সামাজিক নিপীড়ন বৃদ্ধি পায়।
তিনি বলেন, নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়েও উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর সংগঠিত আক্রমণ এবং সরকারের দুর্বল ভূমিকা নারীর অধিকার প্রশ্নে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসন বৃদ্ধি ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের দাবিও উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে গত দুই বছরে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ও লেখক আফসানা বেগম বলেন, ইতিহাসের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নারীরা সংগ্রামের মধ্য দিয়েই নিজেদের অধিকার অর্জন করেছেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, কিশোরী, শ্রমজীবী নারী এবং মায়েদের সাহসী উপস্থিতি বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর ধীরে ধীরে নারীরা রাজনৈতিক পরিসর থেকে পিছিয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, কাউকে হাত ধরে ক্ষমতায়ন করা যায় না। নারীকে নিজের শক্তিতেই এগিয়ে যেতে হবে, আর সেই পথকে সমান ও নিরাপদ করে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজের।
বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত বলেন, আন্দোলনের সময় নারীর অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানো হলেও পরবর্তীতে তাঁদের বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং, সামাজিক অপমান ও ব্যক্তিগত আক্রমণ বেড়েছে। তিনি বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে সরাসরি নির্বাচনে অধিকসংখ্যক নারীকে মনোনয়ন দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমজীবী নারীর ন্যায্য মজুরি, গৃহস্থালি শ্রমের সামাজিক স্বীকৃতি এবং রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে প্রোথিত পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া প্রকৃত সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
আলোচনা সভা থেকে বক্তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে হলে নারীর সমঅধিকার, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় শ্রমজীবী নারী মৈত্রীর পক্ষ থেকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও মুক্তিকামী মানুষের প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মানবিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যবিরোধী চেতনা বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
আলোচনা সভার শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট দাঁড়িয়ে নিরবতা পালন করা হয়।