শিরোনাম
◈ শুক্রবারই পদত্যাগ করতে পারেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন: রয়টার্সের প্রতিবেদন ◈ সৌদিতে ওমরাহর পথে প্রাইভেট কারে দুর্ঘটনা, নিহত একই পরিবারের ৩ জন ◈ পাঁচ মাসেই উত্থান থেকে পতন: জাসদ-ছাত্রলীগ থেকে জামায়াত, এক ভিডিওতেই সব শেষ গাজী নজরুলের ◈ বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় লাফ, মে মাসের পর আবারও ১০০ ডলার ছাড়াল ◈ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন: পরীক্ষাগার ছেড়ে পালাল ‘এআই’, ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে বিশ্ব! ◈ জুলাইয়ের ২২ দিনে রেমিট্যান্স এলো ২.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ◈ যে দুই কারণে আটকে আছে নতুন পে স্কেল ◈ সার সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনে বড় ঝুঁকি: জাতিসংঘের সতর্কতা ◈ নারী আইনজীবীর মাথা ফাটানো সেই বিচারককে বদলি ◈ শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ নিয়ে মুখ খুললেন রাষ্ট্রপতি

প্রকাশিত : ২৩ জুলাই, ২০২৬, ১১:৫৬ রাত
আপডেট : ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পাঁচ মাসেই উত্থান থেকে পতন: জাসদ-ছাত্রলীগ থেকে জামায়াত, এক ভিডিওতেই সব শেষ গাজী নজরুলের

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত নাম গাজী নজরুল ইসলাম। ছাত্ররাজনীতি দিয়ে রাজনৈতিক জীবনের শুরু, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, শিক্ষকতা, জামায়াতে ইসলামীর তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসা এবং তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে পথ চলেছেন।

তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া বিতর্ক তার রাজনৈতিক জীবনে পতন এনে দেয়। শেষ পর্যন্ত নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকেই বহিষ্কার করা হয় তাকে।

জানা যায়, ১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন গাজী নজরুল ইসলাম। শৈশবের প্রথম পাঁচ থেকে ছয় বছর নিজ গ্রামেই কাটান। ১৯৬২ সালে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে গাবুরা জিএনএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬৭ সালে দ্বিতীয় বিভাগে এসএসসি পাস করেন। একই বছর সাতক্ষীরা কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হয়ে ১৯৭০ সালে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর খুলনা বিএল কলেজে ডিগ্রি শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে জাসদ ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে রাজনৈতিক জীবনে সক্রিয় হন গাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে ডিগ্রির ফাইনাল পরীক্ষা চলাকালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বাড়ি ফিরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে আলোচনার সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, গাজী নজরুল ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা। এর আগে সংসদে গাজী নজরুল ইসলাম নিজেও দাবি করেছিলেন, তিনি সেক্টর ৯-এ মেজর এম এ জলিলের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তার কাছে রয়েছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাসদে যোগ দেন তিনি। ওই সময় জাসদের একটি সভা থেকে প্রথমবার গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় তিন মাস কারাভোগ করেন। পরে মামলাটি থেকে খালাস পান।

১৯৭৫ সালে বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন গাজী নজরুল ইসলাম। পরের বছর ১৯৭৬ সালে মাকসুদা খাতুনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮০ সালে তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। পরে আরও দুই সন্তানের জন্ম হয়। তার পরিবারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

১৯৮৩ সালে জামায়াতে ইসলামীতে সমর্থক হিসেবে যোগ দেন গাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৮৬ সালে দলের রোকন হন। একই বছর শ্যামনগর থানা আমিরের দায়িত্ব পান। ১৯৮৬-১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিলেও বিজয়ী হতে পারেননি। ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবারও অংশ নেন। তবে সে নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি। এরপর দীর্ঘ সময় সংসদের বাইরে থাকার পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে নির্বাচন করেন। তিনি ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী ড. মো. মনিরুজ্জামান পান ৮৫ হাজার ৪৬৬ ভোট।

রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার কারাবন্দি হয়েছেন গাজী নজরুল ইসলাম। ২০০৭ সালের ৯ মার্চ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় এক বছর পর ২০০৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান।

২০১২ সালের ১২ এপ্রিল তৃতীয়বার কারাবন্দি হন এবং একই বছরের ২২ মে মুক্তি পান। একই বছরের নভেম্বর মাসে চতুর্থবার কারাবন্দি হয়ে ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান। পরে ২০১৩ সালের ১৫ মে পঞ্চমবার কারাবন্দি হন এবং একই বছরের ১৪ অক্টোবর মুক্তি পান। ২০১৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠবার কারাবন্দি হয়ে মার্চ মাসে মুক্তি পান। একই বছরের ২৫ জুলাই সপ্তমবার কারাবন্দি হয়ে ২ আগস্ট মুক্তি পান। পরে ১৬ ডিসেম্বর অষ্টমবার কারাবন্দি হন। ওই সময় তার স্ত্রী মাকসুদা খাতুন ও একমাত্র কন্যা শারমিন ফেরদৌসীকেও একটি মামলায় প্রায় ২৯ দিন কারাবন্দি থাকতে হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মাত্র পাঁচ মাস পর, ২০ জুলাই রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিডিওটির একাধিক অংশ ভাইরাল হয়। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা নারী তার বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রী। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ২২ জুলাই দুপুরে শ্যামনগর বাজার থেকে ‘শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজ’র ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে আসা স্থানীয় বাসিন্দা, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

একই দিন বিকেলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এদিকে, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ তুলেছেন সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য ও শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সোলায়মান কবির।

তিনি দাবি করেন, বালুমহালের একটি ডাক ছিল। সেটি শ্যামনগর এলাকার হলেও আশাশুনির উপকূলসংলগ্ন এলাকায় পরিচালিত হতো। ডাক শেষ হওয়ার পর শ্যামনগরে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ছেলে, তার ঘনিষ্ঠ লোকজন এবং শিবিরের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে ওই বালুমহাল পরিচালিত হতো, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হিসেবে আমি একাধিক সভায় বিষয়টি উত্থাপন করেছি। কিন্তু এমপির প্রভাবের কারণে সেটি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

তবে সোলায়মান কবিরের এই অভিযোগের বিষয়ে গাজী নজরুল ইসলাম ফোন বন্ধ পাওয়ায় তার বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। জামায়াতে ইসলামী একটি নৈতিক সংগঠন। সেই জায়গা থেকে দল সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ঘটনায় কিছুটা হলেও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি, সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দলের মর্যাদা পুনরুদ্ধার হবে। আমাদের কর্মীরা এ বিষয়ে বিভ্রান্ত হবেন না।

গাজী নজরুল ইসলামের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ছাত্ররাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, শিক্ষকতা, জামায়াতের তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসা, তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং একাধিকবার কারাবরণের মতো ঘটনাগুলো যেমন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে, তেমনি সাম্প্রতিক ভিডিও বিতর্ক ও দলীয় বহিষ্কারের ঘটনাও তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।

এদিকে, দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, শুধু দলীয় বহিষ্কারের ভিত্তিতে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। জাতীয় সংসদ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। উৎস: কালবেলা।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়